একটু অস্বাভাবিক গলায় মহুয়া সামনের দিকে আঙুল তুলে একবার শুধু বলল ‘লোকটা।’
আমরা তো সামনে বা আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলাম না। আগেই বলেছি, ছোটবেলা থেকেই আমার আইসাইট খুব শার্প, আমার দেখার ভুল হতেই পারে না। তাছাড়া, দীপাঞ্জনও কিছু খুঁজে পেল না। আমি একটা কড়া করে ধমকই দিলাম মহুয়াকে, কোথায় কে? ভুল দেখছিস নাকি? খানিকক্ষণ চুপ থেকে মহুয়া সেই একই গলায় শুধু একবার বলল, হুঁ।
ঘরে ঢুকে বাথরুমে গেলাম ফ্রেশ হতে। ঢোকার সময়ে দেখি মহুয়া সটান শুয়ে পড়েছে ওর বিছানায়, ডানহাতটা উলটো করে কপালে দিয়ে। সারাদিন অনেক ধকল গেছিল, ফলে স্নানটান করে বাথরুম থেকে বেরোতে আমার দেরিই হল খানিকটা। বেরিয়ে দেখি তখনও মেয়েটা বিছানায় ওভাবেই শুয়ে আছে। আমার একটু সন্দেহ হল, জিগ্যেস করলাম, কী রে মৌ, স্নান করতে যাবি না?
বিন্দুমাত্র না নড়েচড়ে সেই অদ্ভুত গলায় উত্তর দিল মহুয়া, না রে, শরীরটা ভালো লাগছে না।
কাছে গিয়ে ডানহাতের চেটোর উল্টোপিঠটা ওর কপালে রাখলাম। হুঁ যা ভেবেছি তাই, গা’টা বেশ গরম হয়েছে। হতেই পারে, বাড়ির আদুরে মেয়ে, আমার মতো গেছো নাকি, যে সারাদিনের এত পরিশ্রম সইবে?
চোখ বুজে রেখেছিল মহুয়া। জোর করে মাথা থেকে ওর হাত সরিয়ে ডান চোখের নীচের পাতাটা টেনে ধরলাম, আর মোমবাতির অল্প আলোয় ওর চোখদুটো দেখে বেশ খানিকটা চমকে গেলাম। দুটো চোখই বেশ লাল হয়ে আছে!
কী রে, হল টা কী তোর? উদ্বিগ্নস্বরে জিগ্যেস করলাম আমি।
শরীরটা ভালো না রে, সেই অস্বাভাবিক গলায় স্তিমিত ভাবে বলল মহুয়া।
বেশ চিন্তায় পড়া গেল তো, বিদেশেবিভুঁইয়ে এ কী গেরো রে বাবা! সেকালে ওই অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা আজকালকার মতো এতো ভালো ছিল না, চাইলেই চট করে হাসপাতাল নার্সিংহোম অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদি পাওয়া ছিল ভারি মুশকিল। তার ওপর জায়গাটা পুরুলিয়ার একপ্রান্তে অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে, তখনকার দিনের নিরিখে শহুরে সুযোগ সুবিধার বাইরের এলাকা। এখানে কেউ সেরকম অসুস্থ হয়ে পড়া মানে দুর্ঘটের একশেষ।
আমার কাছে ছোটখাটো একটা ফার্স্ট এইড বক্স সবসময় থাকতোই। সেখান থেকে একটা ক্যালপল বার করে রাখলাম ওকে খাওয়াব বলে। মুশকিল হচ্ছে যে খালিপেটে ওষুধটা খাওয়ানো যাবে না। তাই বাইরে বেরিয়ে রেংতার উদ্দেশ্যে একটা হাঁক পাড়লাম, বললাম তাড়াতাড়ি খাবার বেড়ে দিতে। রেংতাও চটপটে লোক, আধঘণ্টার মধ্যে খাবার সার্ভ করে দিল। এই এতক্ষণ ধরে কিন্তু মহুয়া কিচ্ছুটি বলেনি, সেই যেরকম ছিল, সেইরকমভাবে মাথায় হাত দিয়ে শুয়ে রইল।
