রাজনৈতিক পর্যায়ে ভারতীয় আশ্বাসের তুলনায় ভারতের সামরিক পরিকল্পনা পিছিয়ে থাকার ফলে ঢাকাকে দ্রুত মুক্ত করা তথা বিজয় সম্পন্ন করার পথে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা পূরণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বৃহত্তর সামরিক ভুল ছাড়াও আর একটি উপাদান কার্যকর ছিল। নভেম্বরে বাংলাদেশের বাইরে ও ভিতরে স্বাধীনতা-সমর্থক প্রায় সকল অবহিতমহল বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মিলিত অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকৃত এলাকার সর্বত্র দীর্ঘ-নির্যাতিত মানুষের বিদ্রোহের শক্তি পুনরায় এমনভাবে প্রজ্বলিত হয়ে উঠবে যে পাকিস্তানের অবশিষ্ট সামরিক ক্ষমতা তাতে সর্বাংশে বিপর্যস্ত না হয়ে পারে না। এই সব আশ্বাস ও বিশ্বাসের ব্যাপার ছাড়াও প্রকাশিত ও সংগৃহীত তথ্য থেকে সে সময়েই জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমবর্ধিত তৎপরতার ফলে পাকিস্তানী সৈন্যদের নৈশ চলাচল ক্ষমতা ইতিমধ্যেই প্রায় সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। রাত্রিতে মুক্তিবাহিনী এবং দিনে সম্ভাব্য ভারতীয় বিমান তৎপরতার ফলে ঢাকা অবরোধের জন্য সীমান্ত থেকে সৈন্য পিছিয়ে আনার পাকিস্তানী প্রয়াস যে অসম্ভব হতে পারে তা অস্পষ্ট ছিল না। এই সব উপলব্ধির উপর নির্ভর করে ক্ষিপ্রগতিতে ঢাকা দখল এবং সমস্ত শত্রুসেনাকে বন্দী করে ফেলার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ও অধস্তন লক্ষ্যগুলি একযোগে অর্জন করা সম্ভব বলে মনে হয়।
১৬ই নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণক্রমে সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দিন আহমদ দিল্লীতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এই বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধীর সামপ্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা, বিশেষত বাংলাদেশ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানীর মনোভাব, অধিকৃত অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা, সীমান্ত অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ, কাশ্মীর সীমান্তে পাকিস্তানের সম্ভাব্য অভিযান, ভারতের পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়। সম্ভবত পূর্ববর্তী বৈঠকের অভিজ্ঞতার ফলে এবার চূড়ান্ত অভিযান শুরুর পক্ষে ইন্দিরা গান্ধী কোন অভিমত প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন; ফলে সৈয়দ নজরুল বরং কিছুটা বিমর্ষ ও চিন্তিত হয়েই এবার কোলকাতা ফিরে আসেন। এই সময়ে তাজউদ্দিনকে জানানো হয়, গত দু’মাস যাবৎ তাঁর ও ডি. পি. ধরের মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের বিষয় নিয়ে যে আলোচনা চলে আসছিল তা ভারত সরকার স্থগিত রাখার পক্ষপাতী; কেননা তাদের মতে ভারতে অবস্থানকালে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর ভারতের চাপের মুখেই সম্পন্ন হয়েছে বলে চিত্রিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে এর ফলে বাংলাদেশকে মুক্ত করার ব্যাপারে ভারতের সর্বাত্মক সহায়তার কোন তারতম্য ঘটবে না, এ প্রতিশ্রুতিও পুনরায় তাজউদ্দিনকে দেওয়া হয়।
তাজউদ্দিনও চুক্তির ব্যাপারে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে সঠিক হিসাবেই গ্রহণ করেন। কেননা পাকিস্তানের দখল অবসানের জন্য যে ভূমিকায় ভারতকে সম্মত করানোর উদ্দেশ্যে তাজউদ্দিন এক সময় এই চুক্তির কথা ভেবেছিলেন, তার সকল আয়োজনই এখন সম্পন্ন প্রায়। দিল্লী থেকে ফিরেই তাজউদ্দিন শত্রুমুক্ত বাংলাদেশের জন্য বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা, শরণার্থী প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন, জরুরী পণ্য সরবরাহ, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রভৃতি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা ও সমন্বিত কর্মসূচী জরুরীভিত্তিতে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা সেল ও সকল প্রশাসনিক বিভাগকে তৎপর করে তোলেন। অবশ্য কোন কোন দফতর নভেম্বরের প্রথম থেকেই শত্রুমুক্ত বাংলাদেশের জন্য তাদের বিভাগীয় কর্মসূচী প্রণয়ন শুরু করেন। পরিকল্পনা সেল যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ শুরু করেন তারও অন্তত একমাস আগে।
তাজউদ্দিন দিল্লী থেকে ফিরে আসার দু’দিন বাদে ডি. পি. ধর কোলকাতা এসে পৌঁছান উপমহাদেশের দ্রুত ধাবমান ঘটনা পটভূমিতে, বিভিন্ন অসমাপ্ত আলোচনাকে সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে এবং সম্ভবত সামগ্রিক আয়োজনের চূড়ান্তকরণ তদারক করার উদ্দেশ্যে। আমাদের দিক থেকে বহুবিধ জটিল সমস্যার মধ্যে একটি প্রধান সমস্যা ছিল সরবরাহকৃত অস্ত্র পুনরুদ্ধার-সংক্রান্ত। যে সব মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল-এবং পাকিস্তান যাদেরকে অস্ত্র দিয়েছিল–তাদের কাছে থেকে প্রত্যাসন্ন বিজয়ের পর অস্ত্র পুনরুদ্ধার করার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আলোচনাধীন একটি খসড়া প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট আরো কতিপয় বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিযুক্ত করেন। ১৯ থেকে ২১শে নভেম্বরের মধ্যে ডি. পি. ধরের সঙ্গে আমার মোট চার দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে দীর্ঘতম বৈঠক ছিল ১৯শে নভেম্বর এবং এই দিনের আলোচিত বিষয় সম্পর্কে আমার রাখা সংক্ষিপ্ত নোট ছিল:
“Meeting took place at 9 pm at Grand Hotel. DP, (Indian) Defence Secretary K. B. Lal and MH discussed about: (1) the nature of the political problem after liberation; (2) the arrangement for disarming the FF (and other armed elements); (3) the minimum and maximum time-frame for Indian Army to remain in Bangladesh after liberation; and (4) the possibility of intervention by US Seventh Fleet. Reasons given for possible US intervention: (a) with the programme of scaling down the (US) basing arrangements in S.E. Asia,… and when the future of that region looked uncertain, could the US afford the risk of breaking the status-quo of South Asia? (b) particularly when it was being initiated in the background of Indo-Soviet Treaty, could the US accept the rise of Russian influence in South Asia which was about to decapaciate its staunch ally (Pakistan)?….”
