এই পাঠেও বক্তার নিজস্ব বিন্যাস আছে, ক্রম তিনিও অনুসরণ করেছেন। কিন্তু স্বর গীতি বা নাটিকার প্রবন্ধে গ্রন্থনা নেই, বরং তত্ত্ব প্রচারের বন্ধনে আবদ্ধ।
আসলে পাঠক ও কথকের মধ্যে, তত্ত্ব বিন্যাস ও গল্পের দাবির মধ্যে টানাটানি, কামড়াকামড়ি আছে। রামধনের জীবনের দুটি প্রচলিত কাহিনীতে এই টানাপোড়েন