যখনই তীরে আসে মাইমিতি এবং অন্যদের জন্যে কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসে ক্রিশ্চিয়ান। সে কারণে সবাই ওকে পছন্দ করে। সত্যি কথা বলতে কি ওর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে, মাইমিতিতে বটেই, অন্যরাও।
এভাবে কেটে গেল প্রায় এক মাস। তারপর এক রাতে…
আমি তখন ঘুমিয়ে। হঠাৎ কাঁধে কারও আলতো স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠলাম। ক্যান্ডল নাটের প্রদীপ জ্বলছে ঘরের ভেতর। তার অস্পষ্ট আলোয় দেখলাম ক্রিশ্চিয়ান ঝুঁকে আছে আমার ওপর। ওর পাশে মাইমিতি।
সৈকতে এসো, বিয়্যাম, ফিসফিস করে বল ক্রিশ্চিয়ান, একটা কথা বলব তোমাকে।
চোখ রগড়ে ঘুম তাড়াতে তাড়াতে চললাম ওদের পেছন পেছন।
নারকেলের ছোবড়া জ্বালিয়ে বড়সড় একটা আগুন তৈরি করা হয়েছে সৈকতে। সদ্য ধরে আনা মাছ ঝলসানো হচ্ছে তাতে। চারপাশে মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছে হিটিহিটির পরিবার। নিচু স্বরে আলাপ করছে তারা। অবাক হলাম আমি। না, এত রাতে খাওয়ার আয়োজন করতে দেখে নয়-খাওয়া বা ঘুমানোর কোন সময়সূচি নেই তাহিতীয়দের, সাগর থেকে মাছ ধরে আনার পরই সাধারণত খাওয়ার আয়োজন হয়; সে সকালে হোক, কি দুপুরে হোক, কি মাঝ রাতে হোক-আমি অবাক হলাম আমাকে ডাকা হয়নি দেখে।
একটা নারকেল গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসল ক্রিশ্চিয়ান। মাইমিতি বসল ওর এক পাশে, অন্য পাশে আমি।
নিঃশব্দে পেরিয়ে গেল কয়েকটা মিনিট। তারপর হঠাৎ ক্রিশ্চিয়ান বলল, ওল্ড ব্যাকাস মারা গেছে, বিয়্যাম।
ওহ ঈশ্বর! কি বলছ তুমি! কখন? কি…
কাল রাতে। সম্ভবত বিষাক্ত মাছ খেয়েছিল। টেতিয়ারোয়া থেকে ক্যানো ভর্তি মাছ নিয়ে এসেছিল কয়েক জন ইন্ডিয়ান। তাদের কাছ থেকে পঞ্চাশ পাউন্ড মত মাছ কিনেছিলাম আমরা। একমাত্র তোমাদের মেসকেই কাল ওই মাছ সরবরাহ করা হয়েছিল। রাতে খাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই বমি করতে শুরু করে তোমার মেসমেটরা। হেওয়ার্ড, নেলসন আর মরিসন ছঘন্টা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে গেছে কোন মতে, বুড়ো সার্জন পারেনি। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে আমি এসেছি তোমাকে জানাতে।
ওহ ঈশ্বর! আবার উচ্চারণ করলাম আমি।
ভোরে ওকে কবর দেয়া হবে। তোমাকে থাকতে বলেছেন মিস্টার ব্লাই।
পয়েন্ট ভেনাসে তাঁকে কবর দেয়া হলো। বিশ বছর আগে ক্যাপ্টেন কুক যেখানে মানমন্দির স্থাপন করেছিলেন তার কাছেই। ইন্ডিয়ানরাই কবর খুঁড়ে দিল আমাদের হয়ে। অবশেষে নামানো হয় ওস্ত ব্যাকাস-এর কফিন। ব্লাই পবিত্র-বাইবেল থেকে পাঠ করলেন মৃত আত্মার শান্তির উদ্দেশে। তারপর মুঠো মুঠো মাটি ছড়িয়ে দিলাম আমরা কফিনের ওপর।
.
