১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তান কেবল পশ্চিম রণাঙ্গনের যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। ১৯৭১-এর ২৫শে মার্চ থেকে নিরস্ত্র বাঙালীদের নিপীড়ন ও হত্যার জন্য পক্ষকালের মধ্যে আরো দুই ডিভিশন সৈন্য নিয়ে এসে গোটা পূর্বাঞ্চলকে বধ্যভূমিতে রূপান্তরিত করার সময় সম্ভবত তারা কল্পনাও করে উঠতে পারেনি যে, এই নির্বুদ্ধিতার মূল্য হিসাবে শীঘ্রই তাদেরকে তিন রণাঙ্গনে যুদ্ধের দায়িত্ব নিতে হবে পশ্চিমাঞ্চলে, পূর্বাঞ্চলের সীমান্তে এবং পূর্বাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ জনপদে।
অধ্যায় ১৬: অক্টোবর
অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমন কোন নতুন উপাদানের সংযোজন ঘটেনি, যার ফলে উপমহাদেশের ঘটনাধারায় কোন দিক পরিবর্তন সম্ভব ছিল। পাকিস্তানের সামরিক কোটারী ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন আগের মতই অনিচ্ছুক। কাজেই তাদের পক্ষে রাজনৈতিক মীমাংসার কোন নতুন প্রস্তাব তোলা বা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। পূর্বাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য তৎপরতা যদি সত্যই বিপদমাত্রা অতিক্রম করে, তবে তা প্রতিরোধের সর্বশেষ উপায় হিসাবে তারা সীমিত আকারে পাক-ভারত যুদ্ধ সংঘটনের জন্য পশ্চিম ও পূর্ব উভয় সীমান্ত বরাবর সৈন্য সমাবেশ সম্পন্ন করে। কিন্তু পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যে নিজেদের দুর্বলতার কথা বিবেচনা করে, যুদ্ধ অথবা কূটনীতি যে উপায়েই হোক পূর্ব বাংলার উপর দখল যাতে বজায় রাখা সম্ভব হয়, তজ্জন্য আমেরিকার উপরেই ইয়াহিয়া সরকারকে সর্বাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে দেখা যায়। আমেরিকাও ছিল মুক্তিযুদ্ধ প্রতিরোধ, তথা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় আগের মত বদ্ধপরিকর। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা রোধ করার ক্ষেত্রে তাদের সকল প্রয়াস যেমন তখন অবধি অসফল, তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের প্রশ্নে ভারতকে নিবৃত্ত করার উপায়ও তাদের অজানা। পাকিস্তানের অপর মিত্র চীন সঙ্কটের প্রথম দিকে পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থনসূচক অভিমত প্রকাশ করার পর বিগত কয়েক মাস যাবত রহস্যময়ভাবেই নীরব হয়ে থাকে। কিন্তু ভারত সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি এবং ২৯শে সেপ্টেম্বর ভারত-সোভিয়েট যুক্তইশতেহার প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আরো হ্রাস পেয়েছে বলে অনুমান করা সঙ্গত ছিল। অন্যদিকে জুলাই থেকে সোভিয়েট ইউনিয়ন ক্রমশ ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির নিকটবর্তী হয়ে ওঠার পরেও শেখ মুজিবের মুক্তি ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা সম্পর্কে যেটুকু আশা সোভিয়েট কর্তৃপক্ষের ছিল, পাকিস্তানের অনমনীয়তার দরুন অক্টোবরের শেষ দিকে তা নিঃশেষিত হয় এবং ফলে সোভিয়েট ভূমিকা মৈত্রীচুক্তির নবম ধারার অধীনে কার্যকর হতে শুরু করে। আর ভারত শরণার্থী সমস্যা সমাধানের সর্বশেষ উপায় হিসাবে সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সোভিয়েট ইউনিয়নের পরোক্ষ সমর্থন আদায়ের পর এতদসংক্রান্ত অবশিষ্ট সামরিক ও কূটনৈতিক আয়োজন সম্পন্ন করার কাজে পূর্ণোদ্যমে আত্মনিয়োগ করে।
