রাতে আবার ডাক এলো, বুঝলাম এটা অফিসারস মেস। একই টেবিলে আমাকে খেতে দিল দেখে অবাক হলাম। ধীরে ধীরে কথাবার্তা শুরু হলো। প্রকৃতপক্ষে জীবন কাটিয়েছি আব্বার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে, তাই উর্দু আর ইংরেজি দুটোই আমার আয়ত্বে ছিল। আব্বার পরিচয় নিলো, কিন্তু তাদের বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত বলে মনে হলো না। বড়ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলো। সম্ভবত ছোটর সংবাদ এরা জানে না। জানতে চাইলো, ইউনিভার্সিটির কোন শিক্ষক কোন দল করে, কোন হলে কোন দলের ছাত্র থাকে ইত্যাদি। কি উত্তর দিয়েছিলাম তা আর আজ এতোদিন পর মনে পড়ে না। তবে সবই যে উল্টা পাল্টা বলেছিলাম এটুকু মনে আছে। কাঁধের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম এদের দলপতি একজন লেঃ কর্ণেল, বয়স ৪৫ বছরের মতো হবে। সুঠাম দেহ তবে উচ্চারণ শুনে বুঝলাম পাঞ্জাবী। আরেকবার বুকটা কেঁপে উঠলো কারণ এই শ্রেণীকে আব্বা একেবারেই দেখতে পারতেন না। বলতেন অশিক্ষিত, বর্বর, গোঁয়ার। যাই হোক খাবার নিয়ে নাড়াচাড়াই করতে লাগলাম। কি ভাবছিলাম তাও আজ মনে করতে পারি না। কর্ণেল সাহেব আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ভয় পেয়ো না, এখানে আমি তোমার দেখৃ ভালো করবো। তবে পালাবার চেষ্টা করলে জানে মেরে ফেলা হবে এটা মনে রেখো। দরজা কখনও বন্ধ করবে না। জমাদারণী রাতে তোমার ঘরে শোবে।
আমি কোনো কথারই জবাব দিলাম না বা দিতে পারলাম না। জমাদারণীর সঙ্গে। ঘরে ফিরে এলাম। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। আজ আমার বলতে লজ্জা নেই সেদিন আমি মরার মতো ঘুমিয়েছিলাম। একবারও ভাবতে চেষ্টা করি নি বাবা নেই, মা নেই, আমি নিজে অনন্ত দোজখের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। কেন এমন হয়েছিল? মনে হয় আমার বোধশক্তি লোপ পেয়েছিল। আর না হয় সেদিন থেকে নিজেকে নতুন করে ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। গায়ে রোদ লাগায় উঠে বসলাম। জমাদারণী একেবারে অনুগত আয়ার মতো নতুন পেস্ট ব্রাশ এগিয়ে দিলো। হাসলাম, এ ধরনের কাজ করবার অভ্যাস তার আছে। মুখ ধুয়ে আসতেই ধুমায়িত চা এলো। বললো, সায়েরা ব্রেকফাস্টে ডাকছে। বললাম, আমার ব্রেকফাস্ট এখানেই নিয়ে এসো। উত্তরে হাসিমুখে সখি বলে, যেমন আপনার মর্জি। কর্ণেল সাহেবের নেকনজরে আছেন আপনি, রানীর আরামে থাকবেন। ভাবলাম পরিণাম যখন এক, তখন রাণীই-বা কি আর জমাদারণীই-বা কি! তবুও সুযোগের সদ্ব্যবহার করি। কলম পেন্সিল খুঁজলাম। এক টুকরা কাগজ ঘরে নেই। সব প্রকার সতর্কতাই গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া আমিই তো একমাত্র রাজকীয় মেহমান নই। এর আগেও কতো এসেছে কতো গেছে। আল্লাহ্ এই ছিল আমার কপালে! জীবন নিয়ে কতো রঙিন স্বপ্ন দেখেছিলাম ক’মাস পরে আমেরিকা ষাৰাে স্বামীর ঘরে। কতো বড় বড় দেশ দেখবো, জীবন উপভোগ করবো, সন্তানের মা হবো। হাসলাম নিজের মনে, এ যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। এরা যতো শক্তিমানই হোক জয়ী আমরা হবোই। তখন আমি কোথায় থাকবো? তার অনেক আগেই তো আমি ব্যাধিগ্রস্ত শরীর নিয়ে শেষ হয়ে যাবো। এমন কতো যুদ্ধবন্দির কাহিনী পড়েছি, সিনেমা দেখেছি, কিন্তু এমন রানীর আদর, আরাম আয়েস পেয়েছে ক’জন। সেদিক থেকে আমি ভাগ্যবতী।
