গণহত্যা শুরুর পর পাকিস্তানকে যদিও চীন নিয়মিত অস্ত্র সরবরাহ করে এসেছে, তবু মে থেকে উপমহাদেশীয় প্রশ্নে চীন কোন প্রকাশ্য মতামত ব্যক্ত করেনি। অনুমান করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পক্ষে মওলানা ভাসানী ও চীন-সমর্থক কোন কোন বামপন্থী গ্রুপের ভূমিকা, পাকিস্তানী বাহিনীর বিরামহীন বর্বরতা, আগস্টে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি প্রভৃতি ঘটনা চীনকে বাংলাদেশের পরিস্থিতির জটিলতা সম্পর্কে অধিকতর বাস্তববাদী করে তুলেছে। হঠাৎ জানা গেল, সেই চীনের ‘আমন্ত্রণক্রমে উচ্চ সামরিক প্রতিনিধিদের সমবায়ে গঠিত পাকিস্তানের এক প্রতিনিধিদল ‘পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং উপমহাদেশের সাম্প্রতিক বিকাশ সম্পর্কে আলোচনার জন্য পিকিং উপস্থিত হয়েছে। পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ করার ব্যাপারে চীনের নিজস্ব আগ্রহ কতটু ছিল তা অজ্ঞাত। তবে পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলের সফর শেষে দেখা যায়, চীন ভারতের জন্য চিরাচরিত নিন্দাজ্ঞাপন ছাড়া পাকিস্তানের জন্য বেশীদূর অগ্রসর হতে আগ্রহী নয়–এমনকি আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে প্রথাগত যুক্তইশতেহার প্রকাশের স্বার্থেও। বিভিন্ন ঘটনাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ করার ব্যাপারে চীনের আগ্রহ ছিল সামান্যই, সম্ভবত অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধে পিকিং-এ অনুষ্ঠিত চৌ-কিসিঞ্জার আলোচনা থেকেই এর উৎপত্তি। পূর্ব পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য চীনা সেনাবাহিনীর সীমিত হস্তক্ষেপের পক্ষে সকল যুক্তিজাল বিস্তার এবং সমূহ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি উচ্চারণের পরেও পিকিং-এ কিসিঞ্জার যদি স্বভাবত সাবধানী চীনা নেতৃত্বকে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল অথচ সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে দ্বিধান্বিত দেখতে পান, তবে তাদের কাছে আর এক প্রস্থ ধরনা দেওয়ার জন্য পাকিস্তানীদের পাঠানোর প্রয়োজন কিসিঞ্জারেরই প্রথম উপলব্ধি করার কথা। পাকিস্তানীদের জন্য চীনের আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহ করা, বা চীনের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ভুট্টোর মত ব্যক্তিত্বকে প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে সুপারিশ করা কিসিঞ্জারের পক্ষে ছিল অপেক্ষাকৃত সহজ কাজ।
পাকিস্তানী প্রতিনিধিদলে বিমানবাহিনীর প্রধান রহিম খান, সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান ও নৌবাহিনীর প্রধান রশীদ আহমদ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই সফরের সামরিক উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়। কিন্তু এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বপদে ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ব্যক্তিগত প্রতিনিধি’ হিসাবে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নিয়োগ বেশ কিছু বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কেননা ২৬শে মার্চ আওয়ামী লীগ। বেআইনী ঘোষিত হওয়ার পর থেকে ভুট্টো ‘৭০-এর নির্বাচনের বিজয়ী দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের প্রধান হিসাবে ক্ষমতা লাভের জন্য যতই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন ততই ক্ষমতাসীন জান্তা তার ক্ষমতারোহণের পথ দুরূহ করতে থাকে। বস্তুত ইয়াহিয়ার ‘বিশেষজ্ঞ-প্রণীত’ খসড়া শাসনতন্ত্র এবং জাতীয় পরিষদের তথাকথিত ‘উপনির্বাচনে’ দক্ষিণপন্থী প্রার্থীদের ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ ঘোষণা করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভুট্টোকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত রাখা। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে এক অজ্ঞাত অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী মধ্যস্থতায় ইয়াহিয়া-ভুট্টো সম্পর্কে হঠাৎ উন্নতি ঘটে। ১লা নভেম্বর ঘোষণা করা হয় আওয়ামী লীগের শূন্য ঘোষিত আসনের উপনির্বাচনে ভুট্টোর পিপলস্ পার্টির পাঁচজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে এবং অন্তত আরও ছ’জনের অনুরূপভাবে ‘নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এর চারদিন বাদে ভুট্টো পাকিস্তানী সামরিক প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে পিকিং যান।
