অক্টোবরে অধিকৃত অঞ্চলে পাকিস্তানী বাহিনীর হত্যা, সন্ত্রাস ও নিপীড়নের শাসন তখনও বলবৎ। এই হত্যা ও সন্ত্রাসের উপর একটা শাসনতান্ত্রিক আবরণ লাগানোর আয়োজনই ছিল ইয়াহিয়ার ১২ই অক্টোবরের বক্তৃতার মর্মকথা। ইয়াহিয়া যাতে এই দুষ্কর্ম সমাধা করার সুযোগ পায়, এ জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য প্রত্যাহার এবং এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাসের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ ছাড়া, সীমান্ত থেকে উভয় দেশের সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক নিয়োগের মার্কিন প্রস্তাবের পিছনে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত পারাপার দুরূহ করে তোলার গূঢ় উদ্দেশ্য। কিন্তু জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক নিয়োগ কেবলমাত্র নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত বলেই সম্ভব। ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সোভিয়েট ইউনিয়নকে এ ব্যাপারে সম্মত করানোর প্রয়োজন ছিল তাই সর্বাধিক। দৃশ্যত সোভিয়েট ইউনিয়ন পাকিস্তানের জন্য এই সঙ্কট থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার একটি মাত্র পথই খোলা রেখেছিল-তথা, শেখ মুজিবের মুক্তিসহ পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক বাসনা ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারের স্বীকৃতির ভিত্তিতে উদ্ভূত সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান এবং পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ সকল শরণার্থীর দ্রুত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতকরণ। কিন্তু এই সব দাবী মেনে নেবার পর পূর্ব বাংলার উপর পাকিস্তানী রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা যে কার্যত অসম্ভব, এই উপলব্ধি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও সম্ভবত পূর্ণ মাত্রাতেই ছিল। কাজেই পূর্ব বাংলার উপর পাকিস্তানের নগ্ন সামরিক দখল বৈধকরণ একমাত্র উপায় হিসাবে-ইয়াহিয়া ১২ই অক্টোবরের ঘোষণা অনুযায়ী–৭৮টি জাতীয় পরিষদ আসনে প্রহসনমূলক উপনির্বাচন সমাপ্ত করা, ইয়াহিয়ার ‘বিশেষজ্ঞ প্রণীত শাসনতন্ত্রের পক্ষে জাতীয় পরিষদের অনুমোদন লাভ করা এবং বেসামরিক প্রতিনিধিদের কাছে। ‘শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করার জন্য ইয়াহিয়ার প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া এবং ইত্যবসরে জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদের সহায়হায় মুক্তিযুদ্ধ ও ভারতীয় সহযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টাই ছিল মার্কিন কূটনৈতিক উদ্যোগের মূল কথা।
অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ এই মর্মে গৃহীত মার্কিন কূটনৈতিক উদ্যোগের ব্যর্থতা যখন স্পষ্ট হয়, তখনই অথবা তারও আগে কিসিঞ্জার পাকিস্তানের পক্ষে প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের কথা বিবেচনা করেছিলেন কি না, তা আজও অজ্ঞাত। তবে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে মার্কিন হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। এর মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুসৃত পন্থা ছিল মার্কিন নৌসেনার অবতরণ যেমন ঘটেছিল পঞ্চাশের দশকে লেবাননে, ষাটের দশকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে। কিন্তু ষাটের দশকের প্রারম্ভে দক্ষিণ ভিয়েতনামের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ধ্বংস ও হত্যার বিভীষিকা তুলনাহীনভাবে প্রসারিত করে। এর ফলে খোদ আমেরিকার সর্বত্র অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সামরিক হস্তক্ষেপ করার সরকারী নীতির বিরুদ্ধে এক প্রবল জনমত গড়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে এই হস্তক্ষেপবিরোধী