এদিকে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর মুক্তিযুদ্ধের এক নতুন ও আশাব্যঞ্জক অধ্যায় শুরু হয়। এতদিন অবধি মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও চীনের যৌথ প্রতিক্রিয়ার কথা ভারতকে সর্বদা স্মরণ রাখতে হত। সেই ঝুঁকিকে এড়িয়ে চলার জন্য ট্রেনিং ও অস্ত্র সরবরাহে ভারত সীমিতভাবে সহযোগিতা করে এসেছে মূলত বাংলাদেশ ইস্যুকে ‘রাজনৈতিকভাবে জীবিত রাখার উদ্দেশ্যে। মৈত্রীচুক্তির ফলে এই ঝুঁকি হ্রাস পাওয়ায় ভারতের সহযোগিতা দ্রুত সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল দশ হাজারের কাছাকাছি। অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে স্থির করা হয়, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে কুড়ি হাজার করে মোট আরও ষাট হাজার মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং দেওয়া হবে এবং বাংলাদেশ নিয়মিত বাহিনীর জন্য গঠন করা হবে আরো নতুন তিনটি ব্যাটালিয়ান। এতদিন যাবত অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে অসুবিধা বিরাজমান ছির, তারও দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে আগস্টের শেষ দিক থেকে। এমনকি, সোভিয়েট কর্তৃপক্ষও হাল্কা অস্ত্রশস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারতের অসুবিধাদষ্টে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দখল করা জার্মান ও পশ্চিম ইউরোপীয় পুরাতন অস্ত্রশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে ব্যবহৃত হবে তা জেনেই জুলাই-আগস্টে ভাতের হাতে তুলে দেন।
ট্রেনিং ও অস্ত্রসরবরাহ বৃদ্ধি ছাড়াও ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ড’ আগস্টের শেষ দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধের অপারেশনস পরিকল্পনায়, বিশেষত সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে তৎপরতার লক্ষ্য (Ops target) নির্ধারণের ক্ষেত্রে, সহযোগিতা শুরু করায় এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুর্বলতা অংশত দূর হয়। ঐ সময় বাংলাদেশ সামরিক সদর দফতরে নিযুক্ত অফিসারের নিদারুণ সংখ্যাল্পতা এবং সংশ্লিষ্ট সহায়ক সার্ভিসের অশেষ দৈন্যের জন্য ‘Ops target’-এর সুযোগ ছিল সামান্য। এই সব বিষয়ে অভাব পূরণ ছাড়াও দেশের অভ্যন্তরে-বিশেষত টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, বরিশাল ও নোয়াখালীতে-যে সব স্বতন্ত্র গেরিলা গ্রুপ প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত ছিল তাদের কাছে অস্ত্র পৌঁছুনোর ব্যবস্থা গৃহীত হয়। স্বাভাবিকভাবেই ট্রেনিং ও অস্ত্রের এই সব বর্ধিত সহায়তার ফল সঞ্চার অক্টোবরের আগে ঘটে ওঠেনি।
ইতিমধ্যে আগস্ট থেকে মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা পূর্ববর্ণিত কারণে ক্রমশই নিম্নাভিমুখী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যথাসম্ভব প্রচার সত্ত্বেও দেশের ভিতরে সাধারণ মানুষের মনোবলও ক্রমাগত নীচের দিকে ধাবিত। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের এই অধোগতি কিয়দংশে ঢাকা পড়ে ১৫ই আগস্ট থেকে বাংলাদেশ নৌকমান্ডো বাহিনীর দুনিয়াকে চমক লাগানো নৌবিধ্বংসী তৎপরতায়। ভারতীয় নৌবাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশের মাত্র ৩০০ জন ছাত্র ও যুবককে ঐতিহাসিক পলাশীর অদূরে ভাগীরথী নদীতে নৌবিধ্বংসী ট্রেনিং দেওয়া হয়। এই নৌকমান্ডোরা ১৫ই আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে সর্বমোট ৫০,৮০০ টন জাহাজ নিমজ্জিত করে, ৬৬,০৪০ টন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বেশ কিছু সংখ্যক পাকিস্তানী নৌযান দখল করে নেয়। ফলে বিশ্বের বাণিজ্যিক বহরে ত্রাসের সঞ্চার হয় এবং চট্টগ্রাম ও চালনায় বাহিত পণ্যের ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম কুড়ি গুণ বৃদ্ধি পায়। সংখ্যাল্পতা সত্ত্বেও সঠিক রিক্রুটমেন্ট, উপযুক্ত ট্রেনিং, পর্যাপ্ত অস্ত্র, সুস্পষ্ট লক্ষ্য এবং নির্ভুল পরিকল্পনা কি বিরাট সাফল্য ঘটাতে পারে-এ তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করার পক্ষে ভারত সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় সাথে সাথে প্রবাসী বাংলাদেশ নেতৃত্বের দক্ষিণপন্থী অংশ ভারতের দক্ষিণপন্থী মুখপাত্রদের সঙ্গে সমস্বরে প্রচারণা চালাতে শুরু করে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে মস্কো বাংলাদেশের প্রতি কূটনৈতিক স্বীকৃতি জ্ঞাপন থেকে নয়াদিল্লীকে নিবৃত্ত করেছে এবং এর পরে ভারত কখনই আর বাংলাদেশের পক্ষে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হবে না। মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের দিন দিল্লীতে এক উল্লসিত জনসমুদ্রের কাছে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনের সাফল্যের জন্য এবং ৭০ লক্ষ শরণার্থীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য ভারত সকল কিছু করতে প্রস্তুত এই মর্মে ইন্দিরা গান্ধীর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা সত্ত্বেও মৈত্রীচুক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টির জন্য এক জোর প্রচারণা শুরু হয়। এই প্রচারণার অন্যতম মূল উৎস ছিল ‘নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় পরিবেশিত এক ‘সংবাদ’। এই ‘সংবাদ’ অনুসারে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA এক ‘গোপন’ সমীক্ষায় নিক্সনকে অবহিত করেছে যে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি বাংলাদেশকে সাহায্য প্রদান থেকে ভারতকে নিবৃত্ত করবে। ভারতে এবং বিশেষত ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশ রাজনৈতিক মহলে এই উদ্দেশ্যমূলক অসত্য প্রচার (disinformation campaign) যখন পূর্ণমাত্রায় চলছিল, তখন অন্তরালে যুক্তরাষ্ট্রের খোদ প্রেসিডেন্ট সঠিক পরিস্থিতি জানিয়েই ইয়াহিয়া খানকে নমনীয় হবার পরামর্শ দেন।
