পক্ষান্তরে, অক্টোবর মাসে দু’একটি সীমান্তবর্তী ‘মজবুত ঘাঁটি’র সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের পক্ষে এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ঢাকা অভিমুখে দ্রুত সামরিক অভিযান সম্ভব করার জন্য এই সব ‘মজবুত ঘাঁটি’ ও ‘দুর্গকে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই উপযুক্ত কৌশল। এই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই কৌশল কার্যকর করার জন্য মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় অজানা বিকল্প পথঘাট, নদীনালা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বিশদ তথ্যাদি সংগৃহীত হতে শুরু করে। বস্তুত এপ্রিল থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বাহিনীর অফিসার এবং নন-কমিশন্ড অফিসারগণ পাকিস্তানের সামরিক বিষয়াদি সম্পর্কে, যথা–সংগঠন, শক্তিমত্তা, অবস্থান, অস্ত্রসম্ভার, গোলা-বারুদ, অবকাঠামো, লজিস্টিকস্, পরিকল্পনা, কৌশল, নেতৃত্ব, তথ্য, যোগাযোগ, ট্রেনিং, মনস্তাত্ত্বিক গঠন প্রভৃতি বিষয়ে এবং সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় যথা–স্থানীয় বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক উপাদান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পথঘাট, নদীনালা, সেতু-ফেরী, শক্তি ও জ্বালানী ইত্যাকার বিষয়ে যে সমুদয় তথ্য ভারতীয়পক্ষকে সরবরাহ করে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয়োপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও অভিযান পরিচালনার কাজে তার মূল্য ছিল অপরিসীম। কেবল তা-ই নয়, মুক্তিযোদ্ধারাও পাকিস্তানী ইউনিটসমূহের সর্বশেষ অবস্থান, আয়তন, গতিবিধি এবং সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য নিয়মিত সরবরাহ করে তাদের বিরুদ্ধে আসন্ন অভিযানকে অসামান্যভাবে সাহায্য করে।
নভেম্বরের শুরুতে প্রত্যক্ষ তৎপরতার ক্ষেত্রেও তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা আগের তুলনায় অনেক বেশী সক্রিয়। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পুনরায় তাদের যে তৎপরতা আরম্ভ হয়, নভেম্বরের শুরুতে সেই তৎপরতার মান অধিকতর পরিপক্ক এবং তৎপরতার পরিধিও অনেক বিস্তৃত। কোন এলোপাতাড়ি আক্রমণ নয়, বরং লক্ষ্য ও কৌশল সম্পর্কে যথোপযুক্ত পরিকল্পনার ভিত্তিতেই তারা দখলদার সৈন্যদের চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে শুরু করে। ইতিপূর্বে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমাগত শক্তি বৃদ্ধির ফলে এবং অংশত কোন কোন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশল পরিবর্তিত হওয়ার ফলে রাজাকার বাহিনীর অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও সুবিধাবাদী অংশটি ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকে এবং এই অবস্থায় এই বাহিনীর আয়তন বৃদ্ধির জন্য দখলদার সামরিক শাসকেরা জামাতে ইসলাম ও বিহারী সম্প্রদায়ের সমবায়ে গঠিত ‘আল-বদর’ ও ‘আল-শামস বাহিনীদ্বয়ের গোড়া সদস্যদের উপর অধিকতর নির্ভর করতে শুরু করে। এই সমুদয় বাহিনীর সম্মিলিত তৎপরতা সত্ত্বেও স্থানীয় জনসাধারণ তাদের পূর্ববর্তী ভয়ভীতি ও জড়তাকে অতিক্রম করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য সকল উপায়ে সাহায্য করতে শুরু করে। ফলে দখলদার সৈন্য, তাদের স্থানীয় দোসর এবং সামরিক ও আধাসামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ ক্ষমতা বিরাটভাবে বৃদ্ধি পায়, দখলদার সেনাদের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়তে থাকে এবং ক্রমশ দখলদার সৈন্যদের মধ্যে হতাশা, অবসাদ ও আতঙ্কের আবহাওয়া বিস্তার লাভ করতে থাকে।
