ব্যাস, আর সন্দেহ নেই। মহাপ্রলয় এসে গেল। চারদিকে ভীষণ চিৎকার। মেয়েরাই চিৎকার করছে বেশি। যে যেদিকে পারে ছুটতে শুরু করলো এবার প্রাণভয়ে।
আবার বোমা পড়লো, আবার পড়লো। সেই সাথে তিন তিনটা রাইফেল সমানে চলছে। প্রচণ্ড শব্দ, আহতদের আর্তনাদ। সবাই প্রাণপণে ছোটে।
দুমিনিটের মধ্যেই আহত আর মৃতদেহ ছাড়া জনপ্রাণীর চিহ্ন রইলো না সেখানে। দুএকজন আহত জংলী হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে বাঁচবার চেষ্টা করছে।
বাঁধন খোলা হয়ে গেছে। শহীদের বাবা কুফুয়ার চার ছেলেকে নিয়ে এগিয়ে আসছে শহীদদের দিকে। কিন্তু এখন পালাবার উপায় কি? কুয়াশা ছুটে গিয়ে নদীর ধারটা দেখে এলো। একটা নৌকাও নেই।
ইসলাম খাঁ বললো, এখানকার সব নৌকা আরও উত্তরে হ্রদের কাছে থাকে, এখানে তো একটাও পাওয়া যাবে না।
সর্বনাশ! শহীদের মাথায় যেন বাজ পড়লো। নৌকার আশায়ই সে এতো কিছু করছে। এখন উপায়? পালাবে কোন পথে? আবার এতো ঘুরে পাহাড়ের কাছ দিয়ে? অসম্ভব! ঠিক ধরা পড়ে যাবে জংলীদের হাতে।
আর হাতবোমা নেই? কুয়াশা জিজ্ঞেস করলো।
আর মাত্র একটা আছে। রাইফেলের গুলিও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। শহীদ বলে।
দাও তো আমার কাছে ওটা।
বোমা নিয়ে কুয়াশা এগিয়ে গেল গাছের সারির কাছে। তারপর ছুঁড়ে মারলো একটা গাছের গোড়া লক্ষ্য করে। প্রচণ্ড আওয়াজে ফাটলো বোমা। ধুয়া সরে গেলে শহীদরা কাছে গিয়ে টর্চ জ্বালিয়ে দেখলো দুটো গাছের গোড়ার দিকটা অনেকখানি গর্ত হয়ে কেটে গেছে। কিন্তু কিছুটা এখনও লেগে রয়েছে। গাছ দুটো ওদের দিকে একটু হেলে দাঁড়িয়ে আছে।
এবার উপায়? একমাত্র সম্বল শেষ বোমাটাও গেল। কামাল বলে।
গাছ প্রায় কেটে গেছে। এখন গোটা কতক রাইফেলের গুলি লাগলেই পড়ে যাবে।
শহীদ, কুয়াশা আর গফুর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে গুলি ছোঁড়া শুরু করলো। গোটা পঁচিশেক গুলি লাগতেই মড়মড় করে ভেঙে পড়লো একটা গাছ।
সবাই একে একে টপকে বেরিয়ে এলো জংলী এলাকা থেকে। ইসলাম খাঁ অত্যন্ত দুর্বল। শহীদ আর কুয়াশা তাঁকে হাত ধরে পার করে আনলো।
এবার যতো শিগগির সম্ভব লঞ্চে গিয়ে উঠতে হবে। শহীদ বলে। কিছুক্ষণ পরই যখন জংলীরা বুঝতে পারবে মহা-প্রলয়ে ওরা সবাই মরেনি, তখন আবার সাহস করে ফিরে আসবে এখানে। তখন আহতদের কাছ থেকে শুনবে আমাদের পালিয়ে যাওয়ার কথা।
ওদের বৃক্ষ-প্রাচীরও দেখবে ভাঙ্গা। তখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাড়া করবে আমাদের, এই তো! কামাল বললো।
হ্যা। তার আগেই আমাদের পালিয়ে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি চলো সবাই।
কিন্তু ইসলাম খাঁ অসুস্থ। তিনি হাঁটতে পারছেন না। শহীদ কুফুয়ার বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো, তোমাদের দুজন কি আমার বাবাকে কাঁধে করে নিতে পারবে? আমরা খুবই ক্লান্ত, নইলে আমরাই নিতাম!
