হাদীস নং ৩৯১৪
ইসহাক ইবনে ইবরাহীম রহ…………আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার জয় করার পরে আমরা তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। তিনি আমাদের জন্য গনীমতের মাল বণ্টন করেছেন। আমাদেরকে ছাড়া বিজয়ে অংশগ্রহণ করেনি এমন করুর জন্য তিনি (খায়বারের গনীমতের মাল) বণ্টন করেননি।
হাদীস নং ৩৯১৫
আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ রহ……….আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বার যুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছি কিন্তু গনীমত হিসেবে আমরা সোনা, রূপা কিছুই লাভ করিনি। আমরা যা পেয়েছিলাম তা ছিল গরু, উট, বিভিন্ন দ্রব্য-সামগ্রী এবং ফলের বাগান। (যুদ্ধ শেষ করে) আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ওয়াদিউ কুরা নামক স্থান পর্যন্ত ফিরে আসলাম। তাঁর (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সঙ্গে ছিল মিদআম নামক একটি গোলাম। নবী যুবাইর-এর জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এটি হাদিয়া দিয়েছিল। এক সময়ে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাওদা নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিল আর ঐ মুহূর্তে এক অজ্ঞাত স্থান থেকে একটি তীর ছুটে এসে তার গায়ে পড়ল। ফলে গোলামটি মারা গেল। এ অবস্থা দেখে লোকজন বলাবলি শুরু করল যে, কি আনন্দদায়ক তার এ শাহাদত ! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাই নাকি? সেই মহান সত্তার কসম, তাঁর হাতে আমার প্রাণ, বণ্টনের আগে খায়বার যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে সে যে চাদরখানা তুলে নিয়েছিল সেটি আগুন হয়ে অবশ্যই তাকে দগ্ধ করবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ কথাটি শোনার পর আরেক ব্যক্তি একটি অথবা দুটি জুতার ফিতা নিয়ে এসে বলল, এ জিনিসটি আমি বণ্টনের আগেই নিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ কথাটি অথবা দুটি ফিতাও আগুনের ফিতায় রূপান্তরিত হত।
হাদীস নং ৩৯১৬
সাঈদ ইবনে আবু মারিয়াম রহ…………উমর ইবনে খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মনে রেখো! সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, যদি পরবর্তী বংশধরদের নিঃস্ব ও রিক্ত-হস্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত তাহলে আমি আমার সমুদয় বিজিত এলাকা সেভাবে বণ্টন করে দিতাম যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার বণ্টন করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তা তাদের জন্য গচ্ছিত আমানত হিসেবে রেখে যাচ্ছি যেন পরবর্তী বংশধরগণ তা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নিতে পারে।
হাদীস নং ৩৯১৭
মুহাম্মদ ইবনে মুসান্না রহ………….উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পরবর্তী মুসলমানদের উপর আমার আশংকা না থাকলে আমি তাদের বিজিত এলাকাগুলো তাদের মধ্যে সেভাবে বণ্টন করে দিতাম যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার বণ্টন করে দিয়েছিলেন।
হাদীস নং ৩৯১৮
