ছেলেটা বিয়ার নিয়ে ফিরে এসে দেখে বাপ তখনও বসে রয়েছে অন্ধকারে। টিভি অফ করা। গা ছমছম করে ওঠে ছেলেটার। অবশ্য অন্ধকারে ফ্ল্যাটে বড়সড় একটা পিণ্ডের মত বাপকে ঘরের কোণে বসে থাকতে দেখলে কে না ভয় পাবে?
টিমি টেবিলের উপর বিয়ারের ক্যান রাখল। বাপের সামনে আসা মাত্র ভক্ করে পচা একটা গন্ধ নাকে ধাক্কা মারল তার। পচা চিজের বিটকেলে গন্ধ। কিন্তু বাপকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেল না টিমি। দরজা বন্ধ করে হোমওয়ার্ক নিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর শুনল চালু হয়েছে টিভি, সেই সাথে বিয়ারের ক্যান খুলছে রিচি।
হপ্তা দুই এরকমই চলল। ছেলেটা সকালে উঠে স্কুলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখে তার বাপ টিভির সামনে বসে বসে আছে, টেবিলের উপর বিয়ার কেনার টাকা।
একদিন বিকেল চারটা নাগাদ বাসায় ফিরেছে টিমি-ততক্ষণে বাইরেটা কালো হয়ে এসেছে-রিচি হুকুম করল, আলো জ্বেলে দে সিঙ্কের বাতি জ্বালল টিমি। দেখল বাপ কম্বল মুড়ি দিয়ে বসা।
দেখ, বলে কম্বলের নিচে থেকে একটা হাত বের করে আনল রিচি। তবে ওটা হাত নয়। ধূসর রঙের একটা মাংসপিণ্ড। আঁতকে উঠল টিমি। জিজ্ঞেস করল, বাবা, তোমার কী হয়েছে?
রিচি জবাব দিল, জানি না। তবে ব্যথা লাগছে না বরং…ভালোই লাগছে।
টিমি বলল, আমি ডাক্তার ওয়েস্টফেলকে ডেকে আনি। তখন কম্বলটা ভয়ানক কাঁপতে শুরু করল, যেন ওটার নিচে প্রবলবেগে কিছু ঝকি খাচ্ছে। রিচি বলল, খবরদার, ডাক্তারের কাছে যাবি না। সে চেষ্টা করলে তোকে আমি ধরে ফেলব। তারপর তোর দশা হবে এরকম। বলে মুখের উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে ফেলল রিচি।
আমরা এতক্ষণে হার্লো ও কার্ডোস্ট্রিটের মোড়ে চলে এসেছি। শুধু ঠাণ্ডা নয়, ভয়েও গা-টা কেমন হিম হয়ে আছে আমার। এরকম গল্প হজম করা মুশকিল। তবে কিনা পৃথিবীতে অনেক আজব ঘটনাই ঘটে। জর্জকেলসো নামে এক লোককে চিনতাম আমি। ব্যাঙ্গর পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে কাজ করত। পনেরো বছর সে কাটিয়েছে মাটির নিচে পানির পাইপ আর বৈদ্যুতিক তার মেরামতের কাজে। অবসর নেয়ার তখন মাত্র দুবছর বাকি। একদিন সে চাকরিটা ছেড়ে দিল। ফ্ৰল্কি হ্যান্ডম্যান ওকে চিনতো। সে বলেছে জর্জ একদিন এসেক্সের একটি ড্রেনের পাইপ সারাতে হাসি মুখে, স্বভাবসুলভ ঠাট্টা মশকরা করতে করতে মাটির নিচে গিয়েছিল। পনেরো মিনিট পর যখন সে উপরে উঠে এল, তার সমস্ত চুল বরফের মত সাদা, চাউনি দেখে মনে হচ্ছিল নরক দর্শন করে এসেছে। সে সোজা ওয়ালির স্পাতে ঢুকে আকণ্ঠ মদপান শুরু করে। মদ খেয়ে খেয়ে দুবছরের মাথায় মারা যায় জর্জ। ফ্রাঙ্কি ওর সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছিল সিউয়ার পাইপে কী দেখে ভয় পেয়েছে জর্জ। জর্জ ফ্রাঙ্কিকে জিজ্ঞেস করেছিল সে কোনদিন কুকুর সাইজের মাকড়সা দেখেছে কিনা। ঘটনা কতটা সত্য আর কতটা অতিরঞ্জিত আমি জানি না, তবে পৃথিবীতে নিশ্চয় এমন ঘটনা ঘটে যা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষকেও পাগল বানিয়ে ছাড়ে।
