সশস্ত্র রাজাকারের দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে এর গুরুতর তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদের প্রথম সজাগ করে তোলে আমাদের ঢাকাস্থ তথ্য গ্রুপ। মার্চে পাকিস্তানী হামলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কিছু রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধ সহায়তার কাজে সংঘবদ্ধ হন। এরূপ গোপন সহায়তার উদাহরণ দেশে আরো অনেক থাকলেও, একটি কারণে ঢাকা তথ্য গ্রুপের অবদান বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ঢাকা থেকে এই গ্রুপ নির্ভরযোগ্য নানা তথ্য দক্ষতার সাথে সংগ্রহ করে গড়ে তিন সপ্তাহে একবার আমার কাছে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করতেন। মোখলেসুর রহমান, তাঁর স্ত্রী রোজ’বু, জিয়াউল হক, আনোয়ারুল আলম, আতাউস সামাদ, জহিরুল ইসলাম, রহমত উল্লাহ এবং আরো কয়েকজন এই গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং প্রশংসনীয় নির্ভুলতার কারণে তাদের পাঠানো তথ্যাদি ও সমীক্ষা প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনাদির কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
রাজাকার বাহিনীর দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে জামাতে ইসলাম প্রভৃতি দলগুলির ‘আদর্শগত উদ্দীপনা’ ছাড়াও, নিয়মিত ভাতা, রেশন, স্থানীয় ক্ষমতার ব্যবহার এবং সর্বোপরি হিন্দু সমপ্রদায় ও আওয়ামী লীগ সদস্যদের ঘরবাড়ী ও বিষয় সম্পত্তি অবাধে লুটপাট ও ভোগদখল করার সুযোগ ছিল যোগদানকারীদের জন্য বিরাট আকর্ষণ। রাজাকার বাহিনীর তুলনামূলক সংখ্যাধিক্য, অস্ত্রশস্ত্রের সুবিধা এবং দ্রুত চলাচল ক্ষমতার দরুন এদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সীমিত অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ বেশ বেকায়দায় পড়ে। শান্তি কমিটির গোপন চর ও রাজাকারদের দৌরাত্ম এবং পাকিস্তানী বাহিনীর নির্বিচার প্রতি আক্রমণের ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের চমকপ্রদ তৎপরতা মাত্র ৫/৬ সপ্তাহের মধ্যেই হ্রাস পেতে শুরু করে।
মুক্তিযুদ্ধের এই অধোগতি রোধ করার জন্য আগস্টের প্রথম দিকে তাই কয়েকটি বিষয়ের পুনর্বিবেচনা অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠে। প্রথমত, মে মাসে নিয়মিত বাহিনী বাদে সর্বমোট যে কুড়ি হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রেনিং দানের সিদ্ধান্ত করা হয়েছিল, তা বাস্তব প্রয়োজনের আলোকে দ্রুত বাড়িয়ে তোলা এবং তাদের অস্ত্রসজ্জার মান উন্নত করার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানী চরদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং রাজাকার বাহিনীর প্রতি আক্রমণ এড়িয়ে সশস্ত্র তৎপরতা চালাবার জন্য ব্যাপক সংখ্যায় শরণার্থী রাজনৈতিক কর্মীদের ফেরৎ পাঠানো এবং তাদের সহায়তায় দেশের ভিতরে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাঁটি গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত হয়। তৃতীয়ত, রিক্রুটের নীতি দলীয় আনুগত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার না করে যোদ্ধা তরুণদের সংগ্রামী যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত গুণাগুণের ভিত্তিতে অনুসরণ করার প্রয়োজন অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ ব্যবস্থাপনার এই সব জরুরী প্রয়োজন কিভাবে বা কত তাড়াতাড়ি মেটানো যাবে, সে সম্পর্কে অবশ্য কোন পরিষ্কার ধারণা গঠন আগস্টের প্রথম অবধি আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
আলোচ্য সময়ে পূর্ব বাংলার অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের নব প্রাণ সঞ্চার এবং সীমান্তে মুক্তাঞ্চল গঠিত হওয়ার আশঙ্কায় পাকিস্তান একদিকে যেমন ছিল উদ্বিগ্ন, তেমনি অপরদিকে ছিল চীন-মার্কিন আঁতাতের সম্ভাব্য কার্যকারিতায় আশান্বিত। এই দুই বিপরীতমুখী সম্ভাবনার মাঝে পাকিস্তানী জান্তা জুলাইয়ে সম্ভবত এমন সিদ্ধান্তের কাছাকাছি পৌঁছায় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে উত্তরোত্তর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার পরিবর্তে বরং আরেক দফা পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু করা অধিক যুক্তিযুক্ত। জুলাইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে কিসিঞ্জার ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে পাকিস্তান কর্তৃক যুদ্ধ ঘোষণা এবং সেই যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক
