মে মাসে এক রকম প্রকাশ্যেই আলোচিত হতে থাকে যে, RAW-এর এক বিশেষ উপসংস্থার অধীনে শীঘ্রই দেরাদুনের অদূরে চাক্রাতায় এদের জন্য বিশেষ ট্রেনিং শুরু হতে চলেছে। জুন থেকে এদের ট্রেনিং শুরু হয় এবং পর্যায়ক্রমে নভেম্বরের প্রথম দিক অবধি তা অব্যাহত থাকে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এদের প্রথম দল আত্মপ্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও স্পষ্ট হয় যে এই বাহিনী পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কর্নেল ওসমানী তথা বাংলাদেশ সরকারের কোন এখতিয়ার নেই। ফলে তাজউদ্দিন ও ওসমানী উভয়েরই সন্দেহ ঘনীভূত হয়। কিন্তু এ বিষয়ে মন্ত্রিসভার অপরাপর সদস্যের ভূমিকা ছিল দোদুল্যমান। অনেক সময় ‘মুজিব বাহিনী’র ক্ষমতা সম্পর্কে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করলেও প্রত্যেকেই তারা পৃথক পৃথকভাবে ‘মুজিব বাহিনী’র’ নেতাদের সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে ছিলেন আগ্রহী। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিরও দুর্বলতা এ ব্যাপারে ছিল যথেষ্ট। ফলে মন্ত্রিসভা এই বাহিনীকে সরকারী নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যাপারে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন। এমনিভাবে দু’মাস আগে যাদেরকে কেবল ছাত্র ও যুবকর্মী সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকারের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের সম্পূর্ণ বাইরে তারাই হয়ে ওঠে এক সশস্ত্রবাহিনীর স্বয়ং নিয়ন্ত্রিত অধিনায়কবৃন্দ।
মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করা ‘মুজিব বাহিনী’র’ লক্ষ্য বলে প্রচার করা হলেও এই সংগ্রামে তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকা, কার্যক্রম ও কৌশল কি, কোন্ এলাকায় এরা নিযুক্ত হবে, মুক্তি বাহিনীর অপরাপর ইউনিটের সাথে এদের তৎপরতার কিভাবে সমন্বয় ঘটবে, কি পরিমাণে বা কোন শর্তে এদের অস্ত্র ও রসদের যোগান ঘটছে, কোন প্রশাসনের এরা নিয়ন্ত্রণাধীন, কার শক্তিতে বা কোন্ উদ্দেশ্যে এরা অস্থায়ী সরকারের বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধাচরণ করে চলছে, এ সমুদয় তথ্যই বাংলাদেশ সরকারের জন্য রহস্যাবৃত থেকে যায়। ক্রমে বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ পায়, ‘মুজিব বাহিনী’র’ কেবল প্রশিক্ষণ নয়, অস্ত্রশস্ত্র ও যাবতীয় রসদের যোগান আসে RAW-এর এক বিশেষ উপসংস্থা থেকে এবং এই উপসংস্থার প্রধান মেজর জেনারেল উবান গেরিলা প্রশিক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসাবে মুজিব বাহিনী’ গড়ে তোলার দায়িত্বে নিযুক্ত রয়েছেন।৮৯ এ সব কিছুই হয়ত মেনে নেওয়া সম্ভব হত, যদি এই বাহিনী পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হত।
প্রথম দিকে মুজিব বাহিনী’র স্বতন্ত্র অস্তিত্বের তিনটি সম্ভাব্য কারণ অনুমান করা হয়: (১) শেখ মণির দাবী অনুযায়ী, সত্যই কেবল মাত্র তারাই সশস্ত্রবাহিনী গঠনের ব্যাপারে শেখ মুজিব কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি এবং এই সম্পর্কে ভারত সরকারের উধ্বর্তনমহল কেবল অবহিতই নন, অধিকন্তু এদেরও সহায়তা প্রদানের ব্যাপারে ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; (২) যদি কোন কারণে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা নেতৃত্বদানে ব্যর্থ হন, তবে সেই অবস্থার বিকল্প নেতৃত্ব হিসাবে এদেরকে সংগঠিত রাখা; এবং (৩) বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম কোন কারণে দীর্ঘায়িত হলে বামপন্থী প্রভাব যদি বৃদ্ধি পায়, তবে তার পাল্টাশক্তি হিসাবে এদের প্রস্তুত করে তোলা। কিন্তু কেবল শেষোক্ত এই দুই আশঙ্কা থেকেই প্রথম দিকে যদি ‘মুজিব বাহিনী’কে স্বতন্ত্রভাবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে থাকে, তবে বলা যায় আগস্ট নাগাদ দুটো আশঙ্কাই প্রায় অমূলক হয়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে ‘মুজিব বাহিনী’ কর্তৃক ক্ষেত্রবিশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া, তাদের আনুগত্য পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা ও মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহের প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে কেবল যে মুক্তিযুদ্ধকেই ভিতর থেকে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছিল তা নয়, অধিকন্তু আশ্রয়দাতা সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও এক সন্দেহের আবহাওয়াকে উৎসাহিত করে তোলা হচ্ছিল।
তাজউদ্দিন আগস্টের মাঝামাঝি দিল্লীতে এই অবস্থার সত্বর প্রতিবিধানের দাবী তোলেন, কিন্তু হাকসার এবং কাও দু’জনই নীরব থাকেন। ক্ষুব্ধ তাজউদ্দিন কোলকাতা ফিরে ‘মুজিব বাহিনী’কে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এই অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপকে খর্ব করার জন্য আমাকে আলোচনাধীন বিকল্প পদক্ষেপ জরুরীভিত্তিতে চূড়ান্ত করতে বলেন। এ সম্ভাবনা তখন স্পষ্ট যে, যদি অবিলম্বে তাদের নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তবে স্বাধীনতার যুদ্ধ অচিরেই এক রক্তাক্ত আত্মঘাতী লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে। তা ছাড়া জাতীয় মোর্চা গঠনের প্রশ্নে ‘মুজিব বাহিনী’ আওয়ামী লীগের ভিতরের বিরুদ্ধ শক্তিকে যদি প্ররোচিত করে তোলে, তবে তার ফলে জাতীয় মোর্চার গঠনই কেবল দুঃসাধ্য হবে তাই নয়, এর ফলে মুক্তিযুদ্ধকে ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম’ হিসাবে উপস্থিত করে সোভিয়েট সহযোগিতা অর্জনের প্রচেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী কর্নেল ওসমানী এই সব রাজনৈতিক বিচার-বিবেচনা ছাড়াই ‘উচ্ছঙ্খল ও অন্তর্ঘাতী কার্যকলাপের জন্য রিক্রুটিং-এর ব্যাপারে এপ্রিল মাসে যে অধিকারপত্র তিনি শেখ মণি ও তার সহকর্মীদের দিয়েছিলেন, তা প্রত্যাহার করেন এবং ‘মুজিব বাহিনী’কে’ শীঘ্রই তাঁর কমান্ডের অধীনে না আনা হলে পদত্যাগ করবেন বলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে জানিয়ে দেন।