মুক্তিযোদ্ধাদের এই সব তৎপরতার মূল্য ছিল অপরিসীম। দখলদার সেনাদের হতোদ্যম ও যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত করে তুলে চূড়ান্ত আঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুতের যে সামরিক দায়িত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ছিল, সেই লক্ষ্য অর্জনের দিকে তারা এখন দ্রুত ধাবমান। এই তৎপরতার রাজনৈতিক গুরুত্ব এর সামরিক মূল্যের চাইতে কোন অংশে কম ছিল । অক্টোবর-নভেম্বরের তৎপরতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র ছাত্র ও তরুণের দল অনন্য প্রত্যয়ের সাথে স্বদেশবাসীর কাছে, বিশ্বের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। বিশ্বের সকল সংবাদমাধ্যমের কাছে এ কথা স্বীকৃতি লাভ করে যে, এই অকুতোভয় তরুণেরা নিজেদের সীমিত শক্তি ও অস্ত্রবল নিয়ে দেশের সকল অঞ্চলে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে চলেছে এক শক্তিশালী দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার নিজস্ব শক্তির মহিমায় আত্মপ্রতিষ্ঠিত না হলে, পরবর্তীকালে ভারতের অংশগ্রহণের পর এই যুদ্ধকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ হিসাবে গণ্য করা বিশ্ববাসীর পক্ষে যেমন কঠিন হত, তেমনি ভারতও সম্ভবত রাজনৈতিক ও সামরিক উভয়বিধ কারণে সর্বাত্মক সাহায্য প্রদানের প্রশ্নে দ্বিধান্বিত হয়ে থাকত। অন্তত ডি. পি. ধর ১৬ ও ১৭ই অক্টোবরে প্রাঞ্জল ও বিশদভাবেই তাদের এই দ্বিধার কথা আমার কাছে প্রকাশ করেন।
দেশের ভিতরে মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসিক তৎপরতার মুখে পাকিস্তানী বাহিনীর অবস্থা যখন ক্রমশ খারাপের দিকে, তখন পাকিস্তানের মোট সৈন্যসংখ্যার যে চার-পঞ্চমাংশ সীমান্তে মোতায়েন ছিল তারা ক্রমবর্ধিত সামরিক চাপের সম্মুখীন হয়। সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য ভারতীয় বাহিনী যে ভূমিকা পালনে নিযুক্ত ছিল সেই ভূমিকা অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। নভেম্বরের শুরুতে পাকিস্তানী জান্তার পক্ষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব যে, ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত ও ক্রমবর্ধিত সামরিক চাপের মুখে পাকিস্তানের ক্লান্ত, হতোদ্যম চার ডিভিশন সৈন্য, যৎসামান্য বিমান ও নৌবহর এবং ৭৩,০০০ আধা-সামরিক জনবল নিয়ে দীর্ঘদিন পূর্বাঞ্চলের উপর ঔপনিবেশিক দখল রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। এমতাবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের এই সংঘর্ষকে পাক-ভারত যুদ্ধে পরিণত করে ভারতীয় কাশ্মীরের কিয়দংশ দখল করা, মিত্ররাষ্ট্রদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ত্বরান্বিত করা এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পূর্বতন স্থিতাবস্থা কায়েম করার জন্য সচেষ্ট হওয়াই পাকিস্তানী শাসকদের কাছে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য পন্থা হিসাবে বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল। ভারতীয় কাশ্মীরের কিয়দংশ দখলের জন্য সামরিক প্রস্তুতি ও ক্ষমতা পাকিস্তানের নিজস্ব আয়ত্তেই ছিল। বরং বৃহত্তর যুদ্ধের জন্য মিত্ররাষ্ট্রদের সামরিক হস্তক্ষেপ সংগঠিত করা পাকিস্তানের জন্য অপেক্ষাকৃত দুরূহ ছিল। স্পষ্টতই চীন হস্তক্ষেপে অপারগ ছিল ভারত সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি, উসূরী নদী বরাবর চল্লিশ ডিভিশন এবং সিংকিয়াং সীমান্ত বরাবর আরও ৬/৭ ডিভিশন সোভিয়েট সৈন্যের উপস্থিতি প্রভৃতি