ওরা সকলেই সাগ্রহে এগিয়ে এলো। বড় ভাইটা হঠাৎ শহীদের দুই হাত ধরে ফেললো। মিনতি করে বললো, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন, মি. শহীদ, আমরা। এখানে এসেছিলাম আপনাদের খুন করে সাত হাজার পাউণ্ডের চেকটা কেড়ে নিতে। আপনি নিশ্চয়ই আমাদের এখানে দেখে একথা বুঝতে পেরেছিলেন। তবু আপনি সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে আমাদের বাঁচিয়েছেন। আমরা এ ঋণ শোধ করতে পারবো না। আপনি জানেন না, নিগ্রোদের মধ্যে কেউ যদি কারও প্রাণ বাঁচায়, তবে সারাজীবন সে তার কেনা গোলাম হয়ে থাকে। নিগ্রো জাত কোনদিন কৃতঘ্নতা করে না। বলুন, আপনি ক্ষমা করেছেন, মি, শহীদ।
তোমাদের প্রাণ বাঁচানো আমার কর্তব্য ছিলো। তোমার বাবা আমাকে মস্ত বড় বিপদ থেকে কয়েকবার রক্ষা করেছেন। তাঁর কাছে আমি ঋণী ছিলাম।
তার কাছে, আমাদের কাছে নয়। তিনি আমাদের ত্যাজ্যপুত্র করেছেন।
তোমরা যদি এখন থেকে আমাদের সঙ্গে ভালো হয়ে চলো, কোনও রকম চালাকির চেষ্টা না করো, তো তোমার বাবাকে বলে আমি তাঁর মত বদলাবার চেষ্টা করবো। তিনি আমার কথা শুনবেন, আমার যতদূর বিশ্বাস। আর আমিও তোমাদের ক্ষমা করবো।
আপনি আর আমাদের অবিশ্বাস করবেন না, মি. শহীদ। আর কোনও অসদুদ্দেশ্য নেই আমাদের।
শহীদের বাবাকে ওরা দুজন পাঁজাকোলা করে তুলে নিলো, তারপর যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব চলা শুরু করলো। দুদিনের অনবরত পরিশ্রম আর মানসিক উৎকণ্ঠায় মহুয়ার শরীর অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেছে। সে শহীদের কাঁধে ভর করে চলেছে।
সব মিলিয়ে তাদের চলাটা বড় ধীরে হচ্ছে। অথচ অনেক দ্রুত চলা দরকার। নদীর ঘাট এখনও বহুদূর।
শহীদ কি একটা কথা বলতে কুয়াশাকে খুঁজলো। চারিদিক চেয়ে দেখলো সকলের অজান্তে কখন জানি কুয়াশা অদৃশ্য হয়েছে তাদের মধ্যে থেকে। শহীদ ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলো সাড়ে তিনটা বাজে।
১৪.
ভোর পাঁচটা। অন্ধকার দ্রুত পরিষ্কার হয়ে আসছে। জংলী এলাকা থেকে প্রচণ্ড গোলমাল শোনা যাচ্ছে। অথচ শহীদরা এখনও পৌঁছতে পারলো না লঞ্চে। আরও আধ মাইল পথ যেতে হবে। পথে অনেকবার থামতে হয়েছে তাদের। শহীদের বাবা ঝাঁকুনি সহ্য করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পরই বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। মহুয়াকে শহীদ আর গফুর তুলে নিয়েছে পাঁজাকোলা করে। এই পথটুকু চলতে হলে ও ঠিক মরে যেতে।
হঠাৎ ঢাক বেজে উঠলো প্রচণ্ড শব্দে। অনেক লোকের হৈ-হল্লাও শোনা গেল। এটা ওদের যুদ্ধ ঘোষণার ঢাক। ইসলাম খাঁ বললেন।
