সমাধান হয়ে গেল সমস্যার। নেলসন দ্বীপে ঘুরে ঘুরে চারা সংগ্রহ করে সাগরতীরের তাঁবুতে নিয়ে আসেন। সেখানে সেগুলোর পরিচর্যা চলে, ঘোট ঘোট মাটির পাত্রে লাগানো হয়। এখন কেবল সহ চলছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক চারা যোগাড় হয়ে গেলে এক সাথে সব নিয়ে যাওয়া হবে জাহাজে।
আমাদের নাবিক যারা জাহাজে আছে তাদের সাথে আলাপ করে মনে হলো ক্যাপ্টেনের দুর্ব্যবহারের কথা ভুলে গেছে তারা। নিয়ম শৃঙ্খলার কড়াকড়ি অনেক শিথিল করা হয়েছে। অবসর সময়ে যে কেউ ইচ্ছে হলেই দ্বীপে যেতে পারে। একমাত্র সার্জন ও ব্যাকাস ছাড়া আর সবাই স্থানীয়দের ভেতর থেকে একজন করে তাইও বেছে নিয়েছে। ব্যাকাস তাইও নেননি কারণ তার ধারণা ইন্ডিয়ানদের সাথে বন্ধুত্ব করার চেয়ে কেবিনে বসে মদ খাওয়া ভাল। প্রায় প্রতিদিনই তাইওদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করতে যায় নাবিকরা। তাইওর খাওয়ায় প্রাণ খুলে। ছোটখাট তুচ্ছ কিছু উপহারের বিনিময়ে এই সেবা সত্যিই দুর্লভ।
.
দেখতে দেখতে পনেরো দিন কেটে গেল হিটিহিটির বাড়িতে। তারপর এক সকালে অবাক হয়ে দেখলাম আমার জাহাজী বন্ধুদের কয়েকজন এসেছে, আমার সাথে দেখা করতে।
হিনা, মাইমিতি, হিনার স্বামী টুয়াটাই আর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সৈকতে। দূরে নোঙ্গর করে আছে বাউন্টি। একটু আগে একটা জোড়া ক্যানোয় চেপে বাউন্টিতে গেছে আমার তাইও। দুপুরে ব্লাই-এর সাথে খাওয়ার দাওয়াত তার। আমরা এসেছিলাম হিটিহিটিকে ক্যানোয় তুলে দিতে। বেশ কিছুক্ষণ আগে। বাউন্টির গায়ে ভিড়েছে ক্যানো। খাওয়া দাওয়ার পর ফিরে আসবে হিটিহিটিকে নিয়ে।
কিছুক্ষণ সাগর পাড়ে কাটিয়ে বাড়ির পথ ধরব, এমন সময় হিনা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, বিয়্যাম, দেখ!
হিনার ইশারা অনুসরণ করে তাকালাম আমি। একটু যেন চমকালাম। তীর দিকে এগিয়ে আসছে জোড়া ক্যানোটা! কি ব্যাপার?–ব্লাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হলো নাকি হিটিহিটির? তাছাড়া আর কোন কারণ তো দেখছি না ওর ফিরে আসার।
একটু পরেই অবশ্য উদ্বেগ দূর হলো। ক্যানোটা আধাআধি পথ আসতে খেয়াল করলাম, দাড়ীরা ছাড়াও সাদা চামড়ার তিনজন মানুষ বসে আছে ওটার পেছন দিকে। আরেকটু এগিয়ে আসার পর চিনতে পারলাম শ্বেতাঙ্গ তিনজনকে-ক্রিশ্চিয়ান, গোলন্দাজ পেকওভার আরআর, কি আশ্চর্য, আমাদের ওল্ড ব্যাকাস! ইন্ডিয়ানদের সাথে সময় কাটানোর চেয়ে কেবিনে বসে মদ খাওয়া ভাল মনে হয় যার কাছে সেই ওল্ড ব্যাকাস!
অবশেষে তীরে ভিড়ল ক্যানো। সবার আগে লাফ দিয়ে নামলেন সার্জন। কাঠের পা টেনে টেনে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে।
আহ, বিয়্যাম, বললেন তিনি, প্রথমে তো চিনতেই পারিনি তোমাকে। ইন্ডিয়ানদের পোশাক পরে একেবারে ইন্ডিয়ান হয়ে গেছ কদিনেই! তারপর, দিনকাল চলছে কেমন?
