বৃহৎ শক্তির পর্যায়ে উত্তেজনা হ্রাসের এক সম্ভাবনা বিরাজমান থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ভারতের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের ব্যাপারে সোভিয়েট সহযোগিতা লাভের আশা করেছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সোভিয়েট ভূমিকা ছিল ভিন্নতর। সোভিয়েট ইউনিয়ন উদ্ভূত সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পক্ষপাতী ছিল ঠিকই কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা যে ভারত-সোভিয়েট যুক্তইশতেহারে বর্ণিত রাজনৈতিক দাবীর অনুবর্তী, তা পুনর্ব্যক্ত করা হয় ১০ই অক্টোবরে প্রাভদায় প্রকাশিত পাঁচ কলাম দীর্ঘ এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে। তারপরেও সোভিয়েট মনোভাব পরিবর্তন করার জন্য মার্কিন তৎপরতা ক্রমশই জোরদার হতে থাকে।
কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ১২ই অক্টোবর ইয়াহিয়া খানের নতুন আর এক কর্মসূচী ঘোষিত হয়। এতদিন শেখ মুজিবের মুক্তি, পূর্ববঙ্গবাসীর অবিচ্ছেদ্য অধিকারের স্বীকৃতির ভিত্তিকে সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এবং সম্মান ও নিরাপত্তাসহ শরণার্থীদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের দাবীতে সোভিয়েট সরকারী প্রচারমাধ্যমগুলি উত্তরোত্তর সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এর কোন কিছুই যে পাকিস্তানী শাসকদের চিন্তাভাবনাকে সামান্যতম অর্থেও প্রভাবিত করেনি, ইয়াহিয়ার বক্তৃতা ছিল তারই প্রমাণ। ইয়াহিয়া এই বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপোস রফার কোন তোয়াক্কা না করেই অবৈধভাবে শূন্য ঘোষিত জাতীয় পরিষদের ৭৮টি আসনে ২৩শে ডিসেম্বরের মধ্যে উপনির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ২৭শে ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। এর পাশাপাশি পাকিস্তান পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের সীমান্ত বরাবর সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন করার ফলে এই আশঙ্কা স্পষ্টতর হয়, যে প্রকারেই হোক পূর্ব বাংলার উপর নিজেদের দখল কায়েম রাখাই পাকিস্তানের একমাত্র উদ্দেশ্য। এই পটভূমিতে ‘উপমহাদেশে উত্তেজনা হ্রাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রকৃত মর্ম কি তা সোভিয়েট ইউনিয়নের পক্ষে অনুমান করা কঠিন হয়নি। অপরদিকে শরণার্থী সমস্যা ভারতের জন্য চিরস্থায়ী বোঝা হয়ে উঠতে পারে এই মর্মে ভারতের বিরোধীদলসমূহের প্রচারণায় কংগ্রেস সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যে ক্রমেই আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে এবং কংগ্রেস দলের মঙ্গল-অমঙ্গল যে বহুলাংশেই স্বচ্ছতর সোভিয়েট ভূমিকার উপর নির্ভরশীল, তাও সম্ভবত সোভিয়েট কর্তৃপক্ষের তখন আর অজানা নয়। নববর্ষে ভারতের নয়টি রাজ্যে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের মুখে বাংলাদেশ–সমস্যা নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার জন্য দক্ষিণপন্থী দলগুলির প্রচারণা কংগ্রেস সরকার এবং ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির বিরুদ্ধে সমভাবেই তীব্রতর হতে থাকে।
