চোখের ভুলই হবে হয়তো৷ আমি আর ব্যাপারটা নিয়ে বেশি ঘাঁটালাম না৷ মাধুরী আর আমি ভেতরে এসে বসলাম৷
‘‘তারপর? পরের দিন সকালে হঠাৎ করে তোমার জ্বর সেরে যায়, তাই তো?’’ আলোচনাটা যেখানে এসে থেমে গেছিল, ঠিক সেখান থেকেই শুরু করলাম৷
‘‘সেদিন সারারাত ধরে বীভৎস সব স্বপ্ন দেখি, জানেন? প্রতিটা স্বপ্ন এত জ্যান্ত যে আমার এখনও মনে আছে৷ কখনও দেখছি আমাকে ঘিরে মুখে বিচিত্র উল্কি আঁকা উলঙ্গ মানুষের দল, অদ্ভুতভাবে নাচছে৷ আবার কখনও দেখছি আমার সামনে একটা মস্ত বড় হাড়িকাঠ, সেখানে নরবলি হচ্ছে, আর সেই বলির রক্ত আমার দু’পায়ে মাখিয়ে দিচ্ছে কেউ৷ আবার একবার দেখলাম দুপুরবেলা খাঁ খাঁ করা শ্মশানের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, চারিদিকে কোত্থাও কিচ্ছু নেই৷ আর আমার মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে কাকেদের দল৷ মানে সব মিলিয়ে ভয়ংকর আর ভীষণ ভয় ধরানো এক-একটা স্বপ্ন৷’’
আমার মাথাটা টিপটিপ করতে লাগল৷ জ্বর আসবে নাকি?
‘‘ভোরের দিকে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল৷ একটা খুব কষ্টের স্বপ্ন দেখলাম, জানেন? দেখলাম কে যেন আমার পা দুটো বেঁধে জলের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, আর আমি ক্রমেই ছটফট করছি, প্রাণপণে বাঁচতে চাইছি৷ এমন সময় কী করে জানি আমার পা থেকে সেই বাঁধন খুলে গেল, আর আমি প্রাণপণে সাঁতার কেটে ওপরে উঠতে শুরু করলাম৷ উঠতে উঠতে ঠিক যেই আমার মাথাটা জলের ওপর ভেসে উঠল, ঠিক সেই সময় আমার ঘুম ভেঙে গেল৷ দেখি আমার সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে সপসপ করছে৷ বিছানার পাশে একটা মোড়ায় বসে মা জলপট্টি দিচ্ছিলেন বোধহয়৷ তিনি সেখানে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছেন৷ তাঁর হাতদুটো আমার কাঁধে৷ আর আমার সমস্ত জ্বরজারি, শরীর খারাপ, সবই ম্যাজিকের মতো উধাও৷’’
একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম মাধুরীর দিকে৷ মনোবিজ্ঞান নিয়ে এককালে একটু-আধটু জানতে হয়েছিল আমাকে৷ স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে ফ্রয়েড বা ইয়ুং সাহেবের বিস্তারিত গবেষণাও পড়া আছে আমার৷ কিন্তু আমার মন বলছিল সেসব তত্ত্ব দিয়ে এই স্বপ্নগুলো বোঝার চেষ্টা করাটা বৃথা৷ এর পেছনে কোনো গূঢ় রহস্য আছে৷
মাধুরীকে বললাম যে ওর কাহিনির বাকিটা কাল শুনব৷ আজ আর শরীর দিচ্ছে না৷ আজ রাতে যে খাব না, সেটা ও যেন কাকিমাকে বলে দেয়৷
মাধুরী চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘‘আর একটা কথা মনে পড়ে গেল৷’’
‘‘কী?’’
‘‘স্বপ্নের মধ্যে যখন জলের ওপরে উঠে আসছি তখন মনে হল ওই জলের মধ্যেই আমার শরীর ঘিরে যেন আলোর বন্যা বইছে, সেই আলোয় জলের অতলে বহুদূর অবধি দেখা যাচ্ছে৷ নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি, যে জিনিসটা দিয়ে আমার পা দুটো এতক্ষণ বাঁধা ছিল, সেটা খুলে ধীরে ধীরে নীচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে৷ আর সেটা কোনো দড়ি নয়৷’’
‘‘তাহলে? কী সেটা?’’
