লোকবল ছাড়াও এই পাঁচটির সব কটি ব্যাটালিয়ানেই অফিসারের স্বল্পতা ছিল প্রকট সমস্যা। একটি ব্যাটালিয়ান পরিচালনার জন্য যেখানে ১৫/১৬ জন অফিসার প্রয়োজন সেখানে বাস্তবক্ষেত্রে অফিসার ছিলেন অর্ধেকেরও কম। এই অফিসার-ঘাটতি পূরণের জন্য জুলাই মাস থেকে তিন মাস দীর্ঘ এক সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন ৬০ জন অফিসার তৈরী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে অবস্থার উন্নতি ঘটে সামান্যই। কেননা ‘তুরা ব্রিগেড’ গঠনের পর পরই ত্রিপুরার অপর দুই সেক্টর থেকে ‘জেড ফোর্সের অনুরূপ দুটি ব্রিগেড তথা ‘কে ফোর্স’ এবং ‘এস-ফোর্স’ গঠনের জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়। ঊর্ধ্বতন কমান্ড এই দাবী অনুযায়ী তিনটি নতুন ব্যাটালিয়ান গঠন এবং তিনটি আর্টিলারী ব্যাটারী গঠনের আবশ্যকতা জোরেশোরেই ব্যক্ত করেন। এই সব দাবীর প্রেক্ষিতে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকার এই সব নতুন সংযোজনের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসজ্জিতকরণে সহায়তা লাভের জন্য পুনরায় ভারত সরকারের দ্বারস্থ হন।
সাধারণ অবস্থার একটি নতুন ব্যাটালিয়ানের রিক্রুটিং-এ প্রায় ছ’মাসের মত সময় লাগে এবং ট্রেনিং-এ সময় লাগে আরও প্রায় এক বছর। সেখানে মাত্র দু’মাসের মধ্যে নতুন তিনটি ব্যাটালিয়ান রিক্রুট ও যুদ্ধোপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা অত্যন্ত অবাস্তব ছিল। ফলে নভেম্বরের মাঝামাঝি যখন এই তিন ব্যাটালিয়ানকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করার কথা, তখন বাস্তবক্ষেত্রে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করতে দেখা যায়। খালেদ মোশাররফের উপর দায়িত্ব ছিল ১০-ইবি এবং ১১-ইবি গঠনের। ১৫ই নভেম্বর নাগাদ ১০-ইবির জন্য প্রায় ৭০০ এবং ১১-ইবির জন্য ৭০০ জনের কিছু বেশী সৈন্য হাজির করা হয়। ৯-ইবি গঠনের দায়িত্ব ছিল সফিউল্লাহর উপর কিন্তু ১৫ই নভেম্বরে পাওয়া গেল সম্ভবত ৩০০ জনের মত সৈন্য। সিলেট জেলা থেকে বাকীদের সংগ্রহ করে আনার প্রতিশ্রুতি ওসমানী স্বয়ং দিয়েছিলেন। সিলেটের শত্রু অধিকৃত এলাকা থেকে বাকীদের হাজির করা হলো ২০শে নভেম্বরের দিকে, কিন্তু দেখা গেল তাদের বেশীরভাগই প্রায় আনাড়ি। এই তিনটি ব্যাটালিয়ান গঠন করার ফলে মুক্তিযুদ্ধ সবিশেষ সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছে এমন দাবী করার উপায় নেই। বরং একের পর এক এই সব অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অধিকাংশ সেক্টর অধিনায়কেরই যতটুকু বা লড়াইয়ের ক্ষমতা ছিল, তা নিঃশেষিত হতে থাকে।
দেশকে শত্রুমুক্ত করার কোন সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে নয়, অথবা কোন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আক্রমণ ধারাকে উন্নত করে মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয়, বরং প্রতীয়মান হয় প্রধানত নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির তাগিদেই নিয়মিত বাহিনীর আয়তন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে। তুরায় প্রথম ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত কতখানি যুক্তিসংগত ছিল তা পর্যালোচনা করলে অবস্থাটা আরও কিছু পরিষ্কার হয়। জুলাই মাসে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এই ব্রিগেড গঠনের পিছনে তিন ধরনের চিন্তা পাশাপাশি বিরাজমান ছিল। ওসমানীর পরিকল্পনা ছিল এই ব্রিগেডের সাহায্যে সীমান্তের নিকটবর্তী কোন বড় এলাকা শত্রুমুক্ত করে বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি নিরাপদ অবস্থান অঞ্চল’ (lodgement area) গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে আংশিক বা পুরোপুরিভাবে শত্রুমুক্ত করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা যদি সত্যই পাওয়া যায়, তবে সে আক্রমণের পুরোভাগে বাংলাদেশের অন্যূন একটি নিয়মিত ব্রিগেড রাখা আবশ্যক বলে বাংলাদেশের নেতৃত্বের অনেকেই মনে করতেন। তৃতীয় চিন্তা ছিল, স্বাধীনতা-উত্তরকালের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে সম্প্রসারিত করার। প্রত্যেকটি চিন্তা অবশ্যই ছিল বিতর্কমূলক। প্রথমটি তো বটেই। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রধান সেনাপতি ওসমানী নিজেই তাঁর ‘Ops plan’-এ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান: “যে কাজের জন্য ব্রিগেড গঠন করা হয়েছিল, তা অর্জনের ক্ষেত্রে এ যাবত ব্রিগেডকে ব্যবহার করা যায়নি এবং অদূর ভবিষ্যতেও করা যাবে বলে মনে হয় না।” পরিবর্তিত পরিকল্পনায় ওসমানী তাই স্থির করেন: “বর্তমানে যেহেতু ব্রিগেড ও ব্যাটালিয়ানের উপযোগিতা অতি নগণ্য, সেহেতু নিয়মিত বাহিনীকে বরং কোম্পানী/প্লেটুন গ্রুপে বিভক্ত করে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা তৎপরতার জন্য নিয়োগ করা উচিত।” অথচ এর মাত্র দু’সপ্তাহ আগে আরো দুটি বিগ্রেড গঠনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন তিনটি ব্যাটালিয়ান গঠন ও প্রস্তুত করার কাজ তার জোরাল সমর্থনের ফলেই শুরু হয়ে গেছে। কাজেই এ কথা বলার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সম্প্রসারণ মুক্তিযুদ্ধের কোন সুচিন্তিত রণনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে সম্পন্ন হয়েছিল। যে কারণেই এই সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে থাকুক, তাকে কার্যকর করতে গিয়ে অন্তত কয়েকটি অঞ্চলের সেক্টর অধিনায়কদের লড়াইয়ের ক্ষমতা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পায়।
কেবল ভরসা ছিল এই যে, আলোচ্য সময়ে দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সশস্ত্র ছাত্র ও তরুণদের বিকাশ ঘটতে থাকে আশাব্যঞ্জকভাবে। গোপন আক্রমণের নিত্য নতুন কৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশ পাকিস্তানী সেনাদের গর্বিত মনোবল ও শৌর্যের দম্ভকে ক্রমাগত আঘাত করে যেতে থাকে। পাকিস্তানের সমরোন্মত্ত সৈনিকেরা সীমান্তে ও অভ্যন্তরে ক্রমশ শ্রান্ত ও হতোদ্যম হয়ে উঠতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের অদৃশ্য আঘাতে আঘাতে।
