ইন্দিরা গান্ধীর আরেমরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ সফরের পর সঙ্কটের নিরস্ত্র সমাধানের শেষ আশাটুকুও যখন নিঃশেষিত, তখন শরণার্থী সমস্যা থেকে ভারতের নিষ্কৃতির পথ ছিল মাত্র একটিই। এই পথ ছিল, সামরিক পন্থায় পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী দখলের সম্পূর্ণ বিলোপসাধন করে সেখানে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের উপযোগী নিরাপদ রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি করা। এপ্রিলে পাকিস্তানী গণহত্যার ভয়াবহ শুরুতে, সর্বাংশেই এক হতচকিত অবস্থার মাঝে, ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সাফল্যের জন্য তাজউদ্দিনকে যে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি জ্ঞাপন করেছিলেন তার আন্তরিকতা ও গুরুত্ব লঘু করা চেষ্টা না করেও বলা যায়, মূলত পাকিস্তানী জান্তার সামরিক সমাধানের’ অনিবার্য ফল হিসাবে সৃষ্ট অবিরাম শরণার্থী স্রোত ভারতের উপর অশেষ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ ছাড়াও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করে তা সমাধানের অপর কোন পন্থা ভারতের ছিল না। এই পরিণতির দিকে ভারতের সর্বোচ্চ মহলের বক্তব্য ক্রমশ যেমন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়, তেমনি দখলকৃত বাংলাদেশের সীমান্তে নিয়মিত বাহিনীর পক্ষে ভারতের সামরিক চাপ বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হতে থাকে। মার্চে পাকিস্তানী গণহত্যা শুরুর জবাবে পূর্ব বাংলার অকুতোভয় ছাত্র, যুবক ও বিদ্রোহী সৈন্যের দল সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার পর তারই পর্যায়ক্রমিক বিকাশের চূড়ান্ত পর্বে পাকিস্তানের নির্মম সুসংগঠিত সামরিক যন্ত্রকে বিচূর্ণ করার জন্য বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের সশস্ত্রবাহিনীর অংশগ্রহণ যেরূপ অত্যাবশ্যক গণ্য করা হয়েছিল, বিগত কয়েক মাসে রাজনৈতিক আপোস-মীমাংসা ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি নিঃশেষ করার পর শরণার্থী উপদ্রুত ভারতের জন্যও তদ্রপ ভূমিকা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
কিন্তু প্রত্যক্ষ সামরিক ভূমিকা গ্রহণের পথে তখনও ভারতের একটি বড় সমস্যা ছিল। বাংলাদেশের জন্য ভারতের সর্ববিধ সহযোগিতা প্রদান, এমনকি মুক্তিবাহিনীর সমর্থনে সীমান্ত সংঘর্ষে অংশগ্রহণ করা ছিল এক কথা, আর পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করার উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের সর্বাত্মক যুদ্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। ভারতের জন্য শেষোক্ত পদক্ষেপের অনিবার্য পরিণতি ছিল বিশ্বের কাছে নিজকে আক্রমণকারী দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা। বাংলাদেশ সঙ্কটের চাপে সোভিয়েট ইউনিয়নের সাথে নিরাপত্তা বিষয়ক মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর জোট-বহির্ভূত দেশ হিসাবে নিজের পূর্বতন ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে ভারত ইতিমধ্যেই যে সমস্যার মোকাবিলা করতে শুরু করে, তা পাকিস্তান আক্রমণের উদ্যোগ নিয়ে অনেক বেশী জটিল করে তোলা এবং অন্তত বেশ কিছু কালের জন্য অবশিষ্ট বিশ্ব থেকে নিজকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা একটি অত্যন্ত দুরূহ সিদ্ধান্ত