এই তো, মৃদু হেসে আমি বললাম। তা হঠাৎ আপনি এত কষ্ট করে ডাঙায়?
হ্যাঁ, ক্রিশ্চিয়ান আর পেকওভারকে আসতে দেখে ভাবলাম আমিও এক চক্কর ঘুরে যাই। অনেকদিন তোমাকে দেখি না। দেখে যাই, সেই সাথে টেনেরিফের মদ দুএক বোতল খাইয়েও যাই। কই, পেকওভার, বোতলগুলো নামাও।
ক্রিশ্চিয়ান এগিয়ে এসে করমর্দন করল .আমার সাথে। আমি হিনা, মাইমিতি, ও হিনার স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম ওর। ওল্ড ব্যাকাস এবং পেকওভারের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলাম। এরপর হিনার নেতৃত্বে হিটিহিটির বাড়ির দিকে এগোলাম আমরা। ভত শ্রেণীর এক লোক মদের বোতলগুলো নিয়ে আসতে লাগল পেছন পেছন। হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, মাইমিতি, একটু পরপরই আড়চোখে দেখছে ক্রিশ্চিয়ানকে। ক্রিশ্চিয়ানও একই ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে মাইমিতির দিকে।
অবশেষে হিটিহিটির শীতল বারান্দায় গিয়ে বসলাম আমরা। হিনা গিয়ে রাঁধুনিদের রান্না চড়ানোর নির্দেশ দিয়ে এল। পথে আসতে আসতেই ও জানিয়ে দিয়েছে নতুন অতিথিরা কেউ না খেয়ে ফিরতে পারবেনা।
বসতে না বসতেই ভূতের কাছ থেকে একটা বোতল নিয়ে খুলে ফেললেন ব্যাকাস। বলেছিলেন বটে বোতলগুলো এনেছেন আমাকে খাওয়াবেন বলে, কিন্তু সময় মত দেখা গেল আমার কথা মনেই নেই বৃদ্ধ সার্জনের। দীর্ঘ এক চুমুক দিয়ে বোতলটা তিনি এগিয়ে দিলেন পেকওভারের দিকে। হিনার স্বামী তৃষিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে পকওভার একটা চুমুক দিয়ে ওটা এগিয়ে দিল তার দিকে। একটু পরেই দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয় বোতল খোলা হলো। রান্না হতে কিছু সময় লাগবে তাই ওদের ইচ্ছেমত মদ খাওয়ার সুযোগ দিয়ে আমি, ক্রিশ্চিয়ান, মাইমিতি আর হিনা বেরোলাম নদীর পাড় থেকে হেঁটে আসার জন্যে।
অবার শুরু হলো ক্রিশ্চিয়ান আর মাইমিতির চোরা দৃষ্টি বিনিময়।
পাশাপাশি হাঁটছি চারজন। হঠাৎ খেয়াল করলাম, চারজন নয়, দুজন আছি পাশাপশি-আমি আর হিনা। কোথায় গেল আর দুজন? ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, আমাদের খানিকটা পেছনে হাত ধরাধরি করে আসছে ক্রিশ্চিয়ান আর মাইমিতি। এখন আর চোরা চোখে নয়, সরাসরিই তাকাচ্ছে একজন আরেক জনের দিকে।
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হাসল ক্রিশ্চিয়ান। বলল:
প্রত্যেক নাবিকের একজন মনের মানুষ থাকা দরকার। আমার এতদিন ছিল না, এবার পেয়েছি।
———-
* দুটো বড় আকারের ক্যানো পাশাপাশি জুড়ে তৈরি হয় জোড়া ক্যানো। সাধারণ ক্যানোর চার-পাঁচ ক্ষেত্র বিশেষে দশগুণ পর্যন্ত হয় এগুলোর মাল ও মানুষ বহনের ক্ষমতা।
ছয়
মাইমিতির সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে সুযোগ পেলেই আমাদের সাথে দেখা করতে চলে আসে ক্রিশ্চিয়ান। আসলে আমাদের সাথে তো নয়, আপে মাইমিতির সাথে দেখা করতে। ভাষার ব্যবধান সত্ত্বেও ঘন্টার পর ঘণ্টা দুজন এক সাথে কাটায়, হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়ায় সৈকতে, পাহাড়ে, বনে। কিছুদিনের ভেতর সবাই মাইমিতির প্রেমিক হিসেবে মেনে নিল ওকে।
