মস্কো শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ সঙ্কট সমাধানের মূল নীতি সম্পর্কে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রথম দিকে তা বাস্তবায়নের উপায় ও পদ্ধতির প্রশ্নে মস্কো ও দিল্লীর ভূমিকায় কিছু পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। যুক্ত ঘোষণার পর পরই সোভিয়েট পত্রপত্রিকায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সমালোচনা তীব্রতর হয় এবং বিভিন্ন সোভিয়েট শহরে প্রতিবাদ সভার মত বিরল ঘটনা অনুষ্ঠানের সংবাদ আসতে থাকে। তবু পরবর্তী দুই সপ্তাহ ধরে, অন্তত ইয়াহিয়ার ১২ই অক্টোবরের বক্তৃতার আগে পর্যন্ত, সঙ্কটের নিরস্ত্র সমাধানের পক্ষে তাদেরকে আশা বজায় রাখতে দেখা যায়। দাঁতাত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বৃহত্তর স্বার্থে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ভূমিকা গ্রহণের ব্যাপারে তাদের জড়তা ছিল বোধগম্য। ২২শে অক্টোবরে মৈত্রীচুক্তির নবম ধারা অনুযায়ী সোভিয়েট সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিরুবিন দিল্লী সফর শুরু করার পর সোভিয়েট ভূমিকা সম্পর্কে সংশয়ের নিরসন ঘটতে থাকে। পাকিস্তানী জান্তার মনোভাব ও উদ্দেশ্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে বরং ভারতের নীতি-নির্ধারকগণ আমাদের অভিমতের নিকটতর ছিলেন। বস্তুত শেখ মুজিবের মুক্তি ও আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা জান্তার পক্ষে যে সাধ্যাতীত এ কথা বহির্মহলের অনেকেরই জানা ছিল; যেমন জানা ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তাদের প্রবল অনিচ্ছার কথা। এ সব উপলব্ধির ব্যাপার ছাড়াও বিপুল সংখ্যক শরণার্থী রক্ষণাবেক্ষণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ ভারতের জন্য এমন বিপজ্জনক হয়ে পড়ে যে, এর সম্ভাব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় রোধের জন্য দ্রুত ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণই তাদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।
অধ্যায় ১৪: সেপ্টেম্বর – অক্টোবর
সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ মুক্তিসংগ্রামের রণনৈতিক নীতির আন্তর্জাতিক দিক অত্যন্ত আশাব্যঞ্জকভাবে সংগঠিত হয়ে উঠলেও এই নীতির জাতীয় দিক, তথা, মুক্তিযোদ্ধা এবং নিয়মিত বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে দখলদার সৈন্যদের দুর্বল ও পরিশ্রান্ত করার লক্ষ্য তখনও অনায়ত্ত। সীমান্তে বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনী তখনও বিশেষ সক্রিয় নয়। আর জুলাইয়ের শেষ থেকে দেশের ভিতরে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতার যে অধোগতি শুরু হয়, তা রোধ করার মত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থাদি গৃহীত হয়নি। দেশের ভিতরে রাজনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণ, গেরিলা যুদ্ধের বিশদ পরিকল্পনা প্রণয়ন, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী গ্রহণ, কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের কমান্ডকাঠামো গঠন এবং নিয়মিত সরবরাহ ও যোগাযোগ সুনিশ্চিতকরণ ব্যতীত পরিস্থিতির উন্নতিসাধন যে অত্যন্ত দুরূহ, আগস্ট থেকেই তা সবিশেষ স্পষ্ট। অথচ মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা ক্রমাগত বৃদ্ধির মাধ্যমে দখলদার সেনাদের ক্ষতিগ্রস্ত ও যুদ্ধ-পরিশ্রান্ত করে তোলা না গেলে কেবলমাত্র ভারতীয় বাহিনীর নিয়োগ বাংলাদেশের দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য যথেষ্ট হত না।
দখলদার সৈন্যদের পরাভূত করার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা কতখানি গুরুত্বের ছিল তা ভারতের সামরিক পরিকল্পনার বিবর্তন থেকেও অনুধাবন করা সম্ভব। যে কোন কল্পিত বা সম্ভাব্য বহির্বিপদ মোকাবিলার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সব দেশের সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পরিবর্তনমান আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে কল্পিত বিপদের হ্রাস বৃদ্ধি সঠিকভাবে পরিমাপ করা এবং তা মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সকল সম্পদ সদ্ব্যবহারের চিন্তাই সামরিক পরিকল্পনার মুখ্য বিষয়। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিকল্পনারও সময়োচিত পরিবর্তন করতে হয় বলে সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। মার্চের শেষে আক্রান্ত মানুষের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করার পর বিপুল সংখ্যক শরণার্থী ভারতে প্রবেশ শুরু করলে এর অন্তর্নিহিত সামরিক ঝুঁকি বিবেচনা করে মে মাস থেকেই ভারতের সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনা শুরু করেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তার প্রতিশ্রুতি জ্ঞাপনের পর সঙ্গতভাবেই অনুমান করা যায় যে এই লক্ষ্য অর্জনও নির্মীয়মাণ ভারতীয় পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়।
‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত’-এ রকম একটা সামরিক যুক্তি পাকিস্তানী শাসকেরা বরাবর প্রায়ই প্রচার করতেন। সম্ভবত এই কারণে ১৯৬৯ সালের আগে পূর্বাঞ্চলে মোতয়েন তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল অনুর্ধ এক ডিভিশন। এমনকি ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৯৬৮-৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী গণআন্দোলনের তীব্রতা দুষ্টে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন যখন হঠাৎ বড় হয়ে ওঠে, একমাত্র তখনই ঢাকার স্বতন্ত্র ‘কোর কমান্ড’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অবশ্য কার্যক্ষেত্রে নবগঠিত ইস্টার্ন কমান্ডের জন্য ১৯৭১ সালের জানুয়ারী অবধি চার ব্রিগেডের মত সৈন্য (Division plus) মোতায়েন রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে কোন আক্রমণের আশঙ্কা না থাকায় ভারতও বরাবরই এই এলাকায় প্রায় সমসংখ্যক সৈন্য মোতায়েন রাখত। এর কিছু মোতায়েন থাকত কোলকাতার নিরাপত্তার জন্য এবং ১৯৬২ সালের পর থেকে, বেশীরভাগই থাকত ঠাকুরগাঁও ও সিকিম-পশ্চিম ভুটানের মাঝখানের সঙ্কীর্ণ ভূখণ্ড প্রতিরক্ষার জন্য। ‘Siliguri Corridor’ নামে পরিচিত এই ভূখণ্ডের কাছে চীন খুব তাড়াতাড়ি সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম। মাত্র ৩০ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সঙ্কীর্ণ এলাকা পতনের ফলে আসামসহ পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের প্রধান ভূখণ্ডের যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান থাকায় এর সামরিক গুরুত্ব বরাবরই বেশী। অবশ্য ১৯৭১ সালের মার্চে নক্সালপন্থী আন্দোলন দমন এবং সাধারণ নির্বাচনকালীন আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কাজে পশ্চিমবঙ্গে তিন ডিভিশন সৈন্য সর্বত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিস্তৃত করে রাখা হয়েছিল।
