পাকিস্তানের সামরিক আক্রমণের মুখে কেবল এপ্রিল ও মে এই দু’মাসেই যখন ৪৩ লক্ষ লোক ভারতে প্রবেশ করে, তখন মে-জুন মাসে দিল্লীর সামরিক সদর দফতরে Director of Military Operations লে. জেনারেল কে. কে. সিং-এর তত্ত্বাবধানে সামরিক পরিকল্পনা তৈরী শুরু হয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী উপদ্রুত অঞ্চলে পাকিস্তানের তিন/চার ডিভিশন সৈন্যের বিরুদ্ধে ভারতের অন্যূন ছয়/সাত ডিভিশন সৈন্যের প্রয়োজন স্বীকৃত হয়, যদিও প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত একজন সৈন্যের বিরুদ্ধে আক্রমণকারী সৈন্য সংখ্যা তিন হওয়া উচিত। স্পষ্টতই বাংলাদেশের বিদ্রোহজনিত পরিস্থিতি এবং বিদ্রোহী বাহিনীর সমর্থন বাবদ কিছু সুবিধা ভারতের অনুকূলে হিসাব করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের পক্ষে বাংলাদেশ সীমান্তে এই ছয়/সাত ডিভিশন সৈন্য জড়ো করার জন্য ভারতের পশ্চিম সীমান্ত থেকে কোন সৈন্য সরিয়ে আনার কোন উপায় ছিল না। সম্ভাব্য যুদ্ধে পাকিস্তান পশ্চিমাঞ্চলকেই যে প্রধান রণাঙ্গনে পরিণত করবে ভারতের এমন আশঙ্কা যুক্তিসঙ্গত ছিল। উত্তর সীমান্তে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন ভারতের আটনিয় ডিভিশন সৈন্য থেকে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সৈন্যের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব ছিল একমাত্র শীতকালে, যখন তুষারপাতে উত্তরের অধিকাংশ গিরিপথ বন্ধ হয়ে যায়। কাজেই পরবর্তী শীতকালের আগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্য সংগ্রহ সম্ভব নয়, এই অনুমানের ভিত্তিতেই ভারতের সামরিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠে। জুলাইয়ের প্রথমদিকে অর্থাৎ সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার প্রায় এক মাস আগে এই পরিকল্পনা প্রণয়ন সম্পন্ন হয় বলে জানা যায়।
সংক্ষেপে এই ভারতীয় রণপরিকল্পনার মূল কাঠামো ছিল: (ক) দক্ষিণে দুই প্রধান সমুদ্রবন্দরের প্রবেশ পথে নৌঅবরোধ সৃষ্টি করে পাকিস্তানের সমস্ত সরবরাহ বন্ধ করা এবং পাকিস্তানী সৈন্যদের পশ্চাদপসারণের পথ বন্ধ করে তাদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আতঙ্ক সৃষ্টি করা; (খ) বিমানবন্দর, বড় বড় সেতু, ফেরী সংযোগ পথ ইত্যাদি দখল/বিনষ্ট করে বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত পাকিস্তানী সৈন্যদের একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা; (গ) বিভিন্ন যোগাযোগ কেন্দ্র দখল করে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ যোগাযোগবিহীন করে আরও টুকরো টুকরো এবং নিষ্ক্রিয় করে ফেলা; এবং (ঘ) এই পন্থায় পাকিস্তানের অধিকাংশ সৈন্য পরাভূত করার পর ঢাকার উদ্দেশে দ্রুত অভিযান শুরু করা। ঢাকার দিকে দ্রুত অভিযান শুরুই ভারতীয় বাহিনীর মূল লক্ষ্য বলে বর্ণনা করা হলেও এই পরিকল্পনায় পরিষ্কারভাবে স্বীকার করা হয় যে, বরাদ্দকৃত তিন সপ্তাহের মধ্যে (অর্থাৎ বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কার্যকর হওয়ার পূর্বেই) ঢাকাকে মুক্ত করা ভারতীয় ছয়/সাত ডিভিশন সৈন্যের পক্ষে সম্ভব নয়। কে, কে, সিং-এর অভিমত ছিল, যেহেতু এই সৈন্যবল ও সময়-সীমার মাঝে ঢাকা দখল ভারতীয় বাহিনীর সাধ্যের বাইরে, সেহেতু গোটা বাংলাদেশের পরিবর্তে এর বড় কিছু অংশ মুক্ত করার লক্ষ্যেই বরং তাদের সামরিক শক্তি পরিচালিত হওয়া উচিত।
কে. কে. সিং-এর এই অভিমত অনুযায়ী ভারতের সৈন্য সমাবেশ ক্ষমতা এবং বাংলাদেশের বিজয় সুনিশ্চিত করার মধ্যে যে ব্যবধান (gap) ছিল, তা পূরণ করা সম্ভব হয় একমাত্র মুক্তিবাহিনীর সাহায্যেই। দেশের ভিতরে ও সীমান্তে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে যদি দখলদার বাহিনীকে নানা উপায়ে বিঘ্নিত, ক্ষতিগ্রস্ত, এবং অবশেষে যুদ্ধপরিশ্রান্ত করে তোলা যায়, তবেই একমাত্র ভারতীয় বাহিনীর পক্ষে দ্রুত ও সর্বাত্মক বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। পাকিস্তানী অবস্থানকে দুর্বল করার লক্ষ্যে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধিই ছিল তাই মুক্তিযুদ্ধের রণনৈতিক আয়োজনের জাতীয় দিক। বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য সমগ্র রণনৈতিক আয়োজনের আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উভয় উপাদানই ছিল প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অপরের পরিপূরক।
সেপ্টেম্বর থেকে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রশিক্ষণ ব্যাপকতর হওয়ার ফলে মুক্তিযুদ্ধকে দ্রুত সম্প্রসারিত করার এক অসামান্য সুযোগ ঘটে। কিন্তু পূর্বে বর্ণিত উপদলীয় বিরোধ ও সংঘাতের ফলে সমগ্র রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে যে, দেশের ভিতরে মুক্তিসংগ্রামের রাজনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য কমান্ডকাঠামো গঠনে সামান্য অগ্রগতিই সম্ভব হয়। মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটের ব্যাপারে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারী মাপকাঠি গ্রহণের আবশ্যকতা উত্তরোত্তর স্বীকৃতি লাভ করলেও বাস্তবক্ষেত্রে অবস্থা প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। কাজেই কোন কমান্ডব্যবস্থা ছাড়াই ভাল-মন্দ, সৎ-অসৎ, সক্ষম-অক্ষম সব মিলিয়েই তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের আয়তন দ্রুত স্ফীত হতে শুরু করে। এর ফলে এদের মধ্যে সামাজিক পুনর্গঠন এবং সামাজিক অরাজকতা উভয় ধরনের শক্তিরই পাশাপাশি বিকাশ ঘটতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়োগের (induction) ব্যাপারে নিয়মিত বাহিনীর সেক্টর অধিনায়কদের দায়িত্ব ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেশে প্রবেশের পর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সেক্টর সংগঠনের যোগাযোগ হত ছিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে অসংগঠিত ও প্রতিকূল অবস্থার মুখে অস্ত্রশস্ত্র ফেলে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করত।
