সময়কালে গ্রামে কথকতার পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপ্তি উদ্ধৃতাংশের ছত্রে ছত্রে ধরা পড়ে। সে রকম কিছু না জুটলে কলকাতা শহরে কথকরা নিজেরাই বসে যেতেন এবং শ্রোতা সমাগমও হত। কথকতার রসজ্ঞ যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি তাঁর একটি অভিজ্ঞতা এইভাবে লিখেছেন,
সাত আট বছর পূর্বে একবার কলিকাতায় কয়েকমাস ছিলাম, বৈকালে গোলদীঘিতে বেড়াতে যেতাম। দেখতাম দীঘির দক্ষিণ পাড়ের মণ্ডপে একটি লোক কি বলত, বিশ পঁচিশজন একমনে শুনত। কথক কৃষ্ণবর্ণ, কিঞ্চিৎ স্থূলকায়, চল্লিশ পঁয়াল্লিশ বৎসর বয়স। গা খোলা, উড়ানী কখনও কোলে, কখনও ভূমিতে পড়ত। দক্ষিণবাহু কখনও প্রসারিত, কখনও বক্ষলগ্ন; স্বর কখনও উদাত্ত কখনও অনুদাত্ত হ’ত। লোকটির দেবদত্ত শক্তি ছিল, নইলে এতগুলি লোক প্রত্যহ শুনতে আসত না।৪২
বিংশ শতকে যানবাহনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে কথকের চাহিদা অঞ্চলে আবদ্ধ নেই। আসরের ডাক দূর-দূরান্ত থেকে আসে। প্রয়াত ফেলারাম বন্দ্যোপাধায় ‘বাংলা বিহার উড়িষ্যা, অধুনা বাংলাদেশ, আসাম, উত্তরপ্রদেশ’ প্রভৃতি এলাকায় রামায়ণী কথকতা করেছেন। অধুনা তাঁর পুত্র দ্বিজরাজ বন্দ্যেপাধ্যায়ের ভৌগোলিক পরিক্রমা একই ধরনের। গত জুন মাসে, (১৯৯৩) এক মাস ধরে উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জের রাজালোকায় শ্রীশচন্দ্র দাসের বাড়িতে দ্বিজবাবু কথকতা করেছেন; সভায় মাইক ছিল, আসরে সহস্রাধিক লোক হত। বাসন্তী দেবী বিদেশেও পাঠ করেন। প্রবাসী বাঙালিরা সাধারণত আসর বসায়। আবার ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে নিউ-আলিপুরের এন-ব্লক-এ রঙিন পোস্টার দেখা যায়। লন্ডননিবাসী বিশ্ববিখ্যাত ‘যুবমানস প্রবক্তা’ শ্রীকিরীট ভাই কলকাতায় ‘সঙ্গীতময় ভাগবত প্রবচনের’ অনুষ্ঠান করবেন। প্রচার মাধ্যম ও সময়ের সঙ্গে সবাইকে মানিয়ে নিতে হয়।
১৮৩৪ সালে কার্তিক মাসে বীরভূমে কথকতায় আয় কীরকম হত? বীরভূমে প্রাপ্ত একটি জমাখরচের হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে কথকের আয় নিজস্ব এক টাকা এক আনা।৪৩ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পাদ্রি রেভারেন্ড জেমস লং কথকদের স্মৃতিশক্তি ও বলার ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন।৪৪ সেই প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন যে দক্ষ কথকদের কয়েকজন মাসে ৫০০্ আয় করতেন। কোনও কোনও ঋতুতে কেউ কেউ ২০০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করেছেন। এঁদের মধ্যে দু-একজন কোনও বাড়ির বাঁধা কথক হয়ে থাকতেন। ঘরে জনা পঞ্চাশেক মহিলাকে দৈনিক দুঘণ্টা কথা শোনাবার জন্য কলকাতার এক জন ধনী লোক কথক নিযুক্ত করেছিলেন। কথকতার জনপ্রিয়তা এই সময় তুঙ্গে উঠেছিল। বিংশ শতকের গোড়ায় বাঁকুড়ায় যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মা গ্রামে নারায়ণী কথকতার আসর দিয়েছিলেন। তিন ক্রোশ দূর থেকে কথক ঠাকুর শিষ্য নিয়ে এসেছিলেন; ওই অঞ্চলের নামকরা কথক। এক মাস পাঠ চলেছিল, ৩০০্ দক্ষিণা নিয়েছিলেন।৪৫ ১৩১১-১২ সনে ১৩ ফাল্গুন থেকে বৈশাখ পর্যন্ত কবিরাজপুরে পার্বতীচরণ রায়ের স্ত্রী বগলাসুন্দরী দেবী মহাভারত পাঠ ও কথকতার আসর বসান। পাঠক ছিলেন হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ ও কথক ছিলেন তাঁর কাকা জানকীনাথ শিরোমণি। পাঠ ও কথকতা বাবদ তাঁদের প্রাপ্তি হরিদাসবাবুর হিসাবের খাতা থেকে উদ্ধৃত করা যাক।৪৬
পূর্ব সনের ১৭ ফাল্গুন ৫্
৭ চৈত্র ২০্
মোট ২৫্
১১ বৈশাখ লক্ষ্মী বাটি আসিবার কালে তাহার মাং ২৫্
২ জৈষ্ঠ খুড়া বাটি আসিবার কালে তাহার মাং ২্
৫ জৈষ্ঠ্য মহাভারতের দক্ষিণাদি ১১০্
সোনা একভরি সাড়ে ছয় আনা (মুং অং) ৩৪॥০
শাল এক জোড়া (মুং অং) ২০্
গরদ এক থান ঐ ৪্
চেলির জোড়া ১টা, ,, ৪্
চেলির সাড়ি ১ খানা ,, ৩্
কাঁসার বাটি ৭টা (মুং অং) ৩॥০
পিতলের ঘটি ৩টা ,, ১॥০
কাঁসার থাল ১ খানা , ২॥০
সূতার কাপড় মোট ,, ২৫্
সংসারে পিতৃঠাকুরের নিকট দত্ত মোট— ২৫০্
মাং = মারফত, বাং = বাবদ, মুং অং = মূল অনুমান
আসলে আয় দুই রকমের। কথকতা বা গানের জন্য যজমানের কাছে বরাদ্দ দক্ষিণা ও আসরে পাওয়া প্রণামী। রামায়ণী গান দলবদ্ধ; রামায়ণী কথকতা একক কিন্তু দক্ষিণাদির বন্দোবস্ত একই রকম ছিল। কলকাতার পুরনো এক বাসিন্দা লিখছেন, ‘তখন [উনিশ শতকের শেষপাদে] মধ্যবিত্ত গৃহস্থ বা গরীবগুরবো যাদের বাড়িতে একটু উঠান আছে তাঁরাই বাড়ীতে রামায়ণ গান দিতেন।’ এর জন্য বন্দোবস্তের নাম ছিল ‘মালা নাবানী’, অবস্থা বিশেষে তা হতে পারত ‘পাঁচ টাকা থেকে পনের টাকা পর্যন্ত।’
মালা নাবানী ব্যাপারটা হ’ল, কথক ঠাকুর জামাকাপড় ছেড়ে গলায় পৈতে বার করে বেগুনী রংয়ের বেনারসী জোড়, গলায় চাদর, খালি গায়ে বসলেন, যিনি গান দিয়েছেন তিনি এসে কথক ঠাকুরের গলায় এক ছড়া গোড়ে মালা পরিয়ে দিলেন। গান শেষ হলে তার গলা থেকে মালা ছড়াটা খুলে নিয়ে চুক্তি মোতাবেক টাকা দিয়ে দেবেন। কথক ঠাকুর তখন হাতের চামরটা কর্তার মাথায় বার তিনেক ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করলেন। শ্রোতারা গান শুনে যে প্যালা কথক ঠাকুরের থালায় দিয়েছেন, সেটা তাঁর উপরি প্রাপ্য। যদি কেউ সিদে দিয়ে থাকেন সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে নয়।
এই প্যালা দেওয়া আসরের অপরিহার্য অঙ্গ। প্যালা না দিলে, না নিলে কোনও কথকতার আসর সিদ্ধ হয় না।
