এদিকে ঠিক একই সময়ে, অর্থাৎ জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপমহাদেশীয় নীতি নানাবিধ স্তরে উন্মোচিত হতে শুরু করে, যেগুলি কার্যকর হলে বাংলাদেশের সদ্যপ্রসূত স্বাধীনতা সম্ভবত সূতিকাগৃহেই নিশ্চিহ্ন হত। বস্তুত পরবর্তীকালে প্রকাশিত তথ্যাদি থেকে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার মানুষের নির্বাচনী রায় সামরিক পন্থায় নস্যাৎ করার জন্য জানুয়ারী থেকে পাকিস্তানী জান্তা যে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র অনেক কিছুই অবহিত ছিল এবং এ ব্যাপারে আপত্তি না করে পরোক্ষভাবে জান্তাকে সমর্থন করে যাওয়াই তাদের সরকারী নীতি ছিল। মার্চে শেখ মুজিবের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কয়েক দফা বৈঠকের ঘটনা থেকেও অনুমান করা যায় যে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল না। মার্চ-এপ্রিলের অনুসৃত মার্কিন নীতির প্রতিবাদ জ্ঞাপন করার ফলে নিজেদের ঢাকাস্থ কনসাল জেনারেল আর্চার বাড়কে এপ্রিল মাসে রাতারাতি বদলী করে মার্কিন সরকার জান্তার অভিযানের প্রতি তাদের গোপন সমর্থনের কথা প্রকাশ করেন। জুনে তাদের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয় পাকিস্তান জান্তার জন্য যুদ্ধাস্ত্রের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। এরপর জুনের শেষে ও জুলাইয়ের প্রথমার্ধে মাত্র ৩/৪ হাজার ছাত্র-যুবক ন্যূনতম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সাথে সাথে সেখানে আভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য যখন দ্রুত দখলদার সৈন্যদের বিরুদ্ধে পরিবর্তিত হতে শুরু করে তখন মার্কিন পর্যবেক্ষকদের জন্য তার তাৎপর্য খাটো করে দেকার অবকাশ ছিল না।
জুলাইয়ের শেষার্ধে ও আগস্টের প্রথম দিকে মার্কিন সরকারের বাংলাদেশ বিরুদ্ধতার কার্যক্রম মোটামুটি চারটি স্তরে অনুসত হতে দেখা যায়: (১) গণহত্যার শুরু থেকে পাকিস্তানী বাহিনীর জন্য মার্কিন যুদ্ধাস্ত্র, গোলাবারুদ ও যন্ত্রাংশের যে সরবরাহ শুরু হয়, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের অস্বীকৃতি এবং মার্কিনী জনপ্রতিনিধি ও জনমতের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও এক অদ্ভুত যুক্তিতে তা অব্যাহত থাকে। (২) মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য প্রদান থেকে বিরত করার উদ্দেশ্যে ভারতের উপর যে বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, তারই অংশ হিসাবে ১৭ই জুলাই কিসিঞ্জার ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে চীনের সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপের মুখে ভারতকে রক্ষা করার অক্ষমতা জ্ঞাপন করেন। (৩) মুক্তিযোদ্ধাদের সীমান্ত পারাপার এবং দেশের অভ্যন্তরে তাদের গতিবিধি ও তৎপরতার উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও আমেরিকার উৎসাহের কোন ঘাটতি ছিল না। পূর্ব বাংলার সীমান্তে ‘সাহায্য ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ হিসাবে ১৫৬ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করার ব্যাপারে জাতিসংঘকে সম্মত করানোর কাজ আমেরিকার ‘আগ্রহ ও ব্যয়ভার গ্রহণে সম্মতির ফলেই সম্ভব হয়। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা রোধ করার জন্য এমন কিছু কিছু উদ্যোগের আভাস পাওয়া যায়, যাতে আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সূচনাপর্বের স্মৃতি জাগ্রত হয়। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানী সৈন্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন সহায়তা চলছিল এক রকম প্রকাশ্যেই। কিন্তু তাদের গোপন সহায়তার উদ্যোগ ছিল আরও মারাত্মক। যেমন সিনেটর কেনেডী প্রকাশ করেন, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিলে গেরিলাবিরোধী তৎপরতায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মার্কিনী ‘পুলিশ বিশেষজ্ঞ’ রবার্ট জ্যাকসনকে ‘প্রয়োজনীয় পুলিশ টিম’সহ ঢাকাস্থ টঝঅওউ নিয়োগ করতে চলেছে। (৪) প্রবাসী সরকারের একাংশের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভিতর থেকে বিভক্ত ও লক্ষ্যচ্যুত করার মার্কিনী কার্যক্রম সম্ভবত এ সময় অথবা এর কিছু আগে থেকে শুরু। কিসিঞ্জার তার স্মৃতিগ্রন্থের প্রথম খণ্ডে এই যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার তারিখ যদিও ৩০শে জুলাই বলে উল্লেখ করেছেন, তবু কথিত যোগাযোগকারীর নাম, যোগাযোগের সময় ইত্যাদি যথারীতি প্রকৃত যোগাযোগ ও কার্যকলাপ গোপন করার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে বলে অনুমান করা অসঙ্গত নয়। যথাস্থানে এই প্রসঙ্গে ফিরে আসার সুযোগ উন্মুক্ত রেখে আপাতত এটুকুই বলা যায়, প্রবাসী সরকারের দক্ষিণপন্থী অংশের সহযোগিতায় স্বাধীনতা সংগ্রামকে দুর্বল ও দ্বিখণ্ডিত করে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ সম্ভবত তখনই জোরদার করা হয়েছিল, যখন জুলাইয়ে কিসিজ্ঞারের চীন সফরের পর ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি সবিশেষ হ্রাস পায় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সহায়তা বৃদ্ধির সম্ভাবনা স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। এই অন্তর্ঘাতী প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হয় ভারত-সোভিয়েট মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরের পর।
এমনিভাবে নিক্সন প্রশাসন ইয়াহিয়া-জান্তার পক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠার পর এবং বিশেষ করে, চৌ-কিসিঞ্জার আলোচনাকালে পাকিস্তানকে সমর্থন করার ব্যাপারে উভয় পক্ষের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, দখলকৃত এলাকার উপর পাকিস্তান নগ্ন ঔপনিবেশিক শাসন পাকাপোক্ত করার আয়োজন শুরু হয়। ইয়াহিয়া নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রস্তাবিত নতুন শাসনতন্ত্রে বাংলা ভাষার জন্য আরবী হরফ ব্যবহার করার, পূর্ব পাকিস্তানকে দুই থেকে চারটি নতুন প্রদেশে বিভক্ত করে পাঞ্জাবকে। পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশের মর্যাদা দেবার এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার সুপারিশ করে। এ অঞ্চলের ওপর সাংস্কৃতিক দখলকে চূড়ান্ত করার জন্য প্রশাসনিক পর্যায়ে ইসলামী নীতির উপর ভিত্তি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের সিলেবাস প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ইতিহাস বিজড়িত ঢাকার অনেক পথ-ঘাটের নামের ‘ইসলামীকরণ’ সম্পন্ন হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত যথাক্রমে ৭৯ ও ১৯৪ জন আওয়ামী লীগ সদস্যদের নাম অন্যায়ভাবে বাতিল করে শুরু হয় গণধিকৃত দলগুলির সংখ্যাগরিষ্ঠতা সৃষ্টির উদ্যোগ। পূর্বাঞ্চলের এই নগ্ন ঔপনিবেশিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় জামাতে ইসলাম, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য সামপ্রদায়িক দলগুলির কর্মীদের সমবায়ে গঠিত ‘রাজাকার বাহিনী’ সন্ত্রাস ও নিপীড়নের মূলযন্ত্রে পরিণত হয়। জুলাইয়ে সশস্ত্র রাজাকারের সংখ্যা দাঁড়ায় বাইশ হাজার দেশে ফেরৎ মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা যখন চার হাজারের মত।