আমরা রাস্তার মোড়ে মিনিট খানেকের জন্য দাঁড়ালাম। যদিও তীব্র ঠাণ্ডা বাতাসের চাবুক আছড়ে পড়ছে গায়ের উপর।
টিমি কী দেখল? জিজ্ঞেস করল বাটিং।
টিমি বলেছে ও ওর বাপকেই দেখেছে, জবাব দিল হেনরি। তবে সারা গায়ে ধূসর জেলি মাখা। পরনের জামাকাপড় যেন গলে গিয়ে লেগে ছিল শরীরের সঙ্গে।
ঈশ্বর! বলল বার্টি।
রিচি আবার কম্বল দিয়ে মুড়ে নেয় নিজেকে এবং বাতি নিভিয়ে দেয়ার জন্য চেঁচাতে থাকে বাচ্চাটার উদ্দেশে।
ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের মত দেখাচ্ছিল বোধহয় ওকে, মন্তব্য করলাম আমি।
হ্যাঁ, সায় দিল হেনরি। অনেকটা সেরকমই।
পিস্তলটা রেডি রেখো, বলল বার্টি।
রেডি আছে, বলল হেনরি। আমরা আবার হাঁটা দিলাম।
রিচি গ্রেনাডাইনের অ্যাপর্টমেন্ট হাউজটি পাহাড়ের প্রায় চূড়াতে, ভিক্টোরিয়ান আদলে গড়া। এগুলোকে এখন অ্যাপার্টমেন্ট হাউজে রূপান্তর ঘটানো হচ্ছে। বার্টি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রিচি তিনতলায় থাকে। আমি সুযোগ বুঝে হেনরির কাছে জানতে চাইলাম এরপরে বাচ্চাটার কী হলো।
নভেম্বরের তৃতীয় হপ্তায়, এক বিকেলে বাচ্চাটা বাসায় এসে দেখে তার বাপ প্রতিটি জানালা চাদর দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে। ঘর থেকে বদ গন্ধটার তীব্রতা বেড়েছে। আরও, কেমন ফল পচা গন্ধ।
সপ্তাহখানেক ধরে রিচি তার ছেলেকে দিয়ে চুল্লিতে বিয়ার গরম করাল। ভাবা যায়? বেচারা দিনের পর দিন ওই বাড়িতে বসে চুল্লিতে বিয়ার গরম করছে আর শুনছে চুক চুক করে তা পান করছে তার বাপ।
এরকম চলল আজতক পর্যন্ত। আজ বাচ্চাটা ঝড়ো হাওয়ার কারণে ছুটি পেয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসেছিল বাসায়।
ছেলেটি বলেছে সে সোজা ঘরে ঢুকে পড়ে, আমাদেরকে বলল হেনরি। উপরতলায় হলঘরে একটি বাতিও জ্বলছিল না-টিমির ধারণা ওর বাপ সবগুলো বাল্ব ভেঙে রেখেছে। তাই প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে দরজার সামনে আসতে হলো ওকে।
এমন সময় শুনতে পেল কিছু একটা নড়াচড়া করছে ওখানে, হঠাৎ টিমির মনে পড়ল তার বাপ সারাদিন কী করে সে সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। বাপকে সে গত একমাসে বলতে গেলে চেয়ার ছেড়ে নড়তেই দেখেনি। তার কি বাথরুমে যাওয়ারও প্রয়োজন হয় না!
দরজার মাঝখানে একটা ফুটো ছিল। ফুটোর মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে কৌশলে ছিটকিনি খুলে ফেলল টিমি। তারপর একটা চোখ রাখল ফুটোতে।