আমার একমাত্র ঘনিষ্ঠ বান্ধবী জমাদারণী জয়গুণ। তাকে বললাম, কর্ণেল সাহেব বদলি হয়ে গেলে আমার কি হবে? যে সাহেব আসবে তুমি তার রাণী হয়ে থাকবে। কেন? আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেনা? ওরে বাপ! সাহেবের বেগমসাহেবাকে আমি একবার দেখেছি। সে মারাত্মক। টের পেলে তুমি, তত তুমি, সাহেবকে গলা টিপে মারবে। বললাম, বেগমসাহেব থাকে কোথায়? জয়গুণ বললো কখনও ঢাকায়, কখনও তার বাপের কাছে ইসলামাবাদে। নিজের অজ্ঞাতে দু’হাত গলায় উঠে থামলো, মনে হলো যেন বেগমসাহেবার চাপে ব্যথা পাচ্ছি। একদিন সন্ধ্যায় কর্ণেল আমাকে নিয়ে খোলা জিপে বেড়াতে বেরুলেন। মনে হচ্ছিল পাশে আতাউর, আমি আমেরিকার কোনও শহরে। খুব ভালো লাগছিল, গুন গুন করে গান গাইছিলাম হয়তো। গাড়ি একটা ছোট দোকানের সামনে থামলো, ছোট ছোট কটা ছেলে যাদের আমরা ঢাকায় টোকাই বলতাম দাঁড়ানো ছিল, হয়তো-বা খেলছিল, মিলিটারী দেখে থেমে গেছে।
গলা বাড়িয়ে বললাম, কি করছো? ছোট ছেলেটা বললো, বাঙালি, কথা কইস না, হালায় বেবুশ্যে মাগী। কর্ণেল তখন বিস্তৃত দন্তপাটি মেলে হাসছে। ছেলেগুলো দৌড় দিলো কিন্তু আমার সর্বদেহে মনে যে কালি ছিটিয়ে গেল তার থেকে আমি আজিও মুক্ত হতে পারি নি। লেডি ম্যাকবেথের মতো আরবের সমস্ত সুগন্ধি ঢেলেও তো আজ তার অন্তর সৌরভ মণ্ডিত হলো না। সেই ক্ষুদ্র শিশুর চোখে মুখে প্রতিফলিত ঘৃণা আমার রানীত্বকে মুহূর্তে পদদলিত করেছিল। কিছুক্ষণ পর কর্ণেল সাহেব বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে। ছেলেগুলো কিছু একটা বলে দৌড়ে পালিয়েছে। তাদের গমন পথের দিকে তিনি জিপ ঘোরালেন। আমি তার হাত চেপে ধরে গাড়ির মুখ ফিরিয়ে নিলাম। আতাউরকে নিয়ে মুক্তি পাবো এটা ছাড়া আর কোনো স্বপ্ন দেখি নি। ওই শিশুটি আমাকে বলে গেল, সেটা স্বপ্নই-আমার জীবনে তা অলীক। কারণ ওই স্বপ্ন দেখার অধিকার আমি হারিয়ে ফেলেছি।
ওটা কতো তারিখ কোন মাস মনে নেই। সম্ভবত জুনমাস হবে। দিনটা সত্যিই আমার জন্য অশুভ ছিল। শিষ দিতে দিতে কর্ণেল সাহেব গাড়ি থেকে নামতেই তাঁর মাথায় বজ্রাঘাত হলো। জিএইচকিউ এর গাড়ি দাঁড়িয়ে। অতএব হোমড়া চোমড়া কেউ এসেছেন। আমাকে ইশারায় পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে যাবার নির্দেশ দিলেন। সেই আমার প্রেমিক কর্নেলের সঙ্গে শেষ দেখা এবং প্রেমলীলাও শেষ। হেড কোয়ার্টার থেকে ব্রিগেডিয়ার খান এসেছে। জমাদারণীর সংবাদ। তারপর আমার এ সযত্নে লালিত দেহটাকে নিয়ে সেই উন্মত্ত পশুর তাণ্ডবলীলা ভাবলে এখনও আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমাকে কামড়ে খামচে বন্যপশুর মতো শেষ করেছিল। মনে হয় আমি জ্ঞান হারাবার পর সে আমাকে ছেড়ে গেছে। লোকটাকে এক ঝলক হয়তো ঘরে ঢুকতে দেখেছিলাম তারপর সব অন্ধকার। সকালে মুখ ধুতে গিয়ে দেখলাম আমার সমস্ত শরীরে দাঁতের কামড় ও নখের আঁচড়। কামগ্রস্ত মানুষ যে সত্যিই পশু হয়ে যায় তা আমার জানা ছিল না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললাম। হঠাৎ মনে হলো এই টোকাইয়ের কথা বেবুশ্যে মাগী। হ্যাঁ সত্যিই আমি তা, আমার মুখে চোখে সর্বাঙ্গে তার ছাপ। হ্যাঁ শুরু হলো আমার পূর্ণ পতন। এখন সত্যিই আমি এক বীরাঙ্গনা।
