কামালের প্রতি একটা সমবেদনায় ভরে ওঠে শহীদের মন। না বুঝে ওকে বড় কষ্ট দিয়েছে সে। এখন ওর মনটা কি করে খুশি করা যায় চিন্তা করতে লাগলো শহীদ।
কামালের পাশে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলো সে। চমকে একবার ফিরে তাকিয়ে আবার বাইরের দিকে চেয়ে বসে রইলো কামাল চুপচাপ। কেমন অস্বস্তি লাগে তার।
গফুর এলো কফি নিয়ে। দুকাপ শহীদ আর কামালের সামনে রেখে আর একটা মি. ব্লাইদকে দিয়ে এলো।
আমাদের দেশে কিন্তু এর হাজার ভাগের একভাগও কুমীর নেই দাদামণি, গফুর বলে।
কথা বলবার বিষয় পেয়ে শহীদ বেঁচে গেল। বললো, ঠিক বলেছিস। আগে যাও কিছু ছিলো, এখন আর নেই। বছর পনেরো কুড়ি আগেও বছরে কমপক্ষে হাজার কয়েক লোক কুমীরের পেটে যেতো। আজকাল একটা আধটা খবর কালে ভদ্রে আসে।
মহুয়া এসে বসলো। বললো, তুমি নিজের চোখে কখনও কুমীরের মানুষ ধরে নিয়ে যাওয়া দেখেছো?
হ্যাঁ। কতবার দেখেছি।
বলো না, কি ভাবে নিলো। আবদারের সুরে বলে মহুয়া। কামাল ঘুরে বসলো। গফুরও কি একটা কাজের ছুতোয় কাছাকাছিই রইলো।
একটা সিগারেট ধরিয়ে কয়েক টান দিয়ে শহীদ শুরু করলো, আমার তখন বছর পনেরো বয়স। ক্লাস নাইন কি টেনে পড়ি। ফরিদপুর থেকে নৌকোয় ফিরছি ঢাকায়। নানা-বাড়ি গিয়েছিলাম আম-কাঁঠালের বন্ধে। চর-টেপাখোলার পুব দিক দিয়ে আসছি আমরা মস্ত এক পানসিতে করে। সাঁকের কাছাকাছি। আকাশের মেঘগুলো লাল হয়ে গেছে। আমরা ঠিক করেছি সামনের রহমতপুর গ্রামে নৌকো বেঁধে রাতটা কাটিয়ে ভােরে আবার রওনা দেবো। কাছাকাছি আসতেই একটা আর্ত চিৎকার শুনলাম। তাড়াতাড়ি নৌকোর ছইয়ের ওপর উঠে দেখি একজন লোক একটা ছোটো কোষ নৌকোয় দাড়িয়ে লাফালাফি করছে, আর চিৎকার করে আমাদের ডাকছে। নৌকো একবার এদিক একবার ওদিক কাত হচ্ছে। মাঝিদের হুকুম দিলাম শিগগির করে ওর কাছে যেতে। ভাবলাম, ব্যাটা বোধহয় সাঁতারও জানে না, নৌকো চালানোও জানে না, নৌকোয় কিছু জল উঠেছে তাই ভয় পেয়ে চিৎকার করছে। এইটুকু বলে শহীদ নিশ্চিন্ত মনে সিগারেট খেতে লাগলো। সবাই ভাবছে, এই শুরু করলো বুঝি, কিন্তু চুপচাপ সিগারেট টানতে থাকলো ও। কামাল অধৈর্য হয়ে বলে, তারপর?