করে দেওয়ার পর, ১৯শে জুলাই, ৩০শে জুলাই এবং ৪ঠা আগস্ট মোট তিন-দফায় ভারতের বিরুদ্ধে ইয়াহিয়ার যুদ্ধংদেহী ঘোষণা যেমন শূন্যগর্ভ ছিল না, তেমনি আসন্ন যুদ্ধে ‘পাকিস্তান একা থাকবে না’ এই মর্মে তার সতর্কবাণীও তাৎপর্যহীন ছিল না। যুদ্ধোপযোগী ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ সাপেক্ষে শরৎকাল ছিল পাকিস্তানের যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রকৃষ্ট সময়। এর কারণ-প্রথমত, বাংলাদেশে সফল অভিযান চালাবার মত সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ অথবা সৈন্য সমাবেশ তখনও ভারত সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি; দ্বিতীয়ত, শরৎকালে অসংখ্য খাল-বিল নদীনালা পরিকীর্ণ পূর্ব বাংলা প্রতিরক্ষা যুদ্ধের পক্ষে আদর্শ স্থানীয় বলে এ সময়ে ভারতের পক্ষে দ্রুত ও চূড়ান্ত সামরিক বিজয় সাধন ছিল প্রায় অসম্ভব; এবং তৃতীয়ত, ভারত-তিব্বত সীমান্তের সকল গিরিপথ বরফমুক্ত থাকায় পাকিস্তানের মিত্ররাষ্ট্র চীনের ভারতবিরোধী অভিযানের পথে কোন বড় অন্তরায় ছিল না। শরৎকালীন যুদ্ধে বিপর্যয়ের ঝুঁকি নগণ্য বিধায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রমবর্ধমান তৎপরতাকে এক বৃহত্তর পাক-ভারত যুদ্ধে নিমজ্জিত করা, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাকিস্তানী প্রবণতা আগস্টের প্রথম সপ্তাহ অবধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু শরৎকালীন যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের এই প্রবণতা বিঘ্নিত হয় সোভিয়েট পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁন্দ্রে গ্রোমিকোর আকস্মিক দিল্লী সফর এবং ৯ই। আগস্টে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের ফলে।
অধ্যায় ১০: আগষ্ট
পরবর্তীকালে কিসিঞ্জার নিজে ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তির সংবাদকে ‘bombshell’ হিসাবে অভিহিত করেছেন। সেই চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা কেবল যে বহির্বিশ্বের কাছেই অভাবনীয় ছিল তা নয়, এমনকি ভারতের খোদ ক্ষমতাসীন মহলেও এ সম্পর্কে সামান্যতম ধারণা যাদের ছিল, তাদের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত অল্প। ভারতের মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্যরাও (রাজনৈতিক বিষয়ক কমিটির গুটিকয় সদস্য বাদে) এই চুক্তির বিষয় জানতে পারেন চুক্তি স্বাক্ষরের দিন সকালে। জুলাইয়ে পাকিস্তানের সহায়তায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ফলে ভারতের নিরাপত্তাহীনতাবোধ যখন চরমে পৌঁছে তখন ভারতীয় মন্ত্রিসভার ‘রাজনৈতিক বিষয়ক কমিটি’ দু’বছরের পুরাতন এক খসড়াকে ভিত্তি করে ভারত-সোভিয়েট চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৬৯ সালের প্রথমদিকে উসুরী নদী বরাবর চীন ও সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর সোভিয়েট ইউনিয়ন ভারতসহ কয়েকটি এশীয় দেশের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। এই উদ্দেশ্যে মস্কোতে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সপ্তাহে দু’বার, বুধ ও শনিবারে, ভারত ও সোভিয়েট প্রতিনিধিদের নিয়মিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হত। কিন্তু ঐ আলোচনার সময়ে ইয়াহিয়া সরকার পেশোয়ারের অদূরে বাদবেরে মার্কিন ঘাঁটির চুক্তি নবায়ন না করায় সোভিয়েট ইউনিয়ন পাকিস্তানকে কিছু সামরিক সাজ-সরঞ্জাম সরবরাহে সম্মত হয়। অংশত এর ফলে প্রস্তাবিত মৈত্রীচুক্তি সম্পর্কে ভারতের আগ্রহ হ্রাস পায় এবং আলোচনায় ছেদ পড়ে। ১৯৬৯ সালের আলোচনায় ভারতের পক্ষে অংশগ্রহণকারী ছিলেন তদানীন্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ডি, পি. ধর। কাজেই ‘রাজনৈতিক বিষয়ক কমিটির সিদ্ধান্তের পর তিনিই পুনরায় নিযুক্ত হন মৈত্রীচুক্তির সেই পুরাতন খসড়াকে পরিবর্তিত প্রয়োজনের আলোকে চূড়ান্ত করার দায়িত্বে।
