সেনাদল চলে যাওয়ার পর আমি আমার হার পেয়ে গেলাম এবং যেখানে তারা ছিল সেখানে ফিরে এলাম। তখন সেখানে এমন কেউ ছিলনা যে ডাকবে বা ডাকে সাড়া দিবে। আমি যেখানে ছিলাম সে স্থানেই থেকে গেলাম। এ ধারনায় বসে থাকলাম যে যখন কিছুদূর গিয়ে আমাকে দেখতে পাবেনা, তখন এ স্থানে অবশ্যই খুঁজতে আসবে। সেখানে বসা অবস্থায় আমার চোখে ঘুম এসে গেল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আর সৈন্যবাহিনীর পিছনে সাফওান ইবনু মুয়াত্তাল সুলামি যাকওয়ানি ছিলেন। তিনি শেষ রাতে রওয়ানা দিয়ে ভোর বেলা আমার এ স্থানে এসে পৌঁছলেন। তিনি একজন মানুষের আকৃতি নিদ্রাবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি আমার কাছে এসে আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। কেননা, পর্দার হুকুম নাযিল হওয়ার আগে আমাকে দেখেছিলেন। কাজেই আমাকে চেনার পর উচ্চকণ্ঠে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়লেন। পড়ার আওয়াজে আমি উঠে গেলাম এবং আমি আমার চাঁদর দিয়ে চেহারা ধেকে নিলাম। আল্লাহর কসম তিনি আমার সঙ্গে কোন কথাই বলেননি এবং তার মুখ হতে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” আর কোন কথা আমি শুনিনি।
এরপর তিনি তার উট বসালেন এবং সামনের দুই পা নিজ পায়ে দাবিয়ে রাখলেন। আর আমি তাতে আরোহণ করলাম। তখন সাফওয়ান উটের লাগাম ধরে চললেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সৈন্যবাহিনীর নিকট এ সময় গিয়ে পৌঁছলাম, যখন তারা দুপুরের প্রচণ্ড উত্তাপের সময় অবতরণ করে। (এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে) যারা ধ্বংস হওয়ার তারা ধ্বংস হল। আর যে ব্যাক্তি এ অপবাদের নেতৃত্ব দেয়, সে ছিল (মুনাফিক সর্দার) আবদুল্লাহ ইবনু উবায় ইবনু সলুল। তারপর আমি মদিনায় এসে পৌঁছলাম এবং পৌঁছার পর আমি দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত অসুস্থ ছিলাম। আর অপবাদকারীদের কথা নিয়ে লোকেরা রটনা করছিল। আমি এসব কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে এতে আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল যে, আমার অসুস্থ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে রকম স্নেহ ভালবাসা দেখাতেন, এবারে তেমনি ভালবাসা দেখাচ্ছেন না। শুধু এতটুকুই ছিল যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে আসতেন এবং সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার অবস্থা কি? তারপর তিনি ফিরে যেতেন। এই আচরণই আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল। অথচ আমি এই অপপ্রচার সম্বন্ধে জানতেই পারিনি।
অবশেষে একটু সুস্থ হওয়ার পর মিসতাহের মায়ের সঙ্গে মানাসের দিকে বের হলাম। সে জায়গাটই ছিল আমাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার স্থান। আর আমরা কেবল রাতের পর রাতেই বাইরে যেতাম। এ ছিল সে সময়ের কথা যখন আমাদের ঘর সংলগ্ন পায়খানা নির্মিত হয়নি। আমাদের অবস্থা ছিল অনেকটা প্রাচীন আরবদের নিচু ময়দানের দিকে বের হয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা। কেননা, ঘর সংলগ্ন পায়খানা নির্মাণ আমরা কষ্টকর মনে করতাম। কাজেই আমি ও মিসতাহের মা বাইরে গেলাম। তিনি ছিলেন আবূ রুহম ইবনু আবদ মানাফের কন্যা এবং মিসতাহের মায়ের মা ছিলেন সাখর ইবনু আমিরের কন্যা, যিনি আবূ বকর (রাঃ) এর খালা ছিলেন। আর তার পুত্র ছিলেন মিসতাহ ইবনু উসাসাহ।
