অবশ্য এক্ষেত্রে আশঙ্কা ছিল এই যে, বাংলাদেশ-ভারতের এই অভিযান দৃষ্টে পাকিস্তান দ্রুত তাদের সৈন্য গুটিয়ে এনে ঢাকা নগরী অবরোধের প্রচেষ্টা চালাতে পারে। পাকিস্তানীদের হাতে ঢাকার জনসমষ্টি পণবন্দী (hostage) হিসাবে অবরুদ্ধ হওয়ার পর তাদের মুক্ত করার প্রচেষ্টায় অকল্পনীয় প্রাণহানী এবং বাড়ীঘর ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তো ছিলই তদুপরি পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয় বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল প্রবল। এই অবস্থায় চীনের সম্ভাব্য ভূমিকা অস্পষ্ট হয়ে থাকলেও, মার্কিন সপ্তম নৌবহরের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ যে পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের প্রত্যাশিত পরাজয়কে অত্যন্ত অনিশ্চিত করে তুলতে পারে এবং তার ফলে মুক্তিসংগ্রাম যে অধিকতর দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী পর্বে প্রবেশ করতে পারে, সে জাতীয় আশঙ্কা নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ও আমার মধ্যে আলোচিত হয়। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের আশঙ্কা প্রবল বলে গণ্য করলেও আমরা এই উপলব্ধিতে পৌঁছি যে, ঢাকার চতুষ্পর্শ্বে দ্রুত ব্যুহ রচনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের নিজস্ব সামর্থ্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোন কার্যকর হস্তক্ষেপ সম্ভব নয়। ঢাকার বুকে ‘সর্বশেষ লড়াই’ সংঘটনের জন্য কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনা পাকিস্তানের রয়েছে কি না অথবা ঢাকায় ব্যুহ রচনার মত কোন রিজার্ভ সৈন্যের আয়োজন তাদের আছে কি না, তা আমাদের অজ্ঞাত ছিল। তৎসত্ত্বেও ঢাকা নগরীর সম্ভাব্য অবরোধ, মার্কিন সপ্তম নৌবহরের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি ঊর্ধ্বতন ভারতীয় নেতৃত্বের গোচরে আনার বিষয় স্থির হয়।
বস্তুত নভেম্বরে যুদ্ধের সম্ভাবনা যতই নিকটতর ও স্পষ্টতর হতে থাকে, ততই তার অন্তর্নিহিত সমস্যাবলী অধিকতর মুখ্য ও জরুরী হয়ে উঠতে থাকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যবস্থাপনা ও আক্রমণধারা উন্নত করার জন্য যে সব বিষয় এতদিন অগ্রাধিকার লাভ করে এসেছিল সেগুলির প্রয়োজন হ্রাস পেতে শুরু করে, এমনকি কোন কোন বিষয়ে অর্জিত অগ্রগতি অংশত গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। যেমন, পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানের চার ডিভিশন এবং ভারতের সাত ডিভিশন সৈন্যের শক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্র প্রস্তুতির কাজে বিগত কয়েক মাস ধরে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান সর্ববৃহৎ হলেও, এই দুই পেশাদার সশস্ত্রবাহিনীর প্রত্যাসন্ন সংঘাতের পটভূমিতে অনিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাদের, এমনকি বাংলাদেশের নিয়মিত ব্যাটালিয়ানসমূহের ভূমিকা পূর্বাপেক্ষা সীমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু সীমিত ভূমিকার অর্থ গুরুত্বশূন্য ভূমিকা নয়। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযানের মূল দায়িত্ব ভারতীয় কমান্ডের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া সত্ত্বেও শত্রু-অবস্থানের পশ্চাতের তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট কৌশল পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামরিক কমান্ডের সহায়ক ভূমিকার প্রভূত প্রয়োজন ছিল।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে স্বভাবতই যে উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল, ওসমানী তা থেকে নিজকে বহুলাংশে দূরে সরিয়ে ফেলেন এবং সার্ভিস ম্যানুয়াল রচনার মত এমন সব কাজে নিজকে ব্যস্ত রাখেন যার সঙ্গে প্রত্যাসন্ন চূড়ান্ত অভিযানের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না। অক্টোবরের শেষে ওসমানীর আপত্তি সত্ত্বেও যুগ্ম কমান্ডব্যবস্থা গৃহীত হওয়ার পর থেকে ওসমানীর আচরণে কোন স্পষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা অথবা তাঁর বক্তব্যে গ্রহণযোগ্য বিকল্প রণকৌশলের প্রস্তাব ছিল না। বস্তুত ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে নিয়মিত বাহিনীর তৎপরতার ফলে উদ্ভূত নির্দিষ্ট সমস্যাদি প্রতিবিধানের জন্য তাজউদ্দিন