হাদীস নং ৪৬২২
মূসা রহ………আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রা. একবার উসমান রা.-এর কাছে এলেন। এ সময় তিনি আরমিনিয়া ও আযারবাইজান বিজয়ের ব্যাপারে সিরীয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের জন্য রণ-প্রস্তুতির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কুরআন পাঠে তাদের মতবিরোধ হযযায়ফাকে ভীষণ চিন্তিত করল। সুতরাং তিনি উসমান রা. কে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন ! কিতাব সম্পর্কে ইহুদী ও নাসারাদের মত মতপার্থক্যে লিপ্ত হবার পূর্বে এই উম্মতকে রক্ষা করুন। তারপর উসমান রা. হাফসা রা.-এর কাছে জনৈক ব্যক্তিকে এ বলে পাঠালেন যে, আপনার কাছে সংরক্ষিত কুরআনে সহীফাসমূহ আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমরা সেগুলোকে পরিপূর্ণ মাসহাফসমূহে লিপিবদ্ধ করতে পারি। এরপর আমরা তা আপনার কাছে ফিরিয়ে দেব। হাফসা রা. তখন সেগুলো উসমান রা.-এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর উসমান রা. যায়েদ ইবনে সাবিত রা. , আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা., সাঈদ ইবনে আস রা. এবং আবদুর রহমান ইবনে হারিস ইবনে হিশাম রা.-কে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা মাসহাফে তা লিপিবদ্ধ করলেন। এ সময় হযরত উসমান রা. তিনজন কুরাইশী ব্যক্তিকে বললেন, কুরআনের কোন বিষয়ে যদি যায়েদ ইবনে সাবিতের সঙ্গে তোমাদের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তাহলে তোমরা তা কুরাইশদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ, কুরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তাঁরা তাই করলেন। যখন মূল লিপিগুলো থেকে কয়েকটি পরিপূর্ণ গ্রস্থ লিপিবদ্ধ হয়ে গেল, তখন উসমান রা. মূল লিপিগুলো হাফসা রা-এর কাছে ফিরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কুরআনের লিখিত মাসহাফ –সমূহের এক একখানা মাসহাফ এক এক প্রদেশে পাঠিয়ে দিলেন এবং এতদভিন্ন আলাদা আলাদা বা একত্রে সন্নিবেশিত কুরআনের যে কপিসমূহ রয়েছে তা জ্বালিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ইবনে শিহাব রহ. খারিজা ইবনে যায়েদ ইবনে সাবিতের মধ্যমে যায়েদ ইবনে সাবিত থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমরা যখন গ্রন্থাকারে কুরআন লিপিবদ্ধ করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত আমার থেকে হারিয়ে যায়, অথচ আমি তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –কে পাঠ করতে শুনেছি। তাই আমরা অনুসন্ধান করতে লাগলাম। অবশেষে আমরা তা খুযায়মা ইবনে সাবিত আনসাসী রা.-এর কাছে পেলাম। আয়াতটি হচ্ছে এই “মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সঙ্গে তাদের কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাঁরা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি”। (৩৩: ২৩) তারপর আমরা এ আয়াতটি সংশ্লিষ্ট সূরার সাথে মাসহাফে লিপিবদ্ধ করলাম।
হাদীস নং ৪৬২৩ – নবী (সা.) এর কাতিব।
ইয়াহইয়া ইবনে বুকাইর রহ……..যায়েদ ইবনে সাবিত রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,আবু বকর রা. আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওহী লিখতে। সুতরাং তুমি কুরআনের আয়াতগুলো অনুসন্ধান কর। এরপর আমি অনুসন্ধান করলাম। শেষ পর্যন্ত সূরা তাওবার শেষ দুটো আয়াত আমি আবু খুযায়মা আনসারী রা.-এর কাছে গেলাম। তিনি ব্যতীত আর কারো কাছে আমি এর সন্ধান পায়নি। আয়াত দুটো হচ্ছে এই : “তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের কাছে এক রাসূল এসেছে। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। তারপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তুমি বলবে, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি এবং তিনি মহা আরশের অধিপতি”। (৯: ১২৮:১২৯)
হাদীস নং ৪৬২৪
উবায়দুল্লাহ ইবনে মূসা রহ………..বারা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, لايستوى القاعدون من المؤمنين والمجاهدون في سبيل الله আয়াতটি নাযিল হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যায়েদকে আমার কাছে ডেকে আন এবং তাকে বল যে যেন কাষ্ঠখণ্ড, দোয়াত এবং কাঁধের হাড় রাবী বলেন, অথবা তিনি বলেছেন, কাঁধের হাড় এবং দোয়াত নিয়ে আসে। এরপর তিনি বললেন, লিখ لا يستوى। এ সময় অন্ধ সাহাবী আমর ইবনে উম্মে মাকতুম রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে বসা ছিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমি তো অন্ধ, আমার ব্যাপারে আপনার কি নির্দেশ ? এ কথার প্রেক্ষিতে পূর্বোক্ত আয়াতের পরিবর্তে নাযিল হল: “মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয়, অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দ্বারা জিহাদ করে তারা সমান নয়”।(৪: ৯৫)
হাদীস নং ৪৬২৫ – কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে।
সাঈদ ইবনে উফাইর রহ………ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জিবরাঈল আ. আমাকে একভাবে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আমি তাকে অন্যভাবে পাঠ করার জন্য অনুরোধ করতে লাগলাম এবং পুনঃ পুনঃ অন্যভাবে পাঠ করার জন্য অব্যাহতভাবে অনুরোধ করতে থাকলে তিনি আমার জন্য পাঠ পদ্ধতি বাড়িয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে তিনি সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় তিলাওয়াত করে সমাপ্ত করলেন।
হাদীস নং ৪৬২৬
সাঈদ ইবনে উফাইর রহ……….উমর ইবনে খাত্তাব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হিশাম ইবনে হাকীম রা.-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় সূরা ফুরকান তিলাওয়াত করতে শুনেছি এবং গভীর মনোযোগ সহকারে আমি তাঁর কিরআত শুনেছি। তিনি বিভিন্নভাবে কিরাআত পাঠ করেছেন; অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এভাবে শিক্ষা দেননি। এ কারণে সালাতের মাঝে আমি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদ্যত হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু বড় কষ্টে নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর সে সালাম ফিরালে আমি চাদর দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম, তোমাকে এ সূরা যেভাবে পাঠ করতে শুনলাম, এভাবে তোমাকে কে শিক্ষা দিয়েছে? সে বলল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই আমাকে এভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি বললাম, তুমি মিথ্যা বলছ। কারণ, তুমি যে পদ্ধতিতে পাঠ করেছ, এর থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আমি তাকে জোর করে টেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম, আপনি আমাকে সূরা ফুরকান যে পদ্ধতিতে পাঠ করতে শিখিয়েছেন এ লোককে আমি এর থেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে তা পাঠ করতে শুনেছি। এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। হিশাম, তুমি পাঠ কর শোনাও। তারপর সে সেভাবেই পাঠ করে শোনাল, যেভাবে আমি তাকে পাঠ করতে শুনেছি। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেই নাযিল করা হয়েছে। এরপর বললেন, হে উমর ! তুমিও পড়। সুতরাং আমাকে তিনি যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, সেভাবেই আমি পাঠ করলাম। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এভাবেও কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এ কুরআন সাত উপ (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের জন্য যা সহজতর, সে পদ্ধতিতেই তোমরা পাঠ কর।