আমি ও উম্মে মিসতাহ আমাদের প্রয়োজন সেরে ঘরের দিকে ফিরলাম। তখন মিসতাহের মা তার চাঁদরে হোঁচট খেয়ে বললেন, মিসতাহ ধ্বংস হোক। আমি তাঁকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলছ, তুমি কি এমন এক ব্যাক্তিকে মন্দ বলছ, যে বদরের যুদ্ধে হাজির ছিল। তিনি বললেন, হে আত্মভোলা! তুমি কি শোননি সে কি বলেছে? আমি বললাম, সে কি বলেছে? তিনি বললেন, এমন এমন। এ বলে তিনি অপবাদকারীদের অপবাদ সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত খবর দিলেন। এতে আমার অসুখের মাত্রা বৃদ্ধি পেল। যখন আমি ঘরে ফিরে আসলাম এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে প্রবেশ করে বললেন, তুমি কেমন আছ? তখন আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আমার আব্বা আম্মার নিকট যেতে অনুমতি দিবেন? তিনি বললেন, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি তাদের কাছে গিয়ে তাদের থেকে আমার এ ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে জেনে নেই।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আসার জন্য অনুমতি দিলেন। আমি আব্বা আম্মার কাছে চলে গেলাম এবং আমার আম্মাকে বললাম, ও গো আম্মা! লোকেরা কি বলাবলি করছে? তিনি বললেন, বৎস! তুমি তোমার মন হালকা রাখ। আল্লাহর কসম! এমন কমই দেখা যায় যে, কোন পুরুষের কাছে এমন সুন্দরী রূপবতী স্ত্রী আছে, যাকে সে ভালবাসে এবং তার সতীনও আছে, অথচ তার ত্রুটি বের করা হয়না। রাবি বলেন, আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ। সত্যি কি লোকেরা এ ব্যপারে বলাবলি করছে? তিনি বললেন, আমি সে রাত কেঁদে কাটালাম। এমনকি ভোর হয়ে গেল তথাপি আমার কান্না থামল না। এবং আমি ঘুমাতেও পারলাম না। আমি কাঁদতে কাঁদতেই ভোর করলাম।
যখন ওহী আসতে দেরি হল, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) ও উসামা ইবনু যায়িদ (রাঃ) কে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদের ব্যপারে তাদের পরামর্শের জন্য ডাকলেন। তিনি বলেন, উসামা ইবনু যায়েদ তার সহধর্মিণী (আয়িশা (রাঃ) এর পবিত্রতা এবং তার অন্তরে তাদের প্রতি তার ভালবাসা সম্পর্কে যা জানেন তার আলোকে তাঁকে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার পরিবার সম্পর্কে আমরা ভাল ধারনাই পোষণ করি। আর আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ আপনার উপর কোন সংকীর্ণতা আরোপ করেন নি এবং তিনি ছাড়া বহু মহিলা রয়েছেন। আর আপনি যদি দাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে। তিনি [আয়শা (রাঃ)] বলেন, তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারিরাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারিরা! তুমি কি তার কাছ থেকে সন্দেহজনক কিছু দেখেছ? বারিরা বলল, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরন করেছেন, তাঁর কসম! আমি এমন কোন কিছু তাঁর মধ্যে দেখতে পাইনি, যা আমি গোপন করতে পারি। তবে তাঁর মধ্যে সবচাইতে বেশি যা দেখেছি, তা হল তিনি একজন অল্প বয়স্ক বালিকা। তিনি কখনও তাঁর পরিবাবের আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। আর বকরীর বাচ্চা এসে তা খেয়ে ফেলত।
