নীতিগত কারণে তাজউদ্দিন-অনুসত পন্থার বিরুদ্ধে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের বিরোধিতা খানিকটা হ্রাস পেলেও এই বিরোধিতার ব্যক্তিগত উপাদান সম্ভবত কারো কারো ক্ষেত্রে অটুট থাকে। অন্তত তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মহলগুলির প্রচারণার ধারায় তাজউদ্দিনবিরোধী উক্তির কোন ঘাটতি ছিল না। কিছু তারতম্য দেখা যায় কেবল অভিযোগের বিষয়বস্তুর
বিভিন্নতায়। অক্টোবরের আগে অবধি তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধবাদীদের মূল প্রচারণা ছিল: তাজউদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধের নীতি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, ভারতের ভূমিকা অস্পষ্ট বা ক্ষতিকর এবং সোভিয়েট ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ভারত-সোভিয়েট যুক্ত ঘোষণার প্রতি বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার সমর্থনসূচক বিবতির পর এই প্রচারণার কার্যকারিতা যখন হ্রাস পায়, তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে তখন এই অভিযোগই বড় করে তোলা হয় যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও প্রবাসী সরকারের সর্বস্তরে ‘আওয়ামী লীগের দলগত স্বার্থ নিদারুণভাবে অবহেলা করে চলেছেন’ এবং বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শের প্রতি চরম উপেক্ষা প্রদর্শন করে আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তিদের জোরদার করছেন। এই অবস্থার প্রতিবিধানের জন্য আওয়ামী লীগ কার্যকরী সংসদের তলবী সভা অনুষ্ঠানের দাবী শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাজউদ্দিনকে অপসারণের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রকাশ্য আন্দোলনের আড়ালে১৭৯ বিভিন্ন উপদলের যোগসাজশ জোরদার হয়। বিভিন্ন উপদলের নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সফর ও প্রচার অভিযানের ফলে বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন অঞ্চলে মন্ত্রীদের সফর জোরদার করার পক্ষে অক্টোবরের শুরুতে মন্ত্রিসভা এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় খোন্দকার মোশতাক নিজেও ৬ থেকে ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিলের সঙ্গে এবং সেক্টর কমান্ডারদের কারো কারো সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কোলকাতা ত্যাগ করেন। তাঁর এই সফর অপেক্ষাকৃত তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে এ কারণেও যে সমগ্র সফরকালের জন্য তাঁর সঙ্গী ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষী। যোগাযোগ ব্যবস্থাবর্জিত এই সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পররাষ্ট্র বিভাগের সদল দফতর থেকে প্রায় দু’সপ্তাহের জন্য মাহবুব আলমের অনুপস্থিতির কারণ মুখ্যতই রাজনৈতিক বলে প্রতীয়মান হয়। অন্তত বিভিন্ন আঞ্চলিক কাউন্সিলের নেতৃবর্গের সঙ্গে মোশতাকের আলাপ আলোচনার যে সব খবর কোলকাতা এসে পৌঁছাত, তা থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে নিদারুণ আশাভঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর পদে নিজকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপার তখনও তিনি সবিশেষ আগ্রহী। তবে পুনরায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের আপোসহীন সমর্থক। এবং কেবল তার নেতৃত্বেই এই যুদ্ধ পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে এই ধরনের একটি ভাবমূর্তি গঠনের জন্য পরিষদ সদস্য ও দলীয় নেতৃবৃন্দের কাছে তার বক্তব্য দৃশ্যত গঠনমূলক হয়ে ওঠে। এমনকি তার এই সফর সম্পর্কে মন্ত্রিসভার কাছে লিখিত রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ভারত সরকারের তুষ্টির কারণ হতে পারে, এমন কিছু মার্জিত মন্তব্য তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য একই সঙ্গে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে সেরনিয়াবাত-শেখ আজিজ নেতৃত্বাধীন গ্রুপ এবং শেখ মণি পরিচালিত ‘মুজিব বাহিনী’র প্রকাশ্য বিদ্রোহের পিছনে ইন্ধন যোগানের ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ব-ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে এই সব উপদলীয় তৎপরতা দলের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের মাঝে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। তা ছাড়া, আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শক্রমে তাজউদ্দিন কার্যকরী সংসদের সভা ২০শে অক্টোবর ধার্য করায় তলবী সভা আহ্বানের পক্ষে বিরোধী উপদলগুলির তোড়জোড়ও ভণ্ডুল হয়ে পড়ে।
অক্টোবরের প্রথমার্ধে একমাত্র ‘মুজিব বাহিনী’র একাংশের কার্যকলাপে বরং অধিকতর বেপরোয়াভাব পরিলক্ষিত হয়। এই বেপরোয়াভাবের কতটা তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির পরিচায়ক, কতটা পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার নির্দেশক অথবা কতটা তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতাজনিত অধীরতার পরিমাপক, তা বলা কঠিন। অক্টোবরে বৈদেশিক ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে মিত্রভাবাপন্ন শক্তিসমূহের সমন্বয় এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমবর্ধিত সমাবেশ কোন প্রত্যাসন্ন বোঝাপড়ার প্রস্তুতি, সে সম্পর্কে অনবহিত এই তরুণ নেতৃত্ব তখনও তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে তাদের পুরাতন প্রচারণায় মত্ত: ‘তাজউদ্দিনই বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার হওয়ার কারণ, তাজউদ্দিন যতদিন প্রধানমন্ত্রী, ততদিন ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের স্বীকৃতিদান অসম্ভব, তাজউদ্দিন ও মন্ত্রিসভা যতদিন ক্ষমতায় আসীন ততদিন বাংলাদেশের মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। এই সব বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা, আওয়ামী লীগের একাংশের সঙ্গে তাদের সংঘাত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কোন কোন ইউনিটের সঙ্গে তাদের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, এমনকি নৌকমান্ডোদের সাথে তাদের অসহযোগী আচরণের সংবাদ প্রচারিত হয়ে পড়ার দরুন রাজনৈতিকভাবে ‘মুজিব বাহিনী’ ক্রমেই বেশী অপ্রিয় ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে শুরু করে। তা ছাড়া মুজিব বাহিনী’র চার নেতাকেই তাদের পৃষ্ঠপোষকগণ উপমহাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতির আলোকে তাজউদ্দিন তথা মন্ত্রিসভাবিরোধী তৎপরতা থেকে বিরত হওয়ার পরামর্শ দান শুরু করেছেন বলে অক্টোবরের মাঝামাঝি ভারতীয় সূত্র থেকে আমাদের জানানো হয়। বাংলাদেশ সূত্র থেকে জানা যায়, কথিত পরামর্শের মুখে শেখ মণির ভূমিকা অপরিবর্তিত থাকলেও, ‘মুজিব বাহিনী’র দ্বিতীয় প্রধান নেতা হিসাবে পরিচিত সিরাজুল আলম খান তাজউদ্দিন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত নমনীয় মনোভাব গ্রহণ করায় এই দুই যুবনেতার মধ্যে মতপার্থক্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় ‘মুজিব বাহিনী’র নেতৃত্বের একাংশের পক্ষে অধীর হয়ে পড়া অস্বাভাবিক ছিল না; বস্তুত তাদের এই অধীরতার সহিংস প্রকাশ ঘটে তাজউদ্দিনের প্রাণনাশের অসফল প্রয়াসের মধ্য দিয়ে।