এই অবস্থায় ১৬ই অক্টোবর সোভিয়েট কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র প্রাভদার ‘রাজনৈতিক ভাষ্যকার’ (সম্ভবত সোভিয়েট পার্টির কোন ঊধ্বর্তন মুখপাত্র) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, উপমহাদেশে উত্তেজনার কারণ এবং এই উত্তেজনার দ্রুত বৃদ্ধির সমস্ত দোষ সর্বতোভাবেই পাকিস্তানের একার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সোভিয়েট মনোভাব উত্তরোত্তর কঠোর হয়ে ওঠা সত্ত্বেও ১৮ই অক্টোবর মার্কিন রাষ্ট্রদূত বীম মস্কোয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোমিকোর কাছে পাক-ভারত সীমান্ত থেকে উভয়পক্ষেও সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য মার্কিন-সোভিয়েট যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব করেন। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ সেক্রেটারী জেনারেল উ থানট অন্তত বাংলাদেশ প্রশ্নে প্রায়শ মার্কিন উদ্যোগের এক পরিপূরক। ভূমিকা গ্রহণের প্রবণতা দেখাতেন। ২০শে অক্টোবরে তিনি পাকিস্তান ও ভারতের কাছে সমগ্র সীমান্ত বরাবর জাতিসংঘ পর্যবেক্ষকদল নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেন। ২১শে অক্টোবর ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে ‘ভারত-পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত থেকে উভয়পক্ষের সৈন্য প্রত্যাহার করার অনুকূলে ত্বরিত সম্মতি জানান। ভারত সরকারের আনুষ্ঠানিক জবাব অনেক পরে দেওয়া হলেও, অন্য সূত্র থেকে ভারতের বক্তব্য প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জানানো হয়: ‘বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক নিষ্পত্তি এবং শরণার্থীদের সসম্মানে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে পাকিস্তানের সম্মতি না পাওয়া পর্যন্ত ভারতের পক্ষে সৈন্য প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়; বিশেষত সীমান্ত থেকে ভারতের সৈন্য ঘাঁটিগুলি তুলনামূলকভাবে দূরে অবস্থিত হওয়ায় জরুরী অবস্থায় সৈন্য সমাবেশ যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
২২শে অক্টোবর সোভিয়েট সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাই ফিরুবিন দিল্লী এসে পৌঁছান। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বীমের পাঁচ দিন আগের প্রস্তাবের জবাবে ২৩শে অক্টোবর সোভিয়েট কর্তৃপক্ষ মার্কিন সরকারকে জানিয়ে দেন যে, শেখ মুজিবের মুক্তি এবং পূর্ব পাকিস্তানে দ্রুত রাজনৈতিক নিষ্পত্তি সাধন’ ব্যতীত কেবল সীমান্ত অঞ্চল থেকে ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুদ্ধের আশঙ্কা রোধ করা সম্ভব নয়। এদিকে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনয়নের জন্য, বিশেষত শরণার্থী প্রশ্নে ভারতের সমস্যা ও ভূমিকা পশ্চিম ইউরোপের কাছে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে ইন্দিরা গান্ধী ২৪শে অক্টোবরে দীর্ঘ উনিশ দিনের জন্য পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দিল্লী ত্যাগ করেন। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই সব সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির জন্য এত বেশী জল্পনা-কল্পনার বিষয় ছিল যে, ফিরুবিনের ভারত সফরের গুরুত্ব বিশেষ কোন প্রাধান্য লাভ করেনি। কিন্তু ২৭শে অক্টোবর ফিরুবিনের ভারত সফর শেষ হওয়ার পর দুই দেশের পক্ষ থেকে প্রচারিত এক যুক্ত ঘোষণায় বলা হয়, বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শান্তি বিপন্ন হয়ে পড়ায় ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির নবম ধারার অধীনে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সোভিয়েট ইউনিয়ন ভারতের সঙ্গে পূর্ণরূপে একমত যে পাকিস্তান খুব শীঘ্র আক্রমণাত্মক যুদ্ধ শুরু করতে পারে।” ফিরুবিনের প্রত্যাবর্তনের তিন দিনের মধ্যে সোভিয়েট বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল কুটকভের নেতৃত্বে এক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সোভিয়েট সামরিক মিশন দিল্লী রওয়ানা হয়। ১লা নভেম্বর থেকে আকাশ পথে শুরু হয় ভারতের জন্য সোভিয়েট সামরিক সরবরাহ।