আসলে হয়েছিল কি, লোকটা নিশ্চিন্ত মনে নৌকা চালিয়ে যাচ্ছিলো। নৌকায় বেশ অনেকখানি জল উঠেছিল, কিন্তু রহমতপুর কাছেই, তাই আর ছেচে ফেলেনি। নৌকাটা জল থেকে অল্প একটুখানি ডেসে ছিলো।
হঠাৎ পাশেই জলের মধ্যে একটা কি যেন দেখতে পেলো সে। কি ওটা? খেয়াল করে দেখলো মস্ত একটা কুমীর কটমট করে তার দিকে চেয়ে আছে। লোকটা ভয় পেয়ে গেল ভীষণ। চেয়ে দেখলো দূরে আমাদের নৌকার পাল দেখা যায়, আশেপাশে কোথাও আর কেউ নেই। কুমীরটাও বোধকরি এই নির্জনতার সুযোগ নেবার চেষ্টা করলো। সে ওই ডুবুডুবু নৌকার একধার দিয়ে উঠে আসবার চেষ্টা করতে লাগলো। লোকটা গিয়ে নৌকার মধ্যখানে দাঁড়ালো। কুমীর উঠবার চেষ্টা করলেই সে উল্টোদিকে ভর দিয়ে কুমীরের দিকটা উচু করে ফেলে। কুমীর সেদিক ছেড়ে এদিকে আসে। আবার সে ওদিকে ভর দেয়। এমনি করে বহুক্ষণ যুঝেছে সে। কুমীরও ছাড়বার পাত্র নয়, সেও অনবরত চেষ্টা করেই চলেছে নৌকায় উঠবার। বোধকরি খুব বেশি ক্ষুধার্ত ছিলো কুমীরটা।
এদিকে ধীরে ধীরে নৌকায় জল উঠছে। আর বুঝি ভাসিয়ে রাখা যায় না। এবার সে পাগলের মতো চিৎকার করে আমাদের ডাকতে লাগলো।
আমরা যখন খুব কাছাকাছি পৌঁছলাম, আর হাত পনেরে গেলেই লোকটাকে তুলে নিতে পারবো, ঠিক এমনি সময় ডুবে গেল কোষাটা। মানুষটাও ডুবে গেল। কিছুক্ষণ পরে দূরে একবার লোকটার মাথা দেখা গেল। জলে খুব আলোড়ন হলো, তারপর আবার ডুবে গেল। আর উঠলো না। নৌকার মাঝিরা সব বলে উঠলো, ইয়া আল্লা, বদর বদর।
শহীদ থামলো। সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর কামাল বললো, কি হারামী জানোয়ার। তুই আবার এদেরই মারতে মানা করিস।
১০.
লিম্পোপো থেকে একটা খাল বের হয়ে বোঙ্কারা অঞ্চলে চলে গেছে। সেই খালের মুখের বেশ কিছু পশ্চিমে গিয়ে লঞ্চ নোঙর করা হলো। ঘাটের সাথে লঞ্চ লাগানো গেল না, জল খুব অল্প। লঞ্চ থেকে দুটো তক্তা নামিয়ে তার ওপর দিয়ে হেঁটে পাড়ে নামলো শহীদরা। মি. ব্লাইদ লঞ্চেই রইলো। এই বিকেল বেলা বনের মধ্যে যেতে মানা করলো মি. ব্লাইদ।
আমরা আশেপাশের জায়গাটা একটু দেখেই ফিরে আসবো। সন্ধ্যার আগে না ফিরলে মনে করবেন আমরা বনের মধ্যেই রাত কাটাবো।
এখানকার বন্য জন্তু জানোয়ার যেমন হিংস্র তেমনি চালাক। গাছের ওপরও রয়েছে মাম্বা নামে একরকম বিষধর সাপ। ক্যাম্প নিলেন না, খুব অসুবিধায় পড়বেন।
না, যথেষ্ট পরিমাণ দড়ি নিয়েছি, সাত ব্যাটারীর টর্চ আছে সাথে। খুব একটা অসুবিধা হবে না। কিন্তু একটা কথা মি. ব্লাইদ, খুব জরুরী অবস্থায় না পড়লে কখনও গুলি ছুড়বেন না, তাহলে আমরা এখানে এসেছি সেকথা ওদের জানতে দেরি হবে না। আপনাকে তো এই অভিযানের গুরুত্ব কতখানি তা বলেছি।
হাঁ, আমি বুঝতে পেরেছি।
শহীদ মহুয়াকে লঞ্চে রয়ে যেতে বললো, কিন্তু সে কিছুতেই থাকবে না, সেও ওদের সঙ্গে যাবে। অনেক তর্কাতর্কি করে শেষ পর্যন্ত শহীদ, কামাল, মহুয়া আর গফুর বনের মধ্যে ঢুকলো।
কিছুদূর গিয়েই একটা সরু পথ পেলো তারা। একে বেঁকে চলেছে পথটা। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর একটু একটু আঁধার লাগলো তাদের। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে শহীদ দেখলো ওপরে উজ্জ্বল আকাশ। বনের মধ্যে গাছের ছাউনির জন্যে অন্ধকার লাগছে। একটু দাঁড়িয়ে দিক নির্দেশক যন্ত্রের দিকে চেয়ে শহীদ দেখলো ঠিক পথেই চলেছে তারা। জংলীদের এলাকাটা আর বেশি দূর নয়। একবার দূর থেকে দেখেই ওরা ফিরে যাবে লঞ্চে। কাল ভােরে আবার রওনা হবে তারা।