‘‘ওটা একটা লতা৷ আর তার মাথাটা ছোবল দিতে ওঠা সাপের ফণার মতো৷’’
* * * *
পরের দিন সকালে উঠে শুনি মংকু আসেনি কোন একটা কাজের অজুহাতে৷ আমারও সেদিন আর অন্য কিছু করার ইচ্ছে ছিল না৷ ভাবলাম আজ একটু তিনসুকিয়া শহরটা ঘুরে দেখি৷
বেরিয়েছিলাম কাকুর সাইকেলটা সঙ্গে নিয়ে৷ সবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনের মোড়টা ঘুরেছি, ছেলেটার মুখোমুখি পড়ে গেলাম একেবারে৷
অথচ সদানন্দকাকুর বাড়ির দিকে উঁকিঝুঁকি না মারলে হয়তো ছেলেটাকে লক্ষই করতাম না, পাশ কাটিয়ে চলে যেতাম৷ কারণ প্রথমত ছোকরাকে দেখতে আহামরি কিছু না৷ পরে আছে সাধারণ জামাকাপড়৷ চুল উশকোখুশকো, গালে অনেকদিনের না-কামানো দাড়ি৷ অমন লোক তিনসুকিয়ার রাস্তায় হাজার একটা দেখেছি৷
ছেলেটাকে দেখে সাইকেলের ব্রেক কষলাম জোরে৷ ও বাড়িতে উঁকিঝুঁকি মারার কারণটা কী জানতে হচ্ছে তো৷
সাইকেল থামাতেই ছেলেটা আমার দিকে একঝলক চাইল৷ লক্ষ করলাম যে ছোকরা এখানকার লোক বটে, মুখ-চোখ সেইরকমই৷ আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে ছোকরা উলটোদিকে দিল সোজা দৌড়!
দ্রুত সাইকেলে করে ধাওয়া করেও লাভ হল না৷ একটু এগিয়ে গলির শেষ৷ সেখান থেকে বাঁদিকে ঘুরে দেখি তার টিকিটির চিহ্ন অবধি নেই৷ সে কোথায় মিলিয়ে গেল কে জানে!
আমিও আর ব্যাপারটা নিয়ে বেশি ঘাঁটালাম না৷ হাজার হোক লোক্যাল ছেলে৷ বেশি জানতে গিয়ে যদি কোনো বিপদ হয়? আমি আর মাথা ঘামালাম না, সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম৷
এতালা-বেতালা চালাতে চালাতে দেখি বেংপুখুরির রাস্তা ধরে, দুর্গাবাড়ির পাশ কাটিয়ে তিনসুকিয়া উইমেনস কলেজের কাছে এসে পৌঁছেছি৷ তখন কলেজ শুরু হওয়ার সময়, ছাত্রীরা সবে আসা শুরু করেছে৷ গেটের উলটোদিকে রাস্তার ওপারে সাইকেলের জটলা৷ সেই সাইকেল-তমালরাজির পাশে রয়েছে সদ্য গোঁফ ওঠা ছেলেদের দল৷
সাইকেলটা একবার দাঁড় করালাম আমি৷ আচ্ছা, আজ যদি মাধুরী এই কলেজে এখন পড়তে আসত, আমি কি তাহলে এইভাবেই এইসব ছেলেদের দলে দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করতাম? অপেক্ষা করতাম মাধুরীকে একবার দেখার জন্য?
ভাবনাটা মাথার মধ্যে আসতেই আমি থমকে গেলাম৷ ছি ছি ছি, মাধুরীকে নিয়ে এসব কী ভাবছি আমি! এরকম একটা নোংরা চিন্তা আমার মাথায় এল কী করে? মাধুরী আমার বোনের মতো না? কাকু-কাকিমা আমাকে ভালোবেসে আশ্রয় দিয়েছেন তাঁদের বাড়িতে, তাঁদের একমাত্র কন্যার বিপদে আমার সাহায্য চেয়েছেন, আর আমি তাকে নিয়ে এইসব উলটোপালটা ভাবছি? ছি ছি ছি! আমি কি পাগল হয়ে গেলাম নাকি?
