বুড়ো স্পষ্টতই এই আক্রমণের সামনে হতচকিত৷ আমার আর পরাগের দিকে ইতিউতি তাকাচ্ছে৷ আমার দিকে তাকিয়ে অবশ্য লাভ ছিল না, আমিও একই রকম বিস্ময়বিমূঢ়৷ পরাগ দেখলাম মাথাটা একেবারে বুকের কাছে সেঁটে পায়ের ডান আঙুল দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটছে৷
‘‘কীসের কথা বলছেন বাবু, কিছুই তো বুঝছি না৷’’
সামান্য হাসলেন কাকা, তারপর বললেন, ‘‘ভবতারণের কাছ থেকে সবই শুনেছি দাদামশাই৷ কাল যে পরাগ আর ভবতারণ কাউরীবুড়ির মন্দির থেকে গোলকপুষ্পের লতা তুলে আনতে যাওয়ার প্ল্যান করেছে সেও জানি৷’’
বুড়ো কিছু বলল না, সরু চোখে কাকার দিকে চেয়ে রইল৷
‘‘এতে আপনার সায় আছে দাদামশাই?’’
‘‘আমার সায় থাকা না থাকায় আর কী এসে যায় বলুন৷ আজকালকার বাচ্চা, ওরা কি আর আমার কথা শুনে চলে বাবু?’’
‘‘সে কী! অমন বিপজ্জনক জায়গা, যেখানে গেলে নাকি কেউ বেঁচে ফেরে না, সেখানে আপনার নাতি যাচ্ছে প্রাণ হাতে করে, তাতে আপনার আপত্তি নেই?’’
বুড়ো একটু নড়েচড়ে বসল, শরীরী ভাষায় স্পষ্টতই একটা অস্বস্তির ভাব৷ ‘‘দেখুন বাবু, আপনাকে বরং খুলেই বলি৷ পরাগের একটু টাকার দরকার হয়ে পড়েছে হঠাৎ করে৷ তাই ও ভাবছিল যদি এই মওকায়…’’
‘‘কথাটা কি খুব বিশ্বাসযোগ্য হল দাদামশাই? আপনাদের দেওরিদের তিন-তিনটে জনজাতির এতদিনের বিশ্বাস ভেঙে শুধুমাত্র টাকার জন্য আপনার নাতিকে আপনি সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাইছেন?’’
সবাই চুপ৷ বুড়ো মাথা নীচু করে বসে আছে৷ কাকা সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে৷ বুঝতে পারছি যে একটা মানসিক লড়াই চলছে দুজনের মধ্যে৷
‘‘আমি যদি বলি যে আপনি জানেন আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে পাতরগোঁয়্যাদের গ্রামে কী হয়েছিল, সেটা খুব ভুল বলা হবে কি?’’
ঘন ঘন মাথা নাড়ছে বুড়ো, ‘‘না বাবু, আমি কিছু জানি না, কিচ্ছু জানি না৷’’
‘‘আপনি জানেন যে কাউরীবুড়ি কী অভিশাপ দিয়েছিলেন ওদের৷’’
‘‘না বাবু৷ আমি সত্যিই জানি না৷’’
‘‘আপনি এও জানেন যে ওদের সেই অভিশপ্ত বড়দেওরি ঠিক কী পাপ করেছিলেন৷’’
‘‘না বাবু, আমি…’’
‘‘এবং আমি এও অনুমান করতে পারছি আপনি কেন পরাগকে ওখানে পাঠাতে চাইছেন৷ টাকার জন্য নয়, ও গোলকপুষ্পের লতা তুলে আনতে চাইছে সম্পূর্ণ অন্য একটা কারণে৷’’
‘‘না বাবু, আপনি ঠিক…’’
‘‘যে কাজ আপনারা অনেকদিন ধরে করতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না৷ পারছেন না, কারণ আপনারা এমন একজনকে খুঁজছিলেন যে জানবে ওখানে যাওয়ার আর ফিরে আসার রাস্তাটা কী…’’
‘‘বাবু…বাবু…’’
‘‘আজ ভবতারণ আপনাদের সামনে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে৷ তাই মংকুর মুখে খবর পেয়েই দৌড়ে এসেছিল পরাগ৷ তাই…’’
