বিগত চার সপ্তাহের যুদ্ধ হুঙ্কার বন্ধ করে ইয়াহিয়াচক্রও হঠাৎ খোল পাল্টানোর কৌতুককর মহড়ায় অবতীর্ণ হয়। এমনিভাবে ১৪ই আগস্টে ‘দেশ সেবার জন্য জেনারেল টিক্কা খানকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ খেতাব দিয়েও মাত্র সতের দিনের মধ্যে তাকে গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া, তদস্থলে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য’ বাঙালী গভর্নর হিসাবে আবদুল মালেককে নিয়োগ করা, নির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত নয় এমন সব ‘দুষ্কৃতিকারীর’ জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে ইচ্ছুক শরণার্থীদের জন্য ‘অভ্যর্থনা শিবির’ স্থাপন করা, ‘দেশদ্রোহের অপরাধে’ অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্বনির্ধারিত বিচার ১১ই আগস্ট একদিনের জন্য শুরু করেও সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান অনুসন্ধানের জন্য তা পিছিয়ে দেওয়া ইয়াহিয়ার ইত্যাকার নমনীয়তা ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই ঘটতে শুরু করে এবং নিক্সনের চিঠির পর তা আরও ত্বরান্বিত হয়। এই সব বাহ্যিক পরিবর্তনের অন্তরালে ইসলামাবাদের ক্ষমতার কেন্দ্রে কি ঘটছিল তা জানার কোন উপায় তখন আমাদের ছিল না। তবে পাকিস্তান আসন্ন বিপর্যয়কে এড়াবার জন্য পূর্বাঞ্চলে তার বাহ্যিক ভূমিকা পরিবর্তন করলেও বৃহত্তর পাক-ভারত যুদ্ধে বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে নিমজ্জিত করার অন্যান্য প্রস্তুতি অব্যাহত রাখে।
অধ্যায় ১১: আগষ্ট – সেপ্টেম্বর
ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক কর্মসূচীর প্রধান নিয়ন্ত্রকের পদে পরিবর্তনের সংবাদ আমাদের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। ভারতের ক্ষমতাযন্ত্রে বাম ও দক্ষিণের নেপথ্য টানাপোড়েন তখনও আমাদের সম্যক উপলব্ধির অন্তর্গত নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের সুস্পষ্ট ইচ্ছা ব্যক্ত হওয়া সত্ত্বেও ‘মুজিব বাহিনী’কে’ বাংলাদেশ কমান্ডের অধীনস্থ করার প্রশ্নে ভারতীয় প্রশাসনের এক শক্তিশালী অংশের অসহযোগিতা এই সংশয়ের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এতদিন অবধি বাংলাদেশ-সংক্রান্ত ভারতের নীতি ও কর্মসূচীর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব পি. এন. হাকসার। তার সঙ্গে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তার নৈকট্য প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে মাত্র। কিন্তু সমস্যার কলেবর উত্তরোত্তর বিশাল ও জটিল হয়ে ওঠায় এবং বিশেষত হাকসারের অবসর গ্রহণের মেয়াদ নিকটবর্তী হওয়ায় ভারত সরকার তাদের বাংলাদেশ বিষয়ক সমস্যার সামগ্রিক ও সার্বক্ষণিক দায়িত্বে ডি. পি. ধরকে নিযুক্ত করেন। এ জন্য ইতিমধ্যেই ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদাসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘পলিসি প্লানিং কমিটির চেয়ারম্যান পদে তার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। ৬ই সেপ্টেম্বর সামগ্রিক দায়িত্বভার গ্রহণের আগে আলোচনাধীন নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে মতবিনিময় ছাড়াও বাংলাদেশের প্রবাসী নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ আন্দোলনের রাজনৈতিক উপাদান সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা গঠন করার উদ্দেশ্যে ডি. পি. ধর ২৯শে। আগস্ট সকালে কোলকাতা আসেন। কিন্তু অন্তত কয়েকটি বিষয়ে তাঁর উদ্যোগের গতি ও ধরন থেকে আমাদের মনে হয়, ভারত সরকার অবশেষে একটি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে সমগ্র ঘটনাধারাকে পরিচালিত করার বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ। অধিকৃত এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের পরিসর ও তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য যুব শিবিরের সম্প্রসারন থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা ক্রমশ এক সুসমন্বিত সম্প্রসারণের রূপ ধারণ করতে শুরু করে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশেষত স্বাধীনতা-সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলিকে একটি ফোরামে একত্রিত করার ব্যাপারে ডি. পি. ধরের ব্যগ্রতা আমাদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়। এ ক’দিনের আলাপ আলোচনা সম্পর্কে আমার নোটের উদ্ধৃতিই সম্ভবত পরিস্থিতির অধিকতর নির্ভরযোগ্য বর্ণনাঃ
২৯শে আগস্ট
‘Missed the appointment a 10:30 am with DP… and arrived Hotel Hindustan at 11:45 am when he was already in session with the Acting President and the PM… I met DP at past 12:30. He wanted an overall political appreciation of the current situation. As the political leadership was still suffering from lack of cohesion and frittering its energy on matters of secondary interest, the sector war was progressively faltering and FFs facing enormous political pressure inside the country, I suggested the need/possibility of a fresh bold move to inject some efficiency in the insurgency management by inducting middle level politicos belonging to AL and non-Al streams including some civil servants, without disturbing the formal structure of the Government. This middle level task force could work under the PM and its operational structure could be the proposed national united front. But the front itself was still facing covert opposition from within the cabinet and would require GOI’s (Government or India’s) strong support to overcome the opposition.
