কিন্তু ব্যাপক সংখ্যায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসজ্জিতকরণ যে সব রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি সমাবেশের ফলে সম্ভব হয়েছিল, পুনরায় সে আলোচনায় ফিরে যাওয়া যায়।
অধ্যায় ০৯: জুলাই – আগষ্ট
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কিসিঞ্জারের ভারত সফর এবং দ্বিতীয় সপ্তাহে ইসলামাবাদ হয়ে তার গোপন চীন পরিক্রমার সংবাদ ১৫/১৬ই জুলাই প্রচারিত হওয়ার অব্যবহিত পর এই সব ঘটনার সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার পরিমাপ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ-আলোচনার উদ্দেশ্যে তাজউদ্দিন আমাকে দিল্লী যেতে বলেন। ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে দিল্লীর আবহাওয়া বহুলাংশে পরিবর্তিত। কিসিঞ্জারের গোপন পিকিং সফর এবং ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর-সংক্রান্ত ঘোষণার পর উপমহাদেশের উপর তার সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে, দক্ষিণ ও বাম নির্বিশেষে দিল্লীর ক্ষমতার অলিন্দ তখন ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, চিন্তিত, সন্দিহান অথবা উত্তেজিত। এক অপ্রত্যাশিত ভালো সংবাদ পাওয়া গেল ১৯শে জুলাই সন্ধ্যায়। পি. এন. হাকসার আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনার সূত্র ধরে যথাশীঘ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন এবং এই প্রসঙ্গে জানান, সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে শীঘ্রই তাদের এক বড় রকমের সমঝোতা’ আশা করা যায়।
পরদিন ২০শে জুলাই কোলকাতা ফিরে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে সংবাদটি দেওয়ার পর এ বিষয়ে আলোচনাকালে আমরা উভয়েই পরিস্থিতির এক গুণগত উন্নতির সম্ভাবনা সম্পর্কে একমত হই। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধকে সাহায্য করার ব্যাপারে ভারতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যকে ভারতের অনুকূলে আনা এবং তদুদ্দেশ্যে ভারত-সোভিয়েট সমঝোতা প্রতিষ্ঠাই ছিল পূর্ববর্তী দুই মাসে আমাদের গোপন দেন-দরবারের মূল লক্ষ্য। অব্যাহত শরণার্থী স্রোত, উদ্ভত সঙ্কটের রাজনৈতিক মীমাংসার প্রশ্নে পাকিস্তানী অনমনীয়তা, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কিসিঞ্জারের চীন সফর এবং সম্ভাব্য চীনা আক্রমণের বিরুদ্ধে ভারতের সীমান্ত রক্ষায় পূর্বতন মার্কিন প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার হওয়ার ফলে আমাদের সেই প্রচেষ্টা অসামান্যভাবে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়।
প্রত্যাসন্ন ভারত-সোভিয়েট সমঝোতার বিষয়বস্তু ও পরিধি এবং বিশেষত এর ফলে পাক-চীন আক্রমণ আশঙ্কার বিরুদ্ধে ভারতের নিরাপত্তাবোধই কেবল উন্নত হবে, না বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে জয়যুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক অর্থে তা ব্যবহার করা সম্ভব হবে মর্মে নির্দিষ্ট তথ্যাদি তখনও অজানা। তবু ২০শে জুলাইয়ের বৈঠকে আমরা উভয়ে একমত হই যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের জন্য তখন থেকেই সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা যেতে পারে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত শিলিগুড়ি সম্মেলনে মন্ত্রিসভার অনুসৃত নীতি সম্পর্কে গণপ্রতিনিধিদের সর্বসম্মত আস্থা অর্জনের দরুন তাজউদ্দিন স্বাভাবতই মনে করেন, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার কোন বাধা নেই। তবে প্রত্যাশিত ভারত-সোভিয়েট চুক্তি সরকারীভাবে জ্ঞাত হওয়ার পরেই এ বিষয়ে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাভের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়া সম্ভব। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিসভার প্রত্যেক সদস্যের মনোভাব আলাদা আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে দু’জনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি কমবেশী উদ্বেগ প্রকাশ করেন-কম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সম্পর্কে এবং বেশী পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদ সম্পর্কে।
সাধারণভাবেই এরূপ মোর্চা গঠনের প্রস্তাব আওয়ামী লীগের অনেকের কাছে তখনও যথেষ্ট অপ্রিয়। তদুপরি সৈয়দ নজরুলের আত্মজ মুজিব বাহিনী’র একজন উৎসাহী সদস্য হওয়ায় এবং বামপন্থী দলসমূহ ও তাজউদ্দিন সম্পর্কে ‘মুজিব বাহিনী’র বিরুদ্ধতা অতিশয় সুস্পষ্ট থাকায়, ঐক্যফ্রন্ট গঠন বিষয়ে?সৈয়দ নজরুলের আপত্তি নিতান্ত কম ছিল না। অন্যদিকে খোন্দকার মোশতাকের সম্ভাব্য আপত্তি অপেক্ষাকৃত প্রবল বলে অনুমান করা হয় এ কারণেই যে, আওয়ামী লীগের মধ্যে দক্ষিণপন্থী হিসাবে তাঁর ভূমিকা বরাবরই সুস্পষ্ট। তৎসত্ত্বেও ক্ষীণ একটি আশার আলো আমরা দেখতে পাই। তাজউদ্দিনের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাজনৈতিক চরিত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হিসাবে, এবং বিশেষত প্রধানমন্ত্রিত্বের পদকে কেন্দ্র করে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে বৈরিতাবোধ খোন্দকার মোশতাকের প্রবাসের জীবনকে বহুলাংশে কর্মভারাক্রান্ত করে রাখত। সে কারণে এবং অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সকল প্রয়োজনীয় সোপান অতিক্রম করার বাস্তব বুদ্ধি তাঁর সহজাত ছিল বলে ভারত সরকারের আস্থা উদ্রেকের স্বার্থে বামপন্থীদের সাথে মোর্চা গঠনের মত অশাস্ত্রীয় কাজও তিনি সমর্থন করে ফেলতে পারেন বলে আমাদের মনে হয়। বস্তুত খোন্দকার মোশতাকের এই বাস্তবতাবোধের নির্ভুল সদ্ব্যবহারের উপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গঠন ছিল নাজুকভাবে নির্ভরশীল। তাকে যদি ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্তে শামিল করা যায়, তবে ফ্রন্ট গঠন দূরের কথা, মুজিব বাহিনী’, আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মীদের দলীয়মন্যতা এবং বিভিন্ন উপদলীয় স্বার্থের মিলিত আবর্তে খোদ আওয়ামী লীগের জন্যই এক বিরাট সাংগঠনিক সঙ্কটের সৃষ্টি অসম্ভব ছিল না। এই যুক্তিতে এবং তাদের উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তাজউদ্দিন আমার ওপর এই অস্বস্তিকর দায়িত্ব চাপিয়ে দেন, বস্তুত আমার সম্মতির অপেক্ষা না-করেই।
