স্বাক্ষরিত মৈত্রীচুক্তির সমূহ গুরুত্ব ছিল এর নবম ধারায়। এই ধারা অনুযায়ী চুক্তিবদ্ধ দুই দেশের কারো বিরুদ্ধে যদি বহিঃআক্রমণের বিপদ দেখা দেয়, তবে এই বিপদ অপসারণের জন্য উভয় দেশ অবিলম্বে ‘পারস্পরিক আলোচনায় প্রবৃত্ত হবে এবং তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য যথোচিত ব্যবস্থা অবলম্বন করবে। পাকিস্তান ও চীন উভয়ের জন্যই এই ঘোষণার মর্ম ছিল অতিশয় প্রাঞ্জল এবং সম্ভাব্য শরৎকালীন অভিযানের পথে প্রতিবন্ধক। পাকিস্তান ও চীনের আসন্ন আক্রমণ সম্ভাবনা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে এই চুক্তির উপযোগিতা অসামান্য হলেও এর পিছনে ভারতের পক্ষে সম্ভবত আরো দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা সক্রিয় ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সাহায্য করার কোন এক পর্বে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠা অসম্ভব ছিল না এবং এই আশঙ্কাবোধ থেকে ভারত নিশ্চিত হতে চেয়েছে যাতে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রারম্ভে বা মাঝপথে সোভিয়েট সামরিক সরবরাহ মন্থর বা বন্ধ না হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যদি পূর্বতন স্থিতাবস্থা বজায়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করতে উদ্যত হয়, তবে সেখানেও যাতে সোভিয়েট ভূমিকা ভারতের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই সহায়ক থাকে। মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর এই সব প্রতিরক্ষামূলক চিন্তাভাবনা ছাড়াও ভারতের নীতি-নির্ধারকদের মনে ক্রমশ এই আস্থার সঞ্চার ঘটে যে, নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর এবং শীতকালে উত্তরের গিরিপথগুলি তুষারাবৃত হওয়ার ফলে চীনা তৎপরতার আশঙ্কা সম্পূর্ণ তিরোহিত হওয়ার পর–সশস্ত্র অভিযানের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাকিস্তানী দখলের অবসান ঘটিয়ে শরণার্থীদের সেখানে ফেরৎ পাঠানো সম্ভব।
কিন্তু আগস্টে ভারতের এ জাতীয় প্রত্যাশার প্রতি রাশিয়ার যে সম্মতি ছির তা বলার উপায় নেই। বরং বিশ্ব শক্তি হিসাবে রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি মৈত্রীচুক্তি সম্পর্কে কিছুটা আলাদা থাকাই ছিল স্বাভাবিক। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ক্ষমতায় আসার পর ১৯৬৯ সাল থেকে বৃহৎশক্তি পর্যায়ে উত্তেজনা হ্রাস প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এবং বিশেষত ‘SALT -1’ মারণাস্ত্র সীমিতকরণ আলোচনায় উভয় পক্ষের স্বার্থ অসামান্যভাবে জড়িত থাকায় সোভিয়েট মার্কিন পারস্পরিক সম্পর্ককে মূলত একটি আঞ্চলিক ইস্যুতে পুনরায় উত্তেজনাময় করে তোলার ইচ্ছা সম্ভবত কোন পক্ষেরই ছিল না। তা ছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে তাসখন্দ চুক্তির মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসাবে রাশিয়া, পাকিস্তানী জান্তার গণহত্যার নীতিকে জোরাল ভাষায় নিন্দা করা সত্ত্বেও, তদন্তেই পাকিস্তান সম্পর্কে ভারতের মত যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে, এ প্রত্যাশা বাস্তবধর্মী ছিল না। তবু জুলাই মাসে কিসিঞ্জারের চীন সফরের ফলে যে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যের একটি অবাঞ্ছিত পরিবর্তন হিসাবে গণ্য করা রাশিয়ার পক্ষে ছিল নিতান্তই স্বাভাবিক। তাদের নিজেদের জন্য চীন-মার্কিন আঁতাতে সৃষ্ট বিড়ম্বনা অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী ব্যাপার হলেও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারতের নিরাপত্তার জন্য এই আঁতাত ছিল তাৎক্ষণিক হুমকিস্বরূপ। সম্ভাব্য চীনা আক্রমণের বিরুদ্ধে ভারতের উত্তর সীমান্তের নিরাপত্তা সম্পর্কে পূর্ব-প্রদত্ত মার্কিন প্রতিশ্রুতি নাকচ করার সমূহ তাৎপর্য এবং যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের উপর্যুপরি হুমকি থেকে ভারতের নিরাপত্তা সম্পর্কে রাশিয়ার চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। এই দুশ্চিন্তাই ছিল সম্ভবত মৈত্রীচুক্তির নবম ধারায় সম্মত হওয়ার পিছনে তাদের অন্যতম মুখ্য বিবেচনা। কিন্তু পাক-চীন হুমকির মুখে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করা ছাড়াও ভারতের প্রয়োজন ছিল শরণার্থী সমস্যার বাস্তব সমাধানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে জয়যুক্ত করা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের জন্য ভারতের ক্রমবর্ধমান সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কে সোভিয়েট ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট জড়তা অতিক্রম করাই তাই ভারতের চুক্তি–পরবর্তী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের এই প্রচেষ্টাকে সফল করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐক্য তখনও একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান।
কাজেই আমাদের পূর্ববর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর দিন অর্থাৎ ১০ই আগস্ট বিকেল চারটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে আমি দেখা করি দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে। সূচনাতেই তিনি মৈত্রীচুক্তির ফলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম লাভবান হবে এই মর্মে কিছু মন্তব্য করেন। ফলে কোন ভূমিকা ব্যতিরেকেই আমার বলা সহজ হয় যে, এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে ভারত ও রাশিয়ার উষ্ণভাব বজায় থাকতে থাকতেই আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের দুটি জরুরী উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। আভ্যন্তরীণ উদ্যোগের ক্ষেত্রে মস্কোপন্থী নামে পরিচিত দুটি দলসহ স্বাধীনতা সমর্থক সব ক’টি দলের সমবায়ে একটি ফ্রন্ট গঠন করা সম্ভব হলে, তত্ত্বীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গঠনের পদক্ষেপ হিসাবে রাশিয়ার কাছে তা আদত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই খোন্দকার মোশতাক নিজে এই ফ্রন্ট গঠনের কাজে উদ্যোগী হলে, এর ভিত্তিতে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য সহযোগিতায় তার মস্কো যাওয়ার পথ সুপ্রশস্ত হতে পারে। বেসরকারীভাবে হলেও মস্কোর সঙ্গে যদি তার তথা বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং ভারতের উপর সার্বিক নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ওঠার পথে তা সহায়ক হতে পারে। সে দিনের মত এই সব চিন্তাভাবনা তার কাছে রেখে আমি ফিরে আসি।