ও ব্যাকাস-এর মৃত্যুর পর পরই আবার তিরিক্ষি হয়ে উঠল ব্লাই..এর মেজাজ। নিয়ম শৃখলা যেটুকু শিথিল করা হয়েছিল তা আবার কড়াকড়ি করা হলো। শুধু এ-ই নয় এমন সব ঘটনা বাউন্টিতে ঘটতে শুরু করল যে শেষ পর্যন্ত আমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম, আবার অসন্তোষের বিষ জমতে শুরু করেছে নাবিকদের মনে। কিন্তু ঘটনা সাপ্তাহিক অগ্রগতির খবর জানাতে গিয়ে আমি নিজের চোখে ঘটতে দেখেছি। কিছু শুনেছি হিটিহিটি আর ক্রিশ্চিয়ানের মুখে।
আগেই বলেছি, জাহাজের প্রতিটি লোকেরই ইন্ডিয়ান বন্ধু আছে। তারা প্রায়ই তাদের তাইওদের কাছে নানা ধরনের উপহার-বিশেষ করে খাবারদাবার পাঠায়। এই উপহার নিয়েই সূত্রপাত গোলযোগের। একদিন হঠাৎ ব্লাই ঘোষণা করে দিলেন ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে যা-ই আসবে-সে খাবার দাবারই হোক আর অন্য জিনিসই হোক-গণ্য হবে জাহাজের সম্পত্তি হিসেবে। ক্যাপ্টেনের কাছে জমা দিতে হবে সব।
ব্যাপারটা মেনে নেয়া সহজ নয় নাবিকদের পক্ষে। তাদের বন্ধুরা যে জিনিস পাঠাবে কেন তা তারা জাহাজকে মানে ব্লাইকে দিতে যাবে? কারও মনেই সংশয় রইল না, ওসব জিনিস স্রেফ মেরে দেবে ব্লাই।
একদিনের কথা আমার মনে আছে। অভিধানের অগ্রগতি দেখানোর জন্যে গিয়েছি জাহাজে। কিন্তু ব্লাই তখন জাহাজে নেই, রুটিফলের চারা সংগ্রহের তদারকি করতে গেছেন ডাঙায়। অপেক্ষা করতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি ছোট একটা ক্যানোয় চেপে জাহাজের দিকে আসছে টম এলিসন-আমাদের সবচেয়ে কম বয়েসী খালাসী। ক্যানোয় ও ছাড়াও রয়েছে এক ইন্ডিয়ান-ও তাইও। ক্যানোটা বাউন্টির গায়ে ভিড়তেই টম উঠে এল ডেকে। ইন্ডিয়ানটা এবার এগিয়ে দিতে লাগল তার উপহার-ভি নামের এক ধরনের ইন্ডিয়ান আপেল, তিমির দাঁতের হাতলঅলা একটা হাতপাখা আর কাপড়ের ছোট একটা পোটলা। জিনিসগুলো একে একে নিয়ে ডেকের ওপর নামিয়ে রাখল এলিসন।
ইয়ং হ্যালেট নামের এক মিডশিপম্যান, আছে আমাদের জাহাজে। ভীষণ কূট স্বাভাবের ছেলে। এই হ্যালেটের ওপর তখন দায়িত্ব ডেক পাহারা দেয়ার। এলিসন জাহাজে উঠতেই সে এগিয়ে গেল। অনুমতির তোয়াক্কা না করে একটা আপেল তুলে নিয়ে খেতে খেতে বলল, ক্যাপ্টেনের নির্দেশ মনে আছে তো, এলিসন? এগুলো আমার কাছে দিয়ে দাও, আমি পৌঁছে দেব।
মুখটা কালো হয়ে গেল এলিসনের। কোন মতে বলল, জি, স্যার।
আর এই পাখাটা, এলিসনের হাত থেকে ওটা নিতে নিতে হ্যালেট বলল, দেবে আমাকে?
না, স্যার। একটা মেয়ে এটা উপহার দিয়েছে আমাকে।
ও। তা ওটা কি, দেখি!
টাপা কাপড়ের পোঁটলা।
ঝুঁকে পোঁটলাটা তুলে নিল হ্যালেট। টিপে টিপে দেখল কিছুক্ষণ। ক্রুর একটা হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। বলল, মনে হচ্ছে বাচ্চা শুয়োর। মিস্টার স্যামুয়েলকে ডাকব? রক্তলকে উঠল এলিসনের মুখে। ওকে জবাব দেয়ার সুযোগ দিল না হ্যালেট। বলে চলল, এসো, একটা চুক্তি করি,আমরা-পাখাটা আমাকে দিয়ে দাও, শুয়োর সম্পর্কে কাউকে কিছু বলব না আমি!