আলী ইবনে আবদুল্লাহ রহ…………আমবাসা ইবনে সাঈদ রহ. থেকে বর্ণিত যে, আবু হুরায়রা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে (খায়বার যুদ্ধের গনীমতের) অংশ চাইলেন। তখন বনূ সাঈদ ইবনে আস গোত্রের জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল, না, তাকে দিবেন না। আবু হুরায়রা রা. বললেন, এ লোক তো ইবনে কাওকালের হত্যাকারী। কথাটি শুনে সে ব্যক্তি বলল, বাঃ ! দান পাহাড় থেকে নেমে আসা অদ্ভুত বিড়ালের কথায় আশ্চর্য বোধ করছি। যুবায়দী-যুহরী-আমবাসা ইবনে সাঈদ রহ. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি সাঈদ ইবনে আস রা. সম্পর্কে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবান (ইবনে সাইদ রা.) এর নেতৃত্বে একটি সৈন্যদল মদীনা থেকে নাজদের দিকে পাঠিয়েছিলেন। আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খায়বা বিজয় করে সেখানে অবস্থানরত ছিলেন তখন আবান রা. ও তাঁর সঙ্গীগণ সেখানে এসে তাঁর (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর) সাথে মিলিত হলেন। তাদের ঘোড়াগুলোর লাগাম ছিল খেজুরের ছালের বানানো। (অর্থা তাঁরা ছিলেন বড়ই নিঃস্ব) আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! তাদেরকে কোন অংশ দিবেন না। তখন আবান রা. বললেন, আরে বুনো বিড়াল, দান পাহাড় থেকে নেমে আসছ বরং তুমিই না পাওয়ার যোগ্য। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবান, বসো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে (আবান ও তার সঙ্গীদেরকে) অংশ দিলেন না।
হাদীস নং ৩৯১৯
মূসা ইবনে ইসমাঈল রহ………….আমর ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার দাদা আমাকে জানিয়েছেন যে, আবান ইবনে সাইদ রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে সালাম দিলেন। তখন আবু হুরায়রা রা. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! এ লোক তো ইবনে কাওকাল রা.-এর হত্যাকারী। তখন আবান রা. আবু হুরায়রা রা. কে বললেন, আশ্চর্য ! দান পাহাড়ের চূড়া থেকে অকস্মাৎ নেমে আসা বুনো বিড়াল ! সে এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে আমাকে দোষারূপ করছে যাকে আল্লাহ আমার হাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন (শাহাদত দান করেছেন) আর তাঁর হাত দ্বারা অপমানিত হওয়া থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন।
হাদীস নং ৩৯২০
ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ………….আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা ফাতিমা রা. আবু বকর রা.-এর নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ত্যাজ্য সম্পত্তি মদীনা ও ফাদকে অবস্থিত ফাই এবং খায়বারের খুমুসের অবশিষ্টাংশ থেকে মিরাসী স্বত্ব চেয়ে পাঠালেন। তখন আবু বকর রা. উত্তরে বললেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন, আমাদের (নবীদের) কোন ওয়ারিস হয় না, আমরা যা রেখে যাব তা সাদকা হিসেবে পরিগণিত হবে। অবশ্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বংশধরগণ এ সম্পত্তি কেবল ভোগ করতে পারেন। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাদকা তাঁর জীবদ্দশায় যে অবস্থায় ছিল আমি সে অবস্থা থেকে সামান্যতমও পরিবর্তন করব না। এ কথা বলে আবু বকর রা. ফাতিমা রা.-কে এ সম্পদ থেকে কিছু প্রদান করতে অস্বীকার করলেন। এতে ফাতিমা রা. (মানবোচিত কারণে) আবু বকর রা.-এর উপর নারাজ হয়ে গেলেন এবং তাঁর থেকে নিস্পৃহ হয়ে রইলেন। পরে তাঁর ওফাত পর্যন্ত তিনি (মানসিক সংকোচের দরুন) আবু বকর রা.-এর সাথে কথা বলেননি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের পর তিনি ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এরপর তিনি ইন্তিকাল করলে তাঁর স্বামী আলী রা. রাতের বেলা তাঁর দাফন কার্য শেষ করে নেন। আবু বকর রা.