কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে পাকিস্তানের যুদ্ধ যাত্রার আগেই যদি শীত এসে পড়ে এবং উত্তরের গিরিপথসমূহ তুষারবৃত হওয়ায় পরবর্তী এপ্রিল পর্যন্ত চীনের হস্তক্ষেপ অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে পাকিস্তানকে পরবর্তী এপ্রিল/মে পর্যন্ত যুদ্ধের উদ্যোগ গ্রহণ থেকে সম্ভবত বিরত থাকতে হত। পাকিস্তানের এই অক্ষমতা সাপেক্ষে শীতের শেষ দিকে চূড়ান্ত লড়াই পিছিয়ে দিয়ে দু’তিন মাস অতিরিক্ত সময় লাভ করা যায় কি না, সে সম্ভাবনাও বিবেচনা করে দেখা হয়। সেপ্টেম্বরে তাজউদ্দিন ও ডি. পি. ধর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি মৈত্রীচুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা নিয়ে কিছু আলাপ আলোচনা করেছিলেন। মুক্তাঞ্চল গঠনভিত্তিক পূর্ববর্তী রণনৈতিক চিন্তার অবাস্তবতা তখন উভয় পক্ষের কাছেই যথেষ্ট স্পষ্ট। তবে সেপ্টেম্বরেই এ জাতীয় মৈত্রীচুক্তি সম্পর্কে সম্মত হওয়া ভারতের জন্য একাধিক কারণেই অসম্ভব ছিল। তা ছাড়া উভয় পক্ষের জন্যই এরূপ চুক্তি সম্পাদনের সর্ববৃহৎ বিপদ ছিল এই যে, প্রস্তাবিত চুক্তি যেহেতু বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জ্ঞাপনের সমার্থক, সেহেতু এ কথা প্রকাশিত হলে তৎদণ্ডেই-অর্থাৎ উত্তরের গিরিপথসমূহ তুষারাবৃত হওয়ার আগেই পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণা একরূপ অবধারিত ছিল। অবশ্য এই চুক্তিকে গোপন রেখে পাকিস্তানের সম্ভাব্য ত্বরিত প্রতিক্রিয়া এড়ানো যেত। কিন্তু চুক্তির সম্ভাব্যতা নিয়ে ডি. পি. ঘরের আলোচনা সত্ত্বেও, এর পক্ষে বা বিপক্ষে ভারত সরকারের মনোভাব সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত হয়নি।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে অক্টোবরে এমন আশাবাদ খুব অসঙ্গত ছিল না যে এই চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হলে ভারত সরকারের স্বীকৃতি এবং সংগ্রামের চূড়ান্তপর্বে ভারতীয় সৈন্য নিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশের আয়ত্তে আসবে। এহেন আশাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব কাঠামোবিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের সংহত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য চূড়ান্ত সংগ্রাম যতদূর সম্ভব পিছিয়ে দিয়ে কয়েক মাস বাড়তি সময় সংগ্রহের চেষ্টা করা যুক্তিযুক্ত ছিল। দিল্লীতে ১৬ই অক্টোবর ডি. পি. ধরের কাছে এই বাড়তি সময়ের প্রয়োজন ব্যাখ্যাকালে আমি পাকিস্তানী দখল অবসানের পর সম্ভাব্য অরাজকতা ও সামাজিক হানাহানির চিত্র তুলে ধরি।
কিন্তু কিছুদূর আলোচনার পরেই স্পষ্ট হয়, তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে যে বিষয়টি নিয়ে তারা অধিকতর বিব্রত ও চিন্তান্বিত, তা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির বিষয়ে নয়, বরং স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে এই বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা কেন তখনও সক্রিয় নয়, তাই নিয়ে। তাদের প্রধান দুশ্চিন্তা মুক্তিসংগ্রামের এই নিশ্চলতা থেকেই উদ্ভূত মুক্তিযোদ্ধারা যদি দখলদার সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে না-ই ঘটাতে পারে, তবে কিভাবে একে বাংলাদেশের নিজস্ব মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে বিশ্বের সম্মুখে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব? তৎসত্ত্বেও যদি ভারতীয় বাহিনীকে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করতে হয় তবে কিভাবে দ্রুত বিজয় সুনিশ্চিত করা সম্ভব? এবং যে যুদ্ধ বাংলাদেশের নিজস্ব মুক্তিযুদ্ধ হিসাবে বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং ভারতীয় বাহিনীর অভিযান যেখানে মন্থর ও বাধাগ্রস্ত, সেখানে কিভাবেই-বা বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ রোধ করা সম্ভব? তাদের অপর প্রধান উদ্বেগ ছিল বিগত কয়েক মাস ধরেই প্রায় অপরিবর্তনীয়-মুজিবনগর রাজনীতির ক্রমবর্ধমান উপদলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং বিশেষত তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে। এগুলির কোনটিরই যথার্থ সমাধান নির্দেশ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এই সব সমস্যা উত্থাপনের মধ্য দিয়ে এই বিষয়টিই স্পষ্ট করা হয় যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে যদি না বাড়ে, তবে চূড়ান্ত সংগ্রামের কোন সময়সূচীই অনুসরণ করা সম্ভব নয়, এগিয়ে আনা বা পিছিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন কার্যত অর্থহীন। তবে তিনি জানান, সমগ্র মুক্তিযোদ্ধাদের একটি জাতীয় কমান্ডব্যবস্থার অধীনে আনার জন্য এবং যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকৃত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি পর্যবেক্ষণ করে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা আবশ্যক; এবং এ বিষয়ে যদি তাদের কোন করণীয় থাকে তবে তারা তা পালন করতে সম্মত আছেন। দিল্লীতে দু’দিনে ডি. পি. ধরের সঙ্গে তিন দফা বৈঠকের পর সমস্যার উপলব্ধিকে গভীরতর করে যখন কোলকাতা ফিরে আসছিলাম তখন অধিকৃত এলাকায় ঝড়ের আগের স্তব্ধ মেঘের মত সমবেত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হঠাৎ বাতাসের দোল শুরু হয়েছিল-বাইরে থেকে যা প্রথম বুঝতেই পাওয়া যায়নি।
২০শে অক্টোবর কোলকাতায় আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। ২০ ও ২১শে অক্টোবর দু’দিন এই বৈঠক চলার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার জন্য আমন্ত্রিত হওয়ায় (এবং সম্ভবত মন্ত্রিসভার সদস্যরাও তাদের সহগমন করায়) ২৭ ও ২৮শে অক্টোবর মুলতবি সভা অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই মাসে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কার্যকরী কমিটির প্রথম বৈঠকের প্রায় সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে কার্যকরী কমিটির এটা ছিল দ্বিতীয় বৈঠক। আওয়ামী লীগের কার্যকরী বৈঠক আরও ঘন ঘন হওয়া উচিত এই মর্মে এক দাবী আওয়ামী লীগের নেতৃমহলে বিরাজমান ছিল। কিন্তু ভারতে প্রবেশের পর থেকেই শেখ মুজিবের অনুপস্থিতির ফলে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অন্তত চারটি উপদলের যুগপৎ বিরোধিতা, দলকে বিভক্ত করার জন্য বৈদেশিক শক্তির অন্তর্ঘাতী ভূমিকা এবং প্রকাশ্য ও গোপন বিদ্রোহের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আরও ঘন ঘন। কার্যকরী কমিটির বৈঠক আয়োজন করতে বা পার্টির কাজে আরও বেশী সময় বরাদ্দ করতে হয়ত তাজউদ্দিন পারতেন, কিন্তু তারপর প্রবাসী সরকারের সংগঠন ও পরিচালনার ব্যাপারে এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে রণনৈতিক আয়োজন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতটুকু সময় তিনি দিতে পারতেন, অথবা মুক্তিযুদ্ধ তার ফরে কতখানি সাহায্যপ্রাপ্ত হত, তা পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু অক্টোবরের কার্যকরী কমিটির বৈঠক শুরু হবার পর প্রথম দু’দিনের আলোচনা থেকে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের বক্তব্য এবং তাদের পরিবেশিত তথ্যাদি মুক্তিযুদ্ধের ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার পক্ষে সহায়ক ছিল। এতদিন যারা দলীয় ও সরকারী নেতৃত্ব থেকে তাজউদ্দিনের অপসারণের জন্য প্রাকশ্য প্রচার চালিয়ে এসেছেন, তাঁদের প্রতিনিধিরাও কার্যকরী কমিটির এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে তাজউদ্দিনের পদত্যাগ দাবী উত্থাপন থেকে বিরত থাকেন। তারা যে সংখ্যায় নিতান্ত অল্প, অন্তত এই উপলব্ধি থেকে কোন প্রকাশ্য আক্রমণ না চালিয়ে তারা কৌশলের পরিবর্তন করেন এবং একটি সাবকমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। ২০ ও ২১শে অক্টোবরের আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের উপর আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ কতদূর সম্প্রসারিত করা যায়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব জনাব কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত এই সাবকমিটির হাতে ন্যস্ত করা হয়।
