‘মুজিব বাহিনী’র সদস্য হিসাবে পরিচয়দানকারী এক যুবক আগ্নেয়াস্ত্রসহ সহসা একদিন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে হাজির হয়ে জানায় যে, তাদের এক নেতা তাজউদ্দিনের প্রাণ সংহারের প্রয়োজন উল্লেখ করা মাত্র স্বেচ্ছায় সে এই দায়িত্ব নিয়ে সেখানে এসেছে, যাতে তাজউদ্দিনের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়। তাজউদ্দিন তখন অফিসে সম্পূর্ণ একা। তাজউদ্দিন কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে এই যুবক তাকে আরো জানায় যে, এ বিষয়ে সে পূর্ণ স্বীকারোক্তি করার জন্য প্রস্তুত এবং কৃত অপরাধের জন্য কর্তৃপক্ষ যদি তার কোন শাস্তি বিধান করেনও, তবু তাতে তার কোন আপত্তি নেই। তাজউদ্দিন আরো কিছু প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের পর অস্ত্রসমেত যুবকটিকে বিদায় দেন। সেই সময় ‘মুজিব বাহিনী’র বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কোন কোন ইউনিটের এবং আওয়ামী লীগের একাংশের ক্ষোভ ও বিদ্বেষ এতই প্রবল ছিল যে, এই ঘটনা প্রকাশের পর পাছে কোন রক্ষক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তা রোধ করার জন্য তাজউদ্দিন ব্যাপারটিকে সম্পূর্ণ গোপন করেন। কিন্তু সম্ভবত এই ঘটনার পরেই তাজউদ্দিন মনস্থির করেন ‘মুজিব বাহিনী’র স্বতন্ত্র কমান্ড রক্ষার জন্য RAW-এর প্রয়াসকে নিষ্ক্রিয় করা এবং এই বাহিনীকে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে চূড়ান্ত চাপ প্রয়োগের সময় সমুপস্থিত।
এই সব উপদলীয় প্রশ্ন নিয়ে সময়ের যথেষ্ট অপচয় ঘটত; অথচ মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান ও সংহত করার জন্য সময় সদ্ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল সবচাইতে বেশী। অক্টোবরের মাঝামাঝি পাকিস্তান ও ভারতের সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন হওয়ার ফলে সীমান্ত পরিস্থিতি একটি নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে দ্রুত ধাবমান। অথচ তখনও অন্তত ত্রিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং প্রদান বাকী। আর যে পঞ্চাশ হাজার ইতিমধ্যে ট্রেনিং লাভ করেছে, তাদেরকে সক্রিয় করে তোলার লক্ষ্য তখনও অনায়ত্ত। রিক্রুটমেন্ট থেকে শুরু করে ট্রেনিং, সরবরাহ, শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রণ ও তৎপরতা-প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অজস্র সমস্যা প্রত্যহ চিহ্নিত হত, তার প্রশাসনিক সদুত্তর কাগজ কলমে খুঁজে পাওয়াও মাঝে মাঝে কষ্টকর হত, সেগুলি বাস্তবায়িত করা তো আরো বেশী অসুবিধার কথা। মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্থাপনার এই সব ছোট-বড় দৈনন্দিন সমস্যাবলী ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের বৃহত্তর রাজনৈতিক আদর্শ, এর আর্থ-সামাজিক লক্ষ্যের সঙ্গে সংগ্রামকে যুক্ত করার কাজটি ছিল আরও বেশী জটিল। কেবলমাত্র পাকিস্তানের সামরিক নির্যাতনের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্যই যে এই মুক্তিসংগ্রাম, অথবা উঠতি বাঙালী শাসকশ্রেণীর স্বতন্ত্র ক্ষমতাযন্ত্র সৃষ্টির জন্যই যে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রেখে পাকিস্তানের মত আর একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করা প্রয়োজন-এ কথা এত মানুষের দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন ভোগ এবং এত প্রাণ বিসর্জনের পর স্পষ্টতই যুক্তিসঙ্গত ছিল না। দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের মৌল প্রয়োজনের জন্য শিল্প জাতীয়করণের নীতি ইতিপূর্বেই মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে ঘোষিত হয়েছে এবং পরিকল্পনা সেল কিছু কিছু মধ্যমেয়াদী পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এই বৃহত্তর আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জন প্রচেষ্টার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্থাপনার দৈনন্দিন বিষয়গুলিকে গ্রথিত করার জন্য যে সংগঠন, পরিকল্পনা ও উদ্যমের প্রয়োজন ছিল, তা অংশত ব্যর্থ হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির বিভিন্নতার কারণে এবং অংশত সময়ের অপচয়ে ও অভাবে।
সময়ের প্রয়োজন সত্যই তীব্র ছিল। সময়ের প্রয়োজন ছিল যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্তব্যনিষ্ঠ অংশ ক্রমশ সক্রিয় ও সংহত হয়ে উঠতে পারে, যাতে কাজের মাধ্যমে তাদের ভিতর থেকে যোগ্যতর নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটতে পারে, তাদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে সহযোগিতার ঐক্যবন্ধন গড়ে উঠতে পারে, এবং যাতে দেশকে শত্রুমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর্থ সামাজিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কার ও পুনর্গঠনে নিযুক্ত হতে পারে। মাত্র দু-তিন সপ্তাহের প্রাথমিক সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের পর এই বিচ্ছিন্ন, যুদ্ধঅনভিজ্ঞ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববিহীন তরুণদের প্রতিকূল অথবা অসংগঠিত অবস্থার মাঝে নিক্ষেপ করে, এত অল্প সময়ের মধ্যে তাদেরকে সংগ্রামের সুসংহত শক্তিতে পরিণত করা কোন মন্ত্রবলেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু তাদের বিকাশের জন্য যতখানি সময়ের প্রয়োজন ছিল, তার পথে অন্তত দু’টি বাধা ছিল অতিশয় প্রবল। প্রথম সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে নব্বই লক্ষ শরণার্থীর দুর্বিষহ ভার বহনে ভারতের ক্রমবর্ধমান অক্ষমতা। দ্বিতীয় উত্তরের গিরিপথগুলি পরবর্তী বসন্তে তুষারমুক্ত হওয়ার আগেই উদ্ভূত সামরিক বিপদ নিষ্পত্তির জন্য ভারতের বোধগম্য ব্যগ্রতা। কাজেই, চূড়ান্ত লড়াই বড়জোর ফেব্রুয়ারী অবধি পিছিয়ে দেবার অবকাশ ছিল; যদিও অক্টোবরের মাঝামাঝি পাকিস্তানের সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন হওয়ার পর যুদ্ধ শুরুর ব্যাপারটি কেবল ভারত-বাংলাদেশের প্রয়োজন ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল ছিল না, তা সমভাবেই নির্ভরশীল ছিল পাকিস্তানের নিজস্ব প্রয়োজন ও সিদ্ধান্তের উপর।