যখন যুগ্ম-কমান্ড গঠনের পক্ষে মনস্থির করেন, তখন এ বিষয়ে কোন বিকল্প প্রস্তাব না করেই যুগ্ম-কমান্ড গঠিত হলে নিজে পদত্যাগ করবেন বলে ওসমানী তাজউদ্দিনকে হুমকি দেন। ইতিপূর্বে বিভিন্ন আরো কয়েকটি ইস্যুতে ওসমানী এ ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এই প্রথমবার তাজউদ্দিন তাঁকে জানান, লিখিতভাবে এই ইচ্ছা ব্যক্ত করলে, তাজউদ্দিন এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবেন। অতঃপর ওসমানী যুগ্ম-কমান্ড অথবা পদত্যাগপত্র সম্পর্কে কোন উচ্চবাচ্য করেননি। কিন্তু ভারতীয় সামরিক নেতৃত্ব সম্পর্কে তার পূর্বসঞ্চিত বিরূপ ধারণা এরপর থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এর প্রভাব রণাঙ্গনে নিয়মিত বাহিনীর উপর কতখানি পড়েছিল বলা শক্ত; তবে সেক্টর অপারেশনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমান্ডের ভূমিকা বরাবরই যতটা দুর্বল ও অনিয়মিত ছিল, নভেম্বরেও তার কোন তারতম্য ঘটেনি বলে মনে করা চলে। চূড়ান্ত অভিযানের প্রাক্কালে ওসমানীর এহেন ভূমিকার ফলে ভারতীয়দের সঙ্গে গৃহীতব্য তৎপরতা ও কৌশলের সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তার অনেকখানি তাজউদ্দিনকেই পূরণ করার চেষ্টা করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আব্দুল করিম খোন্দকার বিমানবাহিনীভুক্ত অফিসার হলেও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের স্বচ্ছতার দরুন পেশাগত পরামর্শের জন্য আরও বেশী নিয়োজিত হতেন।
পাকিস্তানের সম্ভাব্য অবরোধ ও ধ্বংসের হাত থেকে ঢাকা নগরীকে রক্ষা করার চিন্তা ছাড়াও অন্য যে একটি উদ্বেগ এ সময় তাজউদ্দিনের জন্য মুখ্য হয়ে ওঠে তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশিত সাফল্যের পর প্রতিহিংসা-হত্যার বিপদ থেকে শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা করার। তাজউদ্দিনের আশঙ্কা জন্মেছিল প্রত্যাসন্ন চূড়ান্ত লড়াইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে শেখ মুজিবের জীবন রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, যদিও বাস্তবক্ষেত্রে আগস্ট মাস থেকে তাঁর জীবনের নিরাপত্তা উন্নত হওয়ার লক্ষণ ক্রমশ প্রকাশ পেয়ে চলে। ৩রা আগস্টে ইয়াহিয়া খান যখন ঘোষণা করেন যে দেশদ্রোহিতার অপরাধে শীঘ্রই শেখ মুজিবের বিচার এবং উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা হবে তখন শেখ মুজিবের জীবনের নিরাপত্তা কিছুমাত্র রয়েছে বলে মনে করা কঠিন হয়ে পড়ে। ৫ই আগস্টে সামরিক জান্তার যে তথাকথিত ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশিত হয়, তাতে ‘সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ’ সংঘটনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আওয়ামী লীগের ‘ষড়যন্ত্রের আয়োজন সবিস্তারে উল্লেখ করা হয়। ফলে আসন্ন বিচারের রায় কি দেওয়া হবে, সে সম্পর্কে কার্যত সকল অস্পষ্টতা দূর হয়। ৭ই আগস্টে আওয়ামী লীগের যে ৭৯ জনের নাম জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ থেকে বাতিল করা হয়, তাদের মধ্যে শেখ মুজিবের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ৯ই আগস্ট পাকিস্তান থেকে পুনরায় ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য শেখ মুজিবের শীঘ্রই বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার করা হবে। কিন্তু ঐ দিনই অপ্রত্যাশিতভাবে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নয়াদিল্লীর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সময়ের তফাৎ সাড়ে দশ ঘণ্টার মত; ফলে মৈত্রীচুক্তি সংক্রান্ত ঘোষণার পর ঐ দিনই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কোন ‘দ্রুত ব্যবস্থা’ (summary action) গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য পাকিস্তানকে সতর্ক করে দেয়। ফলে পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী ১১ই আগস্টে লায়ালপুরে বিশেষ সামরিক আদালতে রুদ্ধদ্বার বিচার শুরু হলেও ঐ দিনই তা মুলতবি ঘোষণা করা হয়। এই সেপ্টেম্বরে যখন পুনরায় বিচার শুরু হয়, তখন শেখ মুজিবের পক্ষ সমর্থনের জন্য এ. কে. ব্রোহী এবং তাঁর তিনজন সহকারী আইনজীবীকে নিযুক্ত থাকতে দেখা যায়। ২রা অক্টোবরে পাকিস্তানের সামরিক আদালত শেখ মুজিবকে ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের সুপারিশ