চীনকে ভারতের উত্তর সীমান্তে সামরিক হস্তক্ষেপে সম্মত করানোর ক্ষেত্রে এই মিশনের ব্যর্থতার সংবাদ একাধিক সূত্রে প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও এর ‘সাফল্য সম্পর্কে ভুট্টোর দাবী ও দ্ব্যর্থক কথাবার্তায় চীনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু সংশয় আমাদের মধ্যে বিরাজ করতে থাকে। চীনের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুট্টোর সচেতন অতিশয়োক্তি পাকিস্তানী জান্তার জন্য সমূহ বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে বলে পরবর্তীকালে জানা যায়। ইতিপূর্বে চীনের জাতিসংঘ সদস্যপদ লাভের জন্য ইন্দিরা গান্ধী যে অভিনন্দন বার্তা পাঠান তার জবাবে ভুট্টো-মিশনের প্রত্যাবর্তনের পর চৌ এন লাই ভারত ও চীন উভয় দেশের জনগণের বন্ধুত্ব বন্ধন উন্নত হওয়ার আশা প্রকাশ করে এক তারবার্তা প্রেরণ করেন। কিন্তু নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে–আমেরিকা ও পাকিস্তানের উপর্যুপরি প্রচেষ্টার জন্যই হোক, মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর ক্রমবর্ধিত চাপের মুখে পাকিস্তানের হতদ্দশা দৃষ্টেই হোক, অথবা চীনের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে আসায় চীনের নেতৃত্ব পুনরায় নিজেদের সবল মনে করার জন্যই হোক–চীন পাকিস্তানের সমর্থনে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বেঞ্জামিন ওয়েলার্ট যখন পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যায় ব্যস্ত এবং অপরদিকে ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী প্রতিনিধিদল যখন সামরিক হস্তক্ষেপে চীনা নেতৃত্বকে সম্মত করার জন্য পিকিং গমনে উদ্যত, সেই সময় ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে মার্কিন প্রশাসনের উপমহাদেশীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার সুযোগ অতি সামান্যই ছিল। যে কারণে ইন্দিরার এই দূরযাত্রা, সেই শরণার্থী সমস্যা সম্পর্কে নিক্সন তার প্রকাশ্য বিবৃতি-বক্তৃতায় সম্পূর্ণ নিরব থাকেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তিন ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকেও তিনি শরণার্থী সংক্রান্ত সমস্যা এড়িয়ে যান, সীমান্ত থেকে সৈন্য প্রত্যাহার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহাস্য বন্ধ করার প্রয়োজন উল্লেখ করেন, এবং পাকিস্তানকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা অত্যন্ত সামন্য বলে দাবী করেন। নিক্সনের একমাত্র ‘কনসেশন’ ছিল পাকিস্তানকে দেয় ৩.৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সাহায্য বন্ধ ঘোষণার। শেখ মুজিবের মুক্তি ও সঙ্কটের নিরস্ত্র সমাধানে নিক্সনের সহযোগিতা লাভের কোন ক্ষীণ আশা তখনও যদি ইন্দিরা গান্ধীর থেকে থাকে, তবে তা সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে, কোন যুক্তইশতেহার ব্যতিরেকেই, তিনি স্বদেশের পথে পাড়ি জমান ফ্রান্স এবং পশ্চিম জার্মানী হয়ে। প্যারিসের বহুলাংশে সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে ইন্দিরা এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করেন: পূর্ব বাংলার একমাত্র সমাধান স্বাধীনতা, শীঘ্রই হোক আর দেরীতেই হোক এ স্বাধীনতা আসবেই। নভেম্বরের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে কেবল ইন্দিরা গান্ধীই নন, আরো অনেক মহল থেকে একই পরিণতির কথা উচ্চারিত হয়েছিল প্রাঞ্জল ভাষায়।