ছিল। একদিকে উদ্ভূত সঙ্কট নিরসনে প্রত্যক্ষ সামরিক উদ্যোগ গ্রহণের মৌল প্রয়োজন এবং অন্যদিকে সামরিক উদ্যোগ গ্রহণের ফলে গুরুতর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা–এই পরস্পরবিরোধী বিবেচনার মধ্যে ভারতের সিদ্ধান্ত নির্দিষ্টভাবে প্রকাশিত হবার আগেই পাকিস্তানী জান্তাই ভারতকে এই উভয় সঙ্কট থেকে মুক্ত করে। পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং সীমান্তে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর মিলিত ও ক্রমবর্ধিত চাপের বেসামাল প্রতিক্রিয়া হিসাবেই হোক, কিংবা পাক ভারত যুদ্ধ শুরু হবার পর তা অমীমাংসিতভাবে শেষ করার ক্ষেত্রে অন্তত একটি মিত্র রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আশ্বাস বা স্বকল্পিত আশাকে অবলম্বন করেই হোক, কিংবা ক্ষমতাসীন জান্তার অভ্যন্তরে ক্ষমতা বদলের জন্য কোন ষড়যন্ত্রমূলক প্ররোচনার কারণেই হোক, অথবা এই সমুদয় কারণ কমবেশী সংমিশ্রিত হওয়ার ফলেই হোক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিজেই যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২৩শে নভেম্বর পাকিস্তান ‘জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে এবং ঐ দিন তক্ষশীলায় চীনা সাহায্যে নির্মিত ভারী যন্ত্রপাতি কারখানার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীনা মন্ত্রীর উপস্থিতিতে ইয়াহিয়া খান ‘দশ দিনের মধ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখ করেন। যথাসময়ে সম্ভাবনাটি বাস্তবায়িত হয়।
অধ্যায় ১৯: নভেম্বর
আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ পরবর্তী ঘটনা বিকাশের সম্ভাব্য পথ ছিল দুটি: (১) আসন্ন শীতে ভারত-তিব্বত গিরিপথসমূহ তুষারাবৃত হয়ে পড়ার পর ঢাকার উদ্দেশে মিলিত ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর চূড়ান্ত অভিযান; অথবা (২) শীতের প্রাক্কালে গিরিপথসমূহ উন্মুক্ত থাকতেই আসন্ন বিপর্যয় প্রতিরোধের জন্য আমেরিকা ও চীনের কৌশলী হস্তক্ষেপের (tactical intervention) উপর ভরসা করে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক তদারকিতে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতাবস্থা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টা। এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে প্রকৃত ঘটনা কোন্ পথে অগ্রসর হতে পারে, তা সুস্পষ্ট ছিল না। তবে কার্যকারিতার দিক থেকে প্রথম সম্ভাবনার সাফল্য উজ্জ্বলতর মনে হয় মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত, মুক্তাঞ্চল গঠন প্রতিরোধ করার দীর্ঘ শ্রান্তিকর কাজে পাকিস্তানী বাহিনী সুদীর্ঘ সীমান্ত বরাবর ছড়িয়ে থাকায় তাদের প্রহরার এলাকা সুবিস্তৃত ছিল বটে, কিন্তু তার ফলে বৃহত্তর আক্রমণ প্রতিরোধের গভীরতা সর্বত্রই তাদের লোপ পায়। তাদের প্রতিরক্ষার আয়োজন অনেকটা হয়ে ওঠে স্ফীত বেলুনের মত-এর বহিরাবরণ যতই নিরবচ্ছিন্ন দেখাক, এর ভিতরটা ছিল সর্বাংশেই ফাঁপা। দ্বিতীয়ত, সকল প্রধান সড়ক ও যোগাযোগ কেন্দ্রে পাকিস্তান প্রতিরক্ষার জন্য যে সব ‘দুর্গ’, ‘মজবুত ঘাঁটি’ প্রভৃতি গড়ে তুলেছিল, সে সব পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কৌশল অবলম্বনের দরুন ঢাকার উদ্দেশে দ্রুত অভিযান পরিচালনা ভারত ও বাংলাদেশ মিলিত বাহিনীর পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয়।