কাজেই বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে অক্টোবরের শেষে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য স্পষ্টতই ছিল দখলদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তির জন্য সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করার পূর্বে অবশিষ্ট মূল। ছিল, সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগেই এই অভিযান সফলভাবে পরিসমাপ্ত করার সম্ভাব্যতা নিয়ে।
অক্টোবরের প্রথমার্ধে পাকিস্তান তার সমর-প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। তৎসত্ত্বেও পশ্চিম, পূর্ব এবং আভ্যন্তরীণ–এই তিন রণাঙ্গনের যুদ্ধের কথা বিবেচনা করে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের উপর প্রায় সর্বতোভাবেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শেষে মস্কো থেকে প্রকাশিত ভারত-সোভিয়েট যুক্ত ঘোষণার মর্ম পাকিস্তানের জন্য বিশেষ দুর্বোধ্য ছিল না। তদুপরি সেপ্টেম্বর থেকে চীনের আভ্যন্তরীণ গোলযোগ এবং ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ায় চীনা সশস্ত্রবাহিনীর উপর এর প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব পাকিস্তানের সম্পূর্ণ অগোচরে থাকার কথা নয়। তা ছাড়া লিন পিয়াও-এর ব্যর্থ অভ্যুত্থানেরও দু সপ্তাহ আগে সম্ভাব্য পাক-ভারত যুদ্ধে চীনের প্রত্যাশিত ভূমিকা সম্পর্কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত খাজা মোহাম্মদ কায়সার তাঁর ‘অনিশ্চয়তাবোধের কথা পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব সুলতান মোহাম্মদ খানকে জ্ঞাপন করেন।
এই ‘অনিশ্চয়তাবোধ’ পাকিস্তানের জন্য অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ সম্ভবত গভীর উৎকণ্ঠায় পরিণত হয়। মস্কো ঘোষণার মর্ম ও চীনের শুদ্ধি অভিযানের তাৎপর্য ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণের সংবাদ এবং পূর্ব ও পশ্চিম উভয় সীমান্তে ভারতের সৈন্য সমাবেশের আয়োজন দুষ্টে পাকিস্তান নিজস্ব নিরাপত্তার সকল জিম্মাদারী কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করেন। ৭ই অক্টোবর ইয়াহিয়া উপমহাদেশে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি রোধকল্পে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ’ কামনা করে কিসিঞ্জারকে এক জরুরী বার্তা পাঠান। কিসিঞ্জার ঐ দিনই ‘উপমহাদেশে যুদ্ধের আশঙ্কা রোধ করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের National Security Council (NSC)-এর কার্যকরী উপসংস্থা Washington Special Action Group (WSAG)-এর জরুরী বৈঠক তলব করেন। এই উপসংস্থা ক্রমবর্ধমান বিপদ থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য পাক-ভারত সীমান্ত থেকে উভয়পক্ষেও সৈন্য প্রত্যাহার করার পক্ষে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে অন্যতম মূল উদ্যোগ ছিল সীমান্ত থেকে সৈন্য অপসারণ এবং বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা প্রেরণ বন্ধের ব্যাপারে ভারতের উপর চাপ প্রয়োগ করার জন্য সোভিয়েট ইউনিয়নকে সম্মত করানো। অবশ্য সরাসরি ভারতের উপর চাপ প্রয়োগের ব্যাপারেও মার্কিন সরকারের কোন কুণ্ঠা ছিল না। ১২ই অক্টোবর দিল্লীস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্পষ্ট ভাষায় অবহিত করেন, ভারত যদি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য প্রদান থেকে নিবৃত্ত না হয় তবে পাকিস্তান পশ্চিম দিক থেকে ভারত আক্রমণ করবে।
