২১শে অক্টোবর কার্যকরী কমিটির বৈঠকের পর সভা মুলতবি রেখে পরদিন বাংলাদেশ নেতৃবৃন্দ ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য দিল্লী যান। ২৪শে অক্টোবর থেকে ১৯ দিনের জন্য ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করতে চলেছেন। এই সফরের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ইন্দিরা গান্ধী জানান যে, যদিও আসন্ন সফরের মাধ্যমে তিনি শান্তিপূর্ণ পথে বাংলাদেশ সমস্যার নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারসমূহকে সম্মত করানোর শেষ চেষ্টা করবেন, তবু তিনি এ সম্পর্কে বিশেষ আশাবাদী নন। তিনি আরও জানান, যদি কোন সুফল না পাওয়া যায়, তবে তার ফিরে আসার পর এবং বাংলাদেশে পথঘাট আরো শুষ্ক হওয়ার পর পাকিস্তানী দখলের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে দেখা হবে। পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে অংশগ্রহণের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর এরূপ স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল এই প্রথম। জানা যায়, তার মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্যদের কাছেও তা গোপন রাখা হয়েছিল। কাজেই একাধিক কারণেই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যাবশ্যক ছিল। কিন্তু অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এই অতীব আনন্দের সংবাদ বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার অপরাপর সদস্যদের অবহিত করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মনে করায় তার কাছ থেকে সমগ্র মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিসভা থেকে আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটি এবং কার্যকরী কমিটি থেকে প্রায় সর্বসাধারণ্যে প্রচার হতে থাকে যে বিদেশ সফর থেকে ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যাবর্তনের পরই ভারত যুদ্ধ ঘোষণা করবে। এই প্রচারের অন্যতম ফল হিসাবে অবশ্য আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির মুলতবি বৈঠকের আলোচনা আরও বেশী গঠনমূলক হয়ে ওঠে।
দিল্লীতে সৈয়দ নজরুলের উপস্থিতিতে তাজউদ্দিন প্রথমবারের মত ইন্দিরা গান্ধীর কাছে RAW–এর সমর্থনের ফলে ‘মুজিব বাহিনী’ যে নানা বিড়ম্বনা সৃষ্টি করে চলেছে তার উল্লেখ করেন। ইন্দিরা এই অবস্থার ত্বরিত প্রতিবিধানের জন্য সভায় উপস্থিত ডি. পি. ধরকে নির্দেশ দেন। ডি. পি. ধর ‘মুজিব বাহিনী’কে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থা করার জন্য মেজর জেনারেল বি. এন. সরকারকে নিয়োগ করেন। এই উদ্দেশ্যে যথাশীঘ্র কোলকাতায় এক বৈঠকেরও আয়োজন করা হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তাজউদ্দিন ও কর্নেল ওসমানী, মুজিব বাহিনী’র পক্ষে তোফায়েল আহমদ, সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক (আমন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও শেখ মণি অনুপস্থিত থাকেন) এবং ভারতের সামরিক বাহিনীর পক্ষে মেজর জেনারেল সরকার ও ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার এক পর্বে একজন যুবনেতা দাবী করেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার অধিকার একমাত্র তারই রয়েছে। এরপর আলোচনা আর এগুতে পারেনি। পরে বি. এন. সরকার কেবল যুবনেতাদের নিয়ে আলোচনার জন্য ফোর্ট উইলিয়ামে’ মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন করেন। কিন্তু সেখানে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলার ‘একমাত্র অধিকারী’ সেই যুবনেতা ছাড়া আর কেউই হাজিন হননি। কয়েকদিন বাদে যেহেতু যুবনেতাদের সকলে আগরতলায় উপস্থিত থাকবেন, সেহেতু সেখানেই তাদের সঙ্গে বি. এন. সরকারের পরবর্তী বৈঠকের সময় স্থির করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ‘মুজিব বাহিনী’র সকল নেতা একযোগে অনুপস্থিত থাকেন; মেজর জেনারেল সরকারও এই পণ্ডশ্রম বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য জরুরী কাজে মনোনিবেশ করেন।
