এদিকে নেকড়ে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলে। বেঁচে থাকার জন্য প্রাণী হত্যা করে ক্ষুধা মেটায়। আর মনে মনে শুধু আফসোস করে কেন বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রীকে বিশ্বাস করে গোপন কথাগুলো বলতে গিয়েছিল।
এভাবে একটি বছর কেটে গেল। একদিন রাজা ওই জঙ্গলে এলেন শিকারে। শিকারী কুকুরের দল মাটিতে নেকড়ের পায়ের ছাপ দেখে তারস্বরে ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিল। তাদেরকে ধরে রাখে কার সাধ্য। তারা নেকড়ের পিছু নিল। সারাটি দিন কুকুরগুলো ধাওয়া করল নেকড়েকে। রাজা তার পরিবারবর্গ নিয়ে ছুটলেন। কুকুরের পেছন পেছন। সন্ধ্যা নাগাদ, ক্রমাগত ধাওয়া খেয়ে ক্লান্ত, কাঁটার আঘাতে আহত এবং বিপর্যস্ত নেকড়ে একেবারে নেতিয়ে পড়ল। সে নিশ্চিত আজই মৃত্যু ঘটবে তার শিকারী কুকুরের হাতে। হঠাৎ রাজাকে দেখতে পেল সে। মনে পড়ল এই রাজা একসময় তার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। শরীরে যতটুকু শক্তি ছিল, কুকুরগুলোর সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে, তাদের ধারাল দাঁত এবং থাবার আঘাত উপেক্ষা করে সে ছুটে গেল রাজার কাছে। একটা থাবা রাখল রাজার ঘোড়ার রেকাবে এবং রাজার পায়ের ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। খ্যাকখ্যাক করতে করতে তেড়ে এল হাউণ্ড বাহিনী। রাজা চাবুক মেরে ওগুলোকে সরিয়ে দিলেন। ভৃত্যদের আদেশ দিলেন কুকুরগুলোকে বেঁধে রাখতে।
এই বেচারী বুনো জন্তুটি আমার কাছে দয়া ভিক্ষা চেয়েছে, বললেন রাজা। ওকে আমি দয়া করব। ওকে আমি ছেড়ে দেব। ও মুক্তভাবে জঙ্গলে চলাফেরা করুক। ঘোড়া নিয়ে ঘুরলেন তিনি। চললেন প্রাসাদে। কিন্তু নেকড়ে তাকে ছেড়ে গেল না। খোঁড়াতে খোঁড়াতে রাজার ঘোড়ার পাশে হাঁটতে লাগল। এভাবে প্রাসাদের ফটক পর্যন্ত চলে এল সে। সবাই দৃশ্যটি দেখে আশ্চর্য।
নেকড়েটি আমার কাছে আশ্রয় চাইছে, বললেন রাজা। আমি ওকে আশ্রয় দেব। সে যতদিন ইচ্ছে আমার প্রাসাদে থাকতে পারবে।
তিনি সবাইকে বলে দিলেন কেউ যেন নেকড়েটির কোনও ক্ষতি করার চেষ্টা না করে। নেকড়ের জন্য প্রতিদিন তাজা মাংসের বন্দোবস্ত করা হলো। নেকড়ে থেকে গেল প্রাসাদে। সে প্রাসাদের কারও কোনও ক্ষতি করে না। সবার সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করে। আর রাজাকে অত্যন্ত ভক্তি করে। রাজা যেখানে যান, তাঁর সঙ্গী হয়। নেকড়ে। দিনের বেলাটা সে রাজার পাশে থাকে, রাতে রাজার পায়ের কাছে ঘুমায়। রাজা তার কুকুর বাহিনীর চেয়েও বেশি ভালোবাসেন এই নেকড়েটিকে।