-কেও এ সংবাদ দেননি। এবং তিনি তার জানাযার নামায আদায় করে নেন। ফাতিমা রা. জীবিত থাকা পর্যন্ত লোকজনের মনে আলী রা. -এর বেশ সম্মান ও প্রভাব ছিল। এরপর যখন ফাতিমা রা. ইন্তিকাল করলেন, তখন আলী রা. লোকজনের চেহারায় অসন্তুষ্টির চিহ্ন দেখতে পেলেন। তাই তিনি আবু বকর রা.-এর সাথে সমঝোতা ও তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণের ইচ্ছা করলেন। (ফাতিমা রা.-এর অসুস্থতা ও অন্যান্য) ব্যস্ততার দরুন এ ছয় মাসে তাঁর পক্ষে বায়আত গ্রহণের অবসর হয়নি। তাই তিনি আবু বকর রা.-এর কাছে লোক পাঠিয়ে জানালেন যে, আপনি আমার কাছে আসুন। তবে অন্য কেউ যেন আপনার সঙ্গে না আসে। কারণ আবু বকর রা.-এর সঙ্গে উমর রা. ও উপস্থিত হোক—–তিনি তা পছন্দ করেননি। (বিষয়টি শোনার পর) উমর রা. বললেন, আল্লাহর কসম, আপনি এক একা তাঁর কাছে যাবেন না। আবু বকর রা. বললেন, তাঁরা আমার সাথে খারাপ আচরণ করবে বলে তোমরা আশংকা করছ? আল্লাহর কসম, আমি তাদের কাছে যাব। তারপর আবু বকর রা. তাদের কাছে গেলেন। আলী রা. তাশাহহুদ পাঠ করে বললেন, আমরা আপনার মর্যদা এবং আল্লাহ আপনাকে যা কিছু দান করেছেন সে সম্পর্কে অবগত আছি। আর যে কল্যাণ (খিলাফত) আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন সে ব্যাপারেও আমরা আপনার সাথে হিংসা রাখি না। তবে খিলাফতের ব্যাপারে আপনি আমাদের উপর নিজের মতের প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছেন অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয় হিসেবে খিলাফতের কাজে আমাদেরও কিছু অধিকার রয়েছে। এ কথায় আবু বকর রা.-এর চোখ-যুগল থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল। এরপর তিনি যখন আলোচনা আরম্ভ করলেন তখন বললেন, সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে আমার নিকত্মীয় অপেক্ষাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আত্মীয় বর্গ বেশি প্রিয়। আর এসম্পদগুলোতে আমার এবং আপনাদের মধ্যে যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে সে ব্যাপারেও আমি কল্যাণকর পথ অনসরণে কোন কসুর করিনি। বরং এ ক্ষেত্রেও আমি কোন কাজ পরিত্যাগ করিনি যা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে করতে দেখেছি। তারপর আলী রা. আবু বকর রা.-কে বললেন, যুহরের পর আপনার হাতে বায়আত গ্রহণের ওয়াদা রইল। যুহরের নামায আদায়ের পর আবু বকর রা. মিম্বরে বসে তাশাহহুদ পাঠ করলেন, তারপর আলী রা.-এর বর্তমান অবস্থা এবং বায়আত গ্রহণে তার দেরি করার কারণ ও তাঁর (আবু বকরের) কাছে পেশকৃত আপত্তিগুলো তিনি বর্ণনা করলেন। এরপর আলী রা. দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাশাহহুদ পাঠ করলেন এবং আবু বকর রা.-এর মর্যাদার কথা উল্লেখ করে বললেন, তিনি বিলম্বজনিত যা কিছু করেছেন তা আবু বকর রা.-এর প্রতি হিংসা কিংবা আল্লাহ প্রদত্ত তাঁর এ সম্মানের অস্বীকার করার মনোবৃত্তি নিয়ে করেননি। (তিনি বলেন,) তবে আমরা ভেবেছিলাম যে, এ ব্যাপারে আমাদের পরামর্শও দেওয়ার অধিকার থাকবে। অথচ তিনি (আবু বকর রা.) আমাদের পরামর্শ ত্যাগ করে স্বাধীন মতের উপর রয়ে গেছেন। তাই আমরা মানসিকভাবে ব্যাথা পেয়েছিলাম। (উভয়ের এ আলোচনা শুনে) মুসলমানগণ আনন্দিত হয়ে বললেন, আপনি ঠিকই করেছেন। এরপর আলী রা. আমর বিল মারূফ (অর্থাৎ বায়আত গ্রহণ)-এর দিকে ফিরে এসেছেন দেখে সব মুসলমান আবার তাঁর প্রতি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন।
