জুন-জুলাই-আগস্টে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পক্ষে এই উপলব্ধিতে আসা সম্ভব হয় যে, রাজনৈতিক অবকাঠামো, কমান্ডব্যবস্থা এবং তৎপরতার সুপরিকল্পিত কর্মসূচী ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সামান্য অংশকে, বড় জোর এক পঞ্চমাংশকে, আকাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সদ্ব্যবহার করা যেতে পারে। সশস্ত্র তৎপরতার পক্ষে অনুপযোগী এই চার-পঞ্চমাংশের ক্ষতিকর প্রভাব যথাসম্ভব হ্রাস করার জন্য স্ক্রীনিং ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করার পক্ষে অভিমত জোরদার হতে থাকে। কিন্তু সম্ভবত নিয়মিত বাহিনীর সম্প্রসারণ প্রভৃতি বিষয়ে ব্যস্ততার দরুন, বাংলাদেশের উর্ধতন সামরিক নেতৃত্বকে এই সব সমস্যার সমাধানে বিশেষ উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যে চিন্তাভাবনা ও উদ্যোগ ছিল, তাও আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ বিরোধের ফলে সামান্যই কার্যকর হয়। ফলে সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি মাসে কুড়ি হাজার করে নতুন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিংয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ নেতৃত্ব উৎসাহ প্রকাশ করলেও কার্যক্ষেত্রে এদেরকে সদ্ব্যবহার করার আয়োজন অসংগঠিত থাকে।
অথচ অন্যদিকে ভারত যখন উত্তরোত্তর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ ভিন্ন শরণার্থী সমস্যার কোন সত্যিকারের সমাধান নেই, তখন ভারতের পরিবর্তনমান সমর পরিকল্পনার প্রয়োজন অনুসারে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। তদনুসারে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে তাদের পূর্বেকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর হয়, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারদের মাধ্যমে নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের দেশে পাঠানো শুরু হয়। দেশের ভিতরে মুক্তিযুদ্ধের উপযোগী কোন রাজনৈতিক সংগঠন থাকুক অথবা না-ই থাকুক, মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত করার মত কোন কমান্ডব্যবস্থা তৈরী হোক বা না-ই হোক, সে সবের প্রতি দৃকপাত না করে কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাবৃদ্ধির উপরেই জোর দেওয়া হয়। এর ফলাফল সর্বত্র শুভ হয়নি।
শক্তিক্ষয় ও দখলদার সৈন্যদের যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাবৃদ্ধির প্রয়োজন নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু যথোপযুক্ত রিক্রুটমেন্ট, ট্রেনিং, পরিকল্পনা ও কমান্ডব্যবস্থার অধীনে অল্প
সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার দ্বারা যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল, বাস্তব ক্ষেত্রে একই ফল সঞ্চারের জন্য তার চাইতে অনেক বেশী মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগ করতে হয়; কেননা রিক্রুটমেন্ট থেকে কমান্ড গঠন পর্যন্ত সর্ববিষয়েই অসন্তোষজনক অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাবৃদ্ধির মাধ্যমে পাক সৈন্যদের দুর্বল ও পরিশ্রান্ত করে চূড়ান্ত বিজয়ের পথ প্রশস্ত করা হয় বটে, কিন্তু এর ফলে প্রত্যাশিত স্বাধীনতার পর সামাজিক অস্থিরতার শক্তিও প্রবল হয়ে ওঠে। অতিশয় সীমিত সময়ের মধ্যে ফলোৎপাদনে বাধ্য কোন পেশাদার সামরিক নেতৃত্বের পক্ষে সামাজিক ভারসাম্যের এইসব সূক্ষ্ম যুক্তির প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার মত কোন অবকাশ ছিল না।
একই সময়ে শত্রুকে শ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীকেও সীমান্তসংঘর্ষে সক্রিয় করে তোলার প্রচেষ্টা চলতে থাকে। জুন-জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, দেশের ভিতরে সশস্ত্র তৎপরতার পাশাপাশি সীমান্ত সংঘর্ষ শুরু করার প্রচেষ্টা চলে, যাতে (১) ভিতরে মুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা হয়; এবং (২) পাকিস্তানী বাহিনী দীর্ঘ সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত হয়ে পড়ার ফলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে। আসন্ন শীতকালে বৃহত্তর অভিযানের চিন্তা সম্মুখে রেখে, পাকিস্তানকে এমনি খণ্ড খণ্ডভাবে সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত করার জন্য সীমান্ত সংঘর্ষকে ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু পূর্ব আলোচিত কারণে বাংলাদেশে সেক্টর অধিনায়কদের তৎপরতার মান প্রধান সেনাপতি ওসমানীরও গভীর নৈরাশ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সেক্টর অধিনায়কদের মধ্যে যারা সীমান্তে পাকিস্তানী অবস্থানের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালানোর পক্ষে উদ্যোগী ছিলেন, তারাও এমন কিছু মৌলিক সমস্যার সম্মুখীন হন যেগুলির কোন সমাধান তাদের জানা ছিল না। যেমন, নিয়মিত বাহিনীকে প্রায় শেষ অবধি ভারতের ভূখণ্ড থেকেই তৎপরতা চালাতে হয়; তা ছাড়া, নিয়মিত বাহিনীর নিজস্ব কোন সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা (Logistics) না থাকায় এবং আক্রমণের ক্ষেত্রে অনেক সময় গোলন্দাজ সহায়তা অত্যাবশ্যক বিবেচিত হওয়ায়, সীমান্ত তৎপরতার জন্য অনেক সময়েই তাদেরকে ভারতের সহযোগিতার উপর নির্ভর করতে হত। এ ব্যাপারে ভারতের সহযোগিতার যে অভাব ঘটত তা নয়, কিন্তু তা পাওয়া যেত ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের নিরাপত্তা, তাদের জনপদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের উপর পাকিস্তানী গোলন্দাজ প্রতি-আক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনা করার পর। এতেও হয়ত অসুবিধা হত না, যদি কোন নির্দিষ্ট স্থানে তৎপরতা চালাবার প্রয়োজন এবং প্রতি-আক্রমণের ঝুঁকি সম্পর্কে বাংলাদেশ সেক্টর ইউনিট ও ভারতীয় ফরমেশনের পর্যায়ে মিলিত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসার কোন নিয়মিত ব্যবস্থা থাকত।
