পরদিন দুপুর সাড়ে তিনটায় আবার খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি সে দিন মস্কো ছাড়াও আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনকালে নিউইয়র্ক গিয়ে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন। তিনি এ ব্যাপারে দিল্লীতে পি. এন. হাকসারের সমর্থন সংগ্রহ করা সম্ভব কি না, তা জানতে চান। ১৪ ও ১৬ই আগস্ট আরো দু’ দফা আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয় পরিষ্কার করা সম্ভব হয়, তিনি যে অবস্থানে রয়েছেন সেখান থেকে নিউইয়র্ক পৌঁছুতে হলে তাকে অতিক্রম করতে হবে দিল্লী ও মস্কোর পথ এবং এই দুই অন্তর্বর্তী গন্তব্যস্থল সুগম হতে পারে, যদি জাতীয় মোর্চা গঠনে তাঁর সক্রিয় সমর্থন থাকে। তবু এই সব আলোচনার শেষে আমার ধারণা জন্মায়, নিউইয়র্ক অবধি নিজের যাত্রাপথ সম্প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে জাতীয় মোর্চা গঠনের প্রতি তাঁর মৌখিক সমর্থন থাকলেও মন্ত্রিসভার অন্য কোন সদস্য যদি এই প্রস্তাবকে ভণ্ডুল করেন, তবে তিনি অখুশী হবেন না; পক্ষান্তরে, তার যাত্রার ব্যবস্থা যদি পাকাপাকি রূপ নেয়, তবে তিনি মোর্চা গঠনকেও হয়ত সমর্থন দিতে পারেন। যেভাবেই হোক মস্কো হয়ে তার নিউইয়র্ক যাবার কথা সেই সময় এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার আকারেই আলোচিত হতে থাকে। ওদিকে তাজউদ্দিনও অস্থায়ী প্রেসিডেন্টকে মোর্চার ব্যাপারে সম্মত করার ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম অনিশ্চিত অবস্থার সম্মুখীন হন। দলের সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে প্রিয়ভাজন থাকার প্রচেষ্টাই সৈয়দ নজরুলের দোদুল্যমানতার মূল কারণ বলে অনুমান করা হয়।
এ দিকে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর দিল্লী থেকে অন্তত দুবার ফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারে অগ্রগতির কথা জানতে চাওয়া হয়েছে। কাজেই তাজউদ্দিন স্থির করেন, মন্ত্রিসভার ফ্রন্ট প্রসঙ্গে এই অনিশ্চিত সমর্থন সম্পর্কে বরং দিল্লীকে আভাস দেওয়া ভাল; যদি তারা এ ক্ষেত্রে কোন সাহায্য করতে নাও পারেন তবু অন্তত কোন অবাস্তব অনুমানের উপর নির্ভর করে পদক্ষেপ গ্রহণের বিড়ম্বনা থেকে তাঁরা মুক্ত থাকবেন। ১৯শে আগস্ট পি. এন. হাকসারকে সংক্ষেপে পরিস্থিতি জানিয়ে আমি উল্লেখ করি, জাতীয় মোর্চার পক্ষে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা যদিও বর্তমান, তবু এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলার সময় এখনও আসেনি। ২২শে আগস্ট দিল্লী থেকে হাকসার আমাকে সংবাদ পাঠান যে, ২৯শে আগস্ট ভারতের প্রাক্তন মস্কোস্থ রাষ্ট্রদূত ডি. পি. ধর কোলকাতা আসবেন এবং অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে জাতীয় মোর্চা গঠনের বিষয়েও তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলাপ করবেন। ইতিপূর্বে মৈত্রীচুক্তির স্বাক্ষরের ৫/৬ দিন বাদে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদ যখন আলাপ আলোচনার জন্য দিল্লী আমন্ত্রিত হন, তখন ইন্দিরা গান্ধী তাদের জানান যে, এরপর থেকে তার সবিশেষ আস্থাভাজন প্রতিনিধি হিসাবে ডি. পি. ধর ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক নীতি ও কর্মতৎপরতার সমন্বয় সাধনে নিয়োজিত থাকবেন।
আগস্ট মাসে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন এবং সেই চুক্তিকে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের অনুকূলে সম্প্রসারিত করার প্রচেষ্টা ছাড়াও এই সময়ের অন্তত আর একটি ঘটনা-বিকাশ উল্লেখ করা প্রয়োজন। আগস্টে দিল্লী সফরকালে তাজউদ্দিন প্রথমবারের মত RAW-এর সাহায্যপুষ্ট ‘মুজিব বাহিনী’র ক্রমবর্ধমান উচ্ছঙ্খলা ও সরকারবিরোধী দৌরাত্মে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ ব্যাপারে পি. এন. হাকসার ও RAW-প্রধান রামনাথ কাও-এর সহযোগিতা কামনা করেন। আগস্টের প্রথম দিকে কয়েকটি সেক্টর থেকে খবর পৌঁছাতে শুরু করে যে, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, ‘মুজিব বাহিনী’ (সূচনায় যার নাম ছিল ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’, সংক্ষেপে BLF) বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের আনুগত্য পরিবর্তন করে তাদের বাহিনীতে যোগ দেবার জন্য নিরন্তর চাপ প্রয়োগ করছে, কোথাও কোথাও অস্ত্র কেড়ে নিচ্ছে এবং এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কিছু কিছু সংঘর্ষও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অবশ্য গোড়া থেকেই ‘মুজিব বাহিনী’ বাংলাদেশ সরকার গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে এসেছে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচারণা চালিয়ে এসেছে যে, তারা এ সরকারকে স্বীকার করে না। বস্তুত এই বাহিনীর সদস্যভুক্তির জন্য সর্বাধিনায়ক হিসাবে শেখ মুজিবর রহমান এবং তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল হক মণির প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেই শপথনামা পাঠ করা হত।
সূচনায় অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন নিয়েই এই বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এপ্রিলের প্রথমার্ধে সীমান্ত অতিক্রমকারী ছাত্র ও যুবকের সংখ্যা ছিল অল্প। কাজেই মুক্তিবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে ১৮ই এপ্রিল নবগঠিত বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা দেশের ভিতর থেকে ছাত্র ও যুবকর্মী সংগ্রহ করে আনার দায়িত্ব অর্পণ করেন শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ ও আবদুর রাজ্জাকের উপর। এক অজ্ঞাত কারণে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এই তরুণ নেতাদের ক্ষমতা সম্প্রসারিত করে রিক্রুটিং-এর দায়িত্ব ছাড়াও সশস্ত্রবাহিনী গঠন ও পরিচালনার অধিকার প্রদান করেন। এই অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদানের প্রশ্নে তাজউদ্দিনের সম্মতি ছিল না, বস্তুত মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে এদের তীব্র বিরোধিতা তিনি অতিক্রম করতে চলেছেন মাত্র। বাংলাদেশ মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে দিয়ে তৎপরিবর্তে এই তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট গঠনের দাবী তখনও অব্যাহত। এদের নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ সশস্ত্রবাহিনী বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টার খবরও তাজউদ্দিনের কানে এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু দলের মধ্যে তার অতিশয় নাজুক অবস্থার দরুন এই তরুণ নেতাদের ক্ষমতা সমপ্রসারণের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ওসমানী নিজেও সৈয়দ নজরুল প্রদত্ত এঁদের এই সম্প্রসারিত ক্ষমতা সম্পর্কে সংশয়মুক্ত ছিলেন না।