অধ্যায় ১৮: অক্টোবর – নভেম্বর
নভেম্বরের শুরু থেকেই উপমহাদেশের আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান এবং তৃতীয় সপ্তাহে ভারত পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্তেই নিজ নিজ সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন করে। পূর্বাঞ্চলে সেই মার্চ থেকে পাকিস্তান যে গণহত্যা ও সন্ত্রাসের শাসন শুরু করেছিল তখনও তার কোন বিরাম ঘটেনি, কিন্তু অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে তাদের প্রাধান্য আর প্রশ্নাতীত নয়। সীমান্তেও তারা ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর বৃহত্তর চাপের সম্মুখীন। পাকিস্তান মালদহ ও ত্রিপুরা রাজ্যের দিকে অসফল কিছু প্রতি-আক্রমণের প্রচেষ্টা চালাবার পর ভারতীয় কাশ্মীরকেই তারা পাল্টা চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্র হিসাবে বেছে নেয়। পূর্বাঞ্চলে সীমান্তে তাদের ভূমিকা মূলতই আত্মরক্ষামূলক-অবশিষ্ট সীমান্ত ঘাটি (BOP) গুলিকে নির্ভর করে তাদের সৈন্যবল সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত। যদি ভারত ও বাংলাদেশ বাহিনী মুক্তাঞ্চল গঠনের জন্য কিছুটা ভিতরের দিকে অগ্রসর হয়, তবে তা প্রতিরোধ করার জন্য ইতিমধ্যেই পাকিস্তান সীমান্তবর্তী শহরগুলির সামরিক ঘাঁটি ‘দুর্গের’ মত সুরক্ষিত করে তুলেছে। সেখানেই যাতে তাদের সীমান্তবর্তী সৈন্যরা পুন: একত্রিত হয়ে বৃহত্তর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
বস্তুত জুন-জুলাই মাসে, মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘবদ্ধ তৎপরতার সময় সীমান্ত এলাকায় মুক্তাঞ্চল গঠন প্রতিরোধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য পাকিস্তান যে বিওপিভিত্তিক সীমান্ত প্রতিরক্ষার কৌশল অবলম্বন করে তা বিগত তিন মাসে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন এবং ভারতীয় বাহিনীর বৃহত্তর চাপ সত্ত্বেও মূলত অপরিবর্তিত থাকে, এর সঙ্গে কেবল তাদের পিছনের ঘাঁটিগুলির অবস্থান যুদ্ধের উপযোগী করে সুদৃঢ় করে তোলা হয়। জানা যায়, অক্টোবরের শেষ অবধি পাকিস্তানী সমরনায়কদের এই ধারণা ছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর চাপ কমানোই ভারতীয় বাহিনীর সীমান্ত তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ। সম্ভবত এই আংশিক উপলব্ধি থেকে তারা ঢাকার জন্য স্বল্প সংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রাখে। অবশ্য গোটা সীমান্ত জুড়ে অন্যন নব্বইটি বিওপি প্রহরা, সীমান্তবর্তী দশটি শহরে ‘দুর্গ’ ও আরো কিছু সংখ্যক শহরে ‘মজবুত ঘাঁটি’ তথা ‘Strong Point’ প্রতিষ্ঠা এবং তদুপরি সীমান্তের বিভিন্ন অংশে ভারতীয় ও বাংলাদেশের বাহিনীর ব্যাটালিয়ান অথবা বৃহত্তর আঘাত মোকাবিলায় নিযুক্ত থাকার পর ঢাকা বা তার চারপাশে সর্বশেষ লড়াইয়ের মত উদ্বৃত্ত সৈন্য কতটুকু তাদের ছিল, তাও বিচার্য। উদ্বৃত্ত সৈন্যের অভাব হেতু সীমান্ত থেকে প্রতিপক্ষের জোরাল আক্রমণের মুখে পশ্চাদপসরণ করে ‘দুর্গের’ মধ্যবর্তী ভূভাগ নিয়ন্ত্রণ করা তাদের সাধ্যের বাইরে ছিল। সে ক্ষেত্রে নিয়াজীর তথাকথিত ‘দুর্গ’ পাকিস্তানী সেনাদের আত্মহননের খেদায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল সমধিক। পাকিস্তানের সামরিক পরিকল্পনার এই বিভ্রান্তি ও অবাস্তবতা কেবল তাদেও সৈন্যের সংখ্যাল্পতা থেকে উদ্ভূত ছিল না, প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য উপলব্ধিতে তাদের অক্ষমতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল।
