ভোরেই ব্রিগেডিয়ার সাহেব চলে গেছেন কর্ণেলকে বগলদাবা করে। তার প্রেমলীলার সংবাদ পেয়েই ব্রিগেডিয়ার পরিদর্শনে এসেছিলেন। শ্রমের মূল্য উশুল করেই গেলেন। এরপর থেকে শুরু হলো পালা করে অন্যদের অত্যাচার। কর্নেলের ভয়ে যারা আমাকে রাণীর মর্যাদা দিয়েছিল তারা দু’বেলা দু’পায়ে মাড়াতে লাগলো। আমার শরীরে আর সহ্য হচ্ছিল না। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি কুমিল্লা মিলিটারী হাসপাতালে গেলাম। তখন প্রায় বেশির ভাগই মেল নার্স। শুধু রুগিনীদের জন্য কয়েকজন মহিলাকে রাখা হয়েছে বা থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। আমাকে দেখে তারা কষ্ট পেলেন কিন্তু সহানুভূতি দেখাতে সাহস পেলেন না। অথচ তাদের কথাবার্তায় বোঝা যেতো তারা এদের সর্বনাশ প্রতিমুহূর্তে কামনা করছেন। কিন্তু আমার মতো তাদেরও হাত পা বাধা। যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছে।
তবে বাঙালি মহিলাদের দেখলাম এমন কি ডাক্তারও। নাম জানবার চেষ্টা করি নি, পাছে নিজের নাম প্রচার হয়ে যায়। তবে ডাক্তার ও নার্স সহানুভূতি সম্পন্ন হয়ে আমাকে বেশ কিছুদিন রাখলেন। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আমাকে ঢাকার কাছাকাছি কোনও একটি ক্যাম্পে নিয়ে এলো। বেঁচে গেলাম যে পুরোনো জায়গায় ফেরত পাঠালো না। কিন্তু যেখানে এলাম সেখানে প্রায় কুড়িজন মেয়ে এক সঙ্গে থাকে। এই বোধহয় সত্যিকার অর্থে দোযখ। হঠাৎ একটি মেয়ে মৃদুকণ্ঠে উচ্চারণ করলো, রীনা আপা, ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকালাম আমি। কৃশ মলিন মুখ, বড় বড় চোখের মেয়েটিকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বেরুলো বাঁশি। মেয়েটি ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ওর বাবা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মালী। বাঁশি প্রায়ই আমাদের ফুল দিতো। আমার বুকের ভেতর মুখ রেখে সে কি কান্না। ছ’মাস পর এই প্রথম আমার চোখেও জল এলো। ওকে রাস্তা থেকে জিপে টেনে তুলে এনেছে। ওদের বাড়ির কেউ জানে না। ভেবেছে বোধহয় মরে গেছে। মরে কেন গেলাম না আপা? চাইলেই কি আর মরা যায় পাগলী। আমিই কি মরতে পেরেছি? অন্যেরা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। বাঁশি বললো এখানে কথা বলাও মানা। জমাদারণীও খুব বজ্জাত, যখন তখন গায়ে হাত তোলে। শত অত্যাচারের ভেতরও একটা পৃথক ঘরে থাকতে পেরেছিলাম কিন্তু এ কোন জায়গায় এলাম।
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চারিদিক থেকে কেবল গোলাগুলির আওয়াজ শুনি। বাঁশি ফিস ফিস করে বলে, আপা, কম জোরেরগুলো মুক্তিবাহিনীর বুঝলেন? অবাক হয়ে বললাম মুক্তিবাহিনী? হ্যাঁ, আপা, এখন খুব লাগছে। কোনদিন যেন আমাদের এইখানে থেকে নিয়ে যায়। কিন্তু আমার আরও ঘৃণ্য দৃশ্য দেখার বাকি ছিল। দু’দিন পর দেখলাম ওই ঘরেরই একপাশে চার-পাঁচজন উন্মত্ত পশু একটা মেয়েকে টেনে নিয়ে সবার সামনেই ধর্ষণ করলো। ভয়ে কয়েকজন মুখ লুকিয়ে রইলো, কেউবা হাসছে। মনে হলো এদের বোধশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। যুদ্ধের ন’মাসে আমি যতো অত্যাচার দেখেছি এবং সয়েছি এটিই সর্বাধিক বর্বরোচিত ও ন্যাক্কারজনক। পশুত্বের এমন তাণ্ডবলীলা আমি আর দেখি নি।