জনমত বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্য বিরাটভাবে সহায়ক হয়। বাংলাদেশ প্রশ্নেও–বিশেষত পাকিস্তানী জান্তার অমানুষিক বর্বরতা এবং এই জান্তার সমর্থনে নিক্সন প্রশাসনের সহযোগিতার নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন সিনেট, হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ, সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ জনমত উত্তরোত্তর এমনভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠতে শুরু করে যে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষে বাংলাদেশের অভ্যুদয় রোধ করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত দুরূহ হবে বলে মনে হয়। পক্ষান্তরে দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে জোট-নিরপেক্ষ ভারতের প্রাধান্য ও ক্ষমতা প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা মার্কিন প্রশাসনের একটি মৌল প্রয়োজন বলে পরিগণিত হওয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে কোন সময়েই আমাদের পক্ষে নাকচ করা সম্ভব হয়নি।
বরং ২৫শে অক্টোবরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে চীনের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পুনর্বার উত্থাপিত হওয়ার প্রাক্কালে ‘নিক্সনের সফরসূচী চূড়ান্তকরণের জন্য পিকিং ও কিসিঞ্জারের প্রায় সপ্তাহব্যাপী আলোচনা, চীনের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে তেইশ বছর দীর্ঘ মার্কিন বিরোধিতার অবসানান্তে চীনের সদস্যপদ লাভ প্রভৃতি ঘটনার তাৎপর্য আমাদের মুক্তিসংগ্রামের জন্য কি দাঁড়াতে পারে তা নিয়ে নানা জিজ্ঞাসার উদয় ঘটে। চীন ও আমেরিকার সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পাকিস্তান যেটুকু সহায়তা করেছিল, তার বিনিময়ে পাকিস্তানের স্থিতাবস্থা রক্ষার জন্য এই দুই শক্তির সমঝোতা ঘটা আমাদের জন্য অচিন্তনীয় ছিল না। বরং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনা থেকে এই সব জিজ্ঞাসা নির্দিষ্ট সন্দেহে পরিণত হয়।
অধ্যায় ১৭: অক্টোবর
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যে সব উপদলীয় তৎপরতা সেপ্টেম্বরে প্রমত্ত হয়ে উঠেছিল, অক্টোবরের প্রথম দিকে তা মন্দীভূত হয়ে পড়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। সেপ্টেম্বরের শেষে ভারত-সোভিয়েট যুক্ত ঘোষণা সম্পর্কে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার বৈঠকে যে চুলচেরা আলোচনা হয়, তার ফলে যোগদানকারী কারো জন্যেই এ কথা দুর্বোধ্য ছিল না যে, মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের অনুকূলে মিত্রভাবাপন্ন বৈদেশিক শক্তিসমূহের সমঝোতা সম্পন্ন প্রায়। সম্ভবত তাঁদের মধ্যে এ উপলব্ধিও ঘটে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুকূলে সোভিয়েট ভূমিকাকে নিকটবর্তী করার জন্য ‘জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি’ গঠনের বিষয়ে তাজউদ্দিনের নেপথ্য উদ্যোগ অসঙ্গত ছিল না। এই সব আশাবাদ ও উপলব্ধির ফলে মন্ত্রিসভার কাজকর্মে এক নতুন গতি ও মতৈক্য পরিলক্ষিত হয়। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপর করে তোলা, নিয়মিত বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সৃষ্ট ব্যবধান হ্রাস করা, সরকারী প্রশাসনকে সংহত ও সক্রিয় করা, এমনকি যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মন্ত্রিসভার এই সব গঠনমুখী সিদ্ধান্ত থেকে প্রতীয়মান হয়, মন্ত্রিসভাকে বিভক্ত করার জন্য যে বৈদেশিক স্বার্থ পূর্ববর্তী কয়েক মাস যাবত সাতিশয় সক্রিয় ছিল, খোন্দকার মোশতাকের আমেরিকা গমনের অক্ষমতা প্রকাশ পাওয়ার পর সেই স্বার্থ অন্তত অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপ পরিচালনার ক্ষেত্রে পূর্বাপেক্ষা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