কিছুদিন পরে রাজা তাঁর রাজ্যের সকল জমিদারকে দাওয়াত দিলেন দরবারে। জমিদারদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করলেন, পেটপুরে শাহী ভোজ খাওয়ালেন। এই জমিদারদের মধ্যে সেই নাইটও ছিল যে ব্যারনের স্ত্রীকে বিয়ে করেছিল। সে যখন তার সহকারীদের নিয়ে দরবারে ঢুকল, রাগে গরগর করে উঠল নেকড়ে, পরক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ল নাইটের গায়ে। তাকে যেন গেঁথে ফেলল মাটির সঙ্গে। আশপাশের লোজন সাহায্যের জন্য এগিয়ে না এলে নেকড়ের কামড়ে সেদিন মারাই যেত নাইট। তারা বহু কষ্টে নেকড়ের কবল থেকে উদ্ধার করল নাইটকে।
রাজা এ দৃশ্য দেখে খুবই অবাক। কারণ এর আগে নেকড়েটিকে কারও ওপর হামলা করতে শোনেননি তিনি, দেখা দূরে থাক। তবে শুধু একবার নয়, অন্তত তিনবার নেকড়ে নাইটের ওপর হামলার চেষ্টা করল। নাইটের বন্ধুরা প্রতিবারই তাকে পিটিয়ে খেদাল। নাইট অথবা নেকড়ে, দুজনের যে কেউ মারাত্মক আহত হতে পারে আশংকা করে রাজা নাইট না যাওয়া পর্যন্ত নেকড়েকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখলেন। নাইট নেকড়েকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে দেখে মনে মনে স্বস্তি পেল। নেকড়েটি হঠাৎ তার উপর কেন এমন খেপে উঠল এর সদুত্তর না পেয়ে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে নিজের প্রাসাদে রওনা হলো সে।
এর কয়েক মাস পরের ঘটনা। রাজা আবার সেই জঙ্গলে শিকারে বেরিয়েছেন। তিনি রাতের বেলা জঙ্গলের ধারে, ব্যারনের প্রাসাদের অদূরে তাঁবু খাটালেন। ব্যারনের সাবেক স্ত্রী নিজের এবং তার নাইট স্বামীর জন্য রাজ-অনুগ্রহ পাবার আশায় পরদিন সকালে ঘোড়ায় চড়ে হাজির হলো রাজার তাঁবুতে। সে রাজার জন্য প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে এসেছে। কিন্তু রাজার কাছে আসামাত্র বিকট গর্জন ছেড়ে তার ওপর হামলে পড়ল নেকড়ে। ভয়ে আর্তনাদ ছাড়ল মহিলা। রাজা চট করে দাঁড়িয়ে গেলেন মহিলার সামনে। ফলে নেকড়ের হামলা ব্যর্থ হলো। রাজা না থাকলে মহিলার লোকজন তক্ষুণি মেরে ফেলত নেকড়েকে। রাজার ভয়ে কিছু বলল না।
রাজা নেকড়েকে জড়িয়ে রাখলেন দুহাতে যাতে সে ছুটে যেতে না পারে। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, এই মহিলা ব্যারনের স্ত্রী ছিল। ব্যারন ছিল আমার বন্ধু। সে হঠাৎ করে কোথায় গায়েব হয়ে গেছে কেউ জানে না। যে নাইটকে আমার নেকড়ে হামলা করেছিল সে এই মহিলার দ্বিতীয় স্বামী। সে এখন আমার বন্ধুর জমিদারি শাসন করছে।
রাজা মহিলা এবং নাইটকে রশি দিয়ে বেঁধে মাটির নিচে একটি ঘরে বন্দি করে রাখলেন। অন্ধকার, শীতল ওই ঘরে না খেয়ে থাকতে থাকতে ভয়ে, দুশ্চিন্তায় মহিলার প্রাণ যায় যায়। অবশেষে নিজের অপরাধ স্বীকার করল সে, বলল ব্যারনের জামাকাপড় কোথায় লুকিয়ে রেখেছে।
রাজা সঙ্গে সঙ্গে ওগুলো নিয়ে আসার হুকুম দিলেন। নেকড়ের সামনে রাখা হলো কাপড়গুলো। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কী ঘটে দেখার জন্য। কিন্তু নেকড়ে শুধু জামাকাপড়ের দিকে তাকিয়েই রইল, নড়াচড়া করল না।