সেই রাতে মহুয়া খেয়েওছিল খুব অল্প। আমরা ভাবলাম বুঝি সন্ধেবেলা অতটা ঘুগনি খেয়েছে বলে ক্ষিদে নেই। সে যাই হোক, রেংতার বানানো ঝালঝাল ডিমের ঝোল আর ভাত খেয়ে যখন আঁচিয়ে উঠলাম, তখনই বাজে প্রায় রাত দশটা। সেরাতে শীত পড়েছিল জব্বর, দিব্যি ঠান্ডা ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছিল। আমরা খেয়ে দেয়ে চাদর টাদর জড়িয়ে বাংলোর সামনের বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছি। তার একটু পরেই একটা ঘটনা ঘটে যা ওই শীতের রাতেও আমাদের ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল।’
এতটা বলে পিসি আমাদের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে নিল একবার। দেখি পিসির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছে।
‘আমরা বসে বসে গল্প করছি, মানে আমি, মহুয়া, দীপাঞ্জন আর রেংতা। কথা অবশ্য আমরা তিনজনেই বলছি, মহুয়া চুপ করে বসে ঝিমোচ্ছে। একটা ক্যালপল খাইয়ে দিয়েছি ওকে, আজকের রাতটার মতো নিশ্চিন্দি। দীপাঞ্জনকে বলে রেখেছি যে পরেরদিন সকালে মংলাদা এলে বরাভূম স্টেশনের বাজারে গিয়ে থার্মোমিটার কিনে আনতে। বেশি বাড়াবাড়ি হলে সোজা কলকাতা নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় কী? এ এলাকায় ডাক্তার পাওয়া আর ভগবান পাওয়া প্রায় একই ব্যাপার।
জানি না আগে বলেছি কি না, বারান্দায় এক কোনায় একটা দোলনা ছিল। শালকাঠের তৈরি মজবুত জিনিস, মোটা দড়ি দিয়ে বারান্দার সিলিঙে বাঁধা। দোলনাটা বারান্দার যেদিকে ছিল, তার উল্টোদিকে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম আমরা। আলোটালো সব নিভিয়ে দিতে বলেছি, ফলে সামনের দিকটায় চমৎকার একটা সিনারি তৈরি হয়েছে। আকাশে একটুখানি বাঁকা চাঁদ। তার অল্প আলোয়, আবছায়া আর অন্ধকারে বাংলোর সামনেটা ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়ার সঙ্গে বুনো ফুলের সুবাস ভেসে আসছে, আর ভেসে আসছে রাতের জঙ্গলের শব্দ। এদিকে বাতাসে শীতের কামড় ক্রমেই বেড়ে উঠছিল। আমাদের প্রত্যেকের গায়ে মোটা চাদর, আমি আর দীপাঞ্জন প্রায় গুটিসুটি মেরে বসে আছি, বেশ একটা ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশ। রেংতা ওদের গ্রামের কথা বলছিল, ওর ছেলেবেলার গল্প শোনাচ্ছিল আমাদের। আমরা বুঁদ হয়ে সেসব শুনছিলাম, মহুয়া একদিকে চুপচাপ বসেছিল।
ওদের গ্রামের নিশিতে পাওয়া লোক, ডাইনি ইত্যাদি নিয়ে নানারকম ভয়ধরানো গল্প বলছিল রেংতা। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে একবার চুপ করে গেল ও, ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে বাইরের মেন গেটের দিকে তাকিয়ে রইল। আমরা একটু অবাকই হলাম, আমি বললাম, কী হল গো রেংতা, চুপ করে গেলে যে?
রেংতা সামান্য ভয় পাওয়া গলায় বলল, উট্যা কে বট্যে?