এখন চারিদিকে কেমন একটা ব্যস্ততার ও সন্ত্রস্ত ভাব। কারণ বুঝি না। এ দিক। থেকে গোলাগুলির শব্দ যেন কমে এসেছে। তারপর একদিন হঠাৎ আমাদের সবাইকে ট্রাকে করে নিয়ে চললো ঢাকা। জিজ্ঞেস করলো, কেউ ছুটি পেতে চায় কিনা। কেউ রাজি না। এতোদিনে এরা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে জেনে গেছে সবকিছু। বাঁশি বললো, জানো আপা ফালানী নামে একটা মেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। মুক্তিরা ওকে চোর মনে করে গুলি করে মেরে ফেলেছে। কি সাংঘাতিক। বশির অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে অনেক বেশি। সবাই মিলে ট্রাকে উঠলাম। বুঝলাম কুর্মিটোলায় এলাম। বড় ভাইয়ের সঙ্গে কতো এসেছি। আজ তার নাম উচ্চারণ করলে আমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। অফিসারদের কেমন মুখ শুকনো আর জওয়ানরা রীতিমতো ভীত। প্রতিদিন বাইরে থেকে লোক এসে এখানে ভীড় জমাচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ ভোর রাতে প্রচণ্ড এয়ারক্রাফট-এর শব্দ। কি ব্যাপার একটু পরেই দ্রুম দ্রাম কোথায় যেন বোমা পড়ছে! সমস্ত শরীর কাঁপছে, সবাই কম্বল জড়িয়ে পরস্পরের গা ঘেঁষে বসে আছি। কিছুক্ষণ পর এ্যান্টি এয়ার ক্রাফট-এর দ্রিম ভ্রাম শব্দ থামলো। অল ক্লিয়ার সাইরেন বাজালো। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন শুরু হলো আমাদের জল্পনা কল্পনা। এরা তো পালাবে কিন্তু আমাদের মেরে ফেলবে নিশ্চয়ই, না তা করবে না। আমাদের লাশ দেখলে মুক্তিবাহিনী কি ওদের ছেড়ে দেবে। আমাদের আহার নিদ্রা ঘুচে গেল। তাহলে কি সত্যিই মুক্তি আসন্ন। আবার বাইরে বেরুবো, বাড়ি যাবো কিন্তু কোথায় বাড়ি, কোথায় কবর হয়েছিল বাবা, মা ও আলীর। বড় ভাই কি বেঁচে আছে? থাকলে নিশ্চয়ই আমার খোঁজ করবে। আর এই অবস্থা দেখলে পাগল হয়ে যাবে সে। রীনা যে তার কলিজার টুকরা ছিল। ছোটভাই বা কোথায়? বেঁচে আছে কিনা তাই-বা কে জানে। মুক্তির সময় যতো কাছে আসতে লাগলো আমাদের উত্তেজনা ও উদ্বেগও ততো বাড়তে লাগলো। আল্লাহ ওই শুভদিন আর কতোদূরে।
পরপর কদিন বোমা পড়লো। প্রথম প্রথম পাকিস্তানি বিমান উড়লো, তারপর সব চুপচাপ। মনে হলো এদের আর বিমান নেই। যুদ্ধ শেষ। শুনলাম লে. জেনারেল অরোরা আত্মসমর্পণের জন্য জেনারেল নিয়াজী ও রাও ফরমান আলীকে নির্দেশ দিচ্ছে। রেডিও থেকে একই কথা ভেসে আসছে। দূরে কামানের শব্দ। ১৬ই ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলো ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ নেতৃত্বের কাছে আমাদের বলা হলো নিজ দায়িত্বে বাড়ি চলে যেতে পারো। বেশ কয়েকজন মেয়ে ওই লুঙ্গি পরা অবস্থাতেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু আমরা প্রায় জনা ত্রিশেক রয়ে গেলাম সেনানিবাসে। কোথায় যাবো? দেখি বড়ভাই থাকলে আমার খোঁজ নিশ্চয়ই করবে। আর যদি না থাকে তাহলে ঘরে ফিরে আমার লাভ কি! বাবা নেই, মা নেই, ভাইয়া নেই, এ মুখ নিয়ে আমি যাবো কোথায়? আত্মসমর্পণের পরও অস্ত্রত্যাগ করতে সময় লাগলো। কারণ ভারতীয় বাহিনী তখনও এসে পৌঁছায়নি। সামান্য হাজার পাঁচেক সৈন্য কয়েকজন অফিসার টাঙ্গাইলের দিক থেকে এসেছেন। মূলধারা এখনও নরসিংদীতে নদীর ওপারে।
