১৪৪। যখন দু’পক্ষ আত্ম কলহে মগ্ন হয়, তখন তাদের মধ্যে সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি পরিলক্ষিত হয়। এসময়ে একজন নিরপেক্ষ ও ন্যায়বান ব্যক্তি সাক্ষী হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এখানে বলা হয়েছে ইহুদী জাতির কথা। যারা মুসার ধর্মের আচরণবিধি কঠোরভাবে অনুশীলন করতো ফলে ধর্ম রূপান্তরিত হয়ে গেলো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে। ধর্মের যে প্রাণ তা গেলো হারিয়ে। আবার খৃষ্টানেরা বলে ধর্মের নামে পৃথিবীর সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করতে। তাদের কাছে পরকালের জন্য পৃথিবীর সমস্ত ক্রিয়া-কর্ম পরিতাজ্য। তাহলে তো সভ্যতা থমকে যাবে। মানব সভ্যতার যে অগ্রগতি তা হবে ব্যাহত। কিন্তু কর্মহীন দ্বীন আল্লাহ্র কাছে মনোনীত নয়। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যেখানে বলা হয়েছে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়েরই প্রয়োজন পরকালের মুক্তির জন্য। মুসলমান চলমান পৃথিবীর সমস্ত ক্রিয়াকর্মে অংশ গ্রহণ করবে। আমরা এর প্রকৃত উদাহরণ দেখি ৭ম ও ৮ম শতাব্দীতে মুসলিম সভ্যতার আমলে। তারা হয়েছেন বৈজ্ঞানিক, ডাক্তার, শিল্পী, সাহিত্যিক। পৃথিবীর সভ্যতাকে তারা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু একই সাথের তাদের সমস্ত ক্রিয়াকর্ম ছিল আল্লাহ্র কাছে নিবেদিত। আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্যের সাথে সাথেই ছিল তাদের দুনিয়া। দ্বীন ও দুনিয়া এই দুয়ে মিলেই ইসলাম। দুনিয়ার প্রলোভন দুনিয়াতে থেকেই আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসায় আল্লাহ্র জন্য ত্যাগ করাই হচ্ছে ইসলামের মূল কথা। সুতরাং ইসলামে ঈমানদারগণকে এই মধ্যপন্থী ন্যায়বান সাক্ষী হিসেবে বলা হচ্ছে।
১৪৫। জেরুজালেমের বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে কিব্লা পরিবর্তন করে কাবাকে কিব্লা নির্দেশ করার পর ইহুদী ও আরবের মুশরিক ও মুনাফিকরা প্রশ্ন তুলতে থাকে যে এ ধর্মের কোনও স্থিতিশীলতা নাই। রোজ কিব্লা পরিবর্তন করে। কিন্তু আল্লাহ্র অস্তিত্ব পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ সর্বত্রই। কিব্লার কোনও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নাই।
আল্লাহ্ মনোনীত করেছেন এটাই এ স্থানের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। কোনটা কিব্লা হলো সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো কে আল্লাহ্র হুকুম বিশ্বাস ও আনুগত্যের সাথে পালন করলো। আল্লাহ্ কিব্লা পরিবর্তনের ঘটনাকে অনুসারী মুসলমানদের জন্য একটি পরীক্ষা সাব্যস্ত করেছিলেন যাতে প্রকাশ্যভাবে জানা যায় যে কে রাসূলের খাঁটি অনুসারী এবং কে নিজ মতের অনুসারী।
১৪৬। কিব্লা পরিবর্তনের পূর্বে যারা ইন্তেকাল করেছিলেন তারা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত কায়েম করেছিলেন। তাদের ঈমান ও সালাত কবুল হয়েছে কিনা এ নিয়ে কারও কারও মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এই আয়াতটি-তখন ইরশাদ হয়। আল্লাহ্র কাছে বিশ্বাসের গভীরতা ও আন্তরিকতাই আসল কাম্য। এক স্রষ্টায় বিশ্বাস, তাঁর প্রতি আনুগত্য এবং অকৃত্রিম ভালবাসা-এটাই আল্লাহ্ আমাদের কাছে চান। আল্লাহ্ তাঁর বান্দার কাছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা হাদীস ফেকার চুলচেরা বিশ্লেষণের পাণ্ডিত্য চান না। বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠান, ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ, ধর্মের পাণ্ডিত্যে বাইরের পৃথিবীকে চমকিত করতে পারে, সাধারণ মানুষ মুগ্ধ হয়ে তার অনুসারী হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ্র কাছে এসব আনুষ্ঠানিকতার কোনও মূল্য নাই। আল্লাহ্ আমাদের পরিশুদ্ধ আত্মা চান। যে আত্মা থাকবে শুধু আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসা, আনুগত্য ও বিশ্বাসে ভরপুর। এখানে আনুষ্ঠানিকতা বা তার ত্রুটিতে কিছুই যাবে বা আসবে না। সুতরাং যারা বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে কিব্লা করে নামায পড়ে গত হয়েছেন তাদের নামাজ যদি আন্তরিক ও আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসাতে ভরপুর হয় তবে অবশ্যই তা আল্লাহ্র কাছে গৃহীত। ইসলাম বাহুল্য আনুষ্ঠানিকতাকে সবসময়ে পরিত্যাগ করতে বলেছে।
আয়াতঃ 002.144