কাকার কথাটা শেষ হল না, বুড়ো দেখি ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছে৷ পরাগ দৌড়ে এসে না ধরলে হয়তো দাওয়াতে পড়েই যেত লোকটা৷ আমিও ব্যস্তসমস্ত হয়ে এগিয়ে গেলাম ওদিকে৷ একমাত্র কাকাই কিছু করলেন না, শান্ত চোখে দেখতে লাগলেন ব্যাপারটা৷
অবশ্য বেশি কিছু করতে হল না৷ মুখেচোখে একটু জলের ছিটে দিতেই উঠে বসল বুড়ো৷ এখন তার চোখমুখের ভাব পুরো পালটে গেছে৷ চালাকচতুর হাবভাবের বদলে সেখানে এখন একটা হতভম্ব ভাব৷
বুড়ো একটু থিতু হতেই এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসলেন কাকা৷ তারপর শান্ত স্বরে বললেন, ‘‘আমাকে যদি সবকিছু খুলে বলেন দাদামশাই, আমি কথা দিচ্ছি যে কাজ শেষ করার জন্য আপনি পরাগকে ওখানে পাঠাচ্ছেন, আমি সর্বতোভাবে তাতে সাহায্য করব৷’’
বুড়ো খানিকক্ষণ চুপ করে রইল৷ তারপর মুখ তুলে চাইল আকাশের দিকে৷ মেঘলা আকাশ, একটা ভ্যাপসা গুমোট আবহাওয়া চারিপাশে৷ একফোঁটা হাওয়া নেই৷ গাছের একটা পাতা নড়ছে না৷
‘‘সে অনেক পুরোনো গল্প বাবু৷ আজ থেকে অনেক দিন আগেকার… ওই যে বললেন আড়াইশো বছর, ওই আড়াইশো বছর আগেকার কথা৷
পাতরগোঁয়্যাদের বড়দেওরি ছিলেন রাজকুমারী চাংদেওমাই৷ হ্যাঁ, বড়দেওরিকে ওরা রাজকুমারীই বলত৷ ওরা মনে করত বড়দেওরি স্বয়ং কাউরীবুড়ির বংশধর৷
দেওরিদের উপকথা অনুযায়ী ওরা হল জিমো ছাঁয়া, মানে সূর্যদেব আর চন্দ্রদেবীর সন্তান৷ পাতরগোঁয়্যারা বলত কাউরীবুড়ি হচ্ছেন সেই চন্দ্রদেবীর প্রথম কন্যাসন্তান৷ কাউরী মানে কাক৷ লোকে বলত চন্দ্রদেবী অস্তাচলে গেলে প্রথম যে পাখি ডেকে ওঠে সে হচ্ছে কাক৷ কাকেরা চন্দ্রদেবীর প্রতিভূ হয়ে পৃথিবীর দেখাশোনা, রক্ষণাবেক্ষণ করে৷ আর সেই কাকেদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হচ্ছেন কাউরীবুড়ি৷ আর এই কাউরীবুড়ির থেকেই পাতরগোঁয়্যাদের উৎপত্তি৷ কাউরীবুড়ির যে প্রথম সন্তান, সেও ছিল একটি মেয়ে৷ সেই মেয়েই পাতরগোঁয়্যাদের প্রথম বড়দেওরি৷
বড়দেওরিকে ওরা ঈশ্বরের সমান শ্রদ্ধা করত৷ তিনি ছিলেন পাতরগোঁয়্যাদের সব কিছু, তাঁর আদেশই ছিল শেষ কথা৷’’
‘‘প্রথম সন্তান মানে? বড়দেওরিদের আরও সন্তান হত নাকি?’’
‘‘আগে হত৷ তখন বড়দেওরিরা অনেক সন্তানের জন্ম দিতে পারতেন৷ যদিও প্রথম সন্তান সবসময় মেয়েই হত৷ তিনিই হতেন পরের বড়দেওরি৷’’
‘‘সেটা উঠে গেল কবে?’’ প্রশ্ন করলেন কাকা৷
জানা গেল, যবে থেকে ওরা মনে করা শুরু করল বৈধব্য ব্যাপারটা খুব পবিত্র, তবে থেকেই৷ ওরা বিশ্বাস করত যে কাউরীবুড়ি ছিলেন বিধবা, এবং বৈধব্য একটা পবিত্র ব্যাপার৷ এমনকি পাতরগোঁয়্যাদের মেয়েদের মধ্যেও বিধবা হওয়া ব্যাপারটা জাঁকিয়ে বসে৷ তার ওপর ওদের তুকতাকের ব্যাপারটা জুড়ে দিয়ে লোকে বলা শুরু করল যে পাতরগোঁয়্যাদের মেয়েরা বিয়ের পর মন্তর পড়ে তাদের স্বামীদের মেরে ফেলে, জোর করে বিধবা হয়৷ যাতে করে তারা কাউরীবুড়ির আরও প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠে৷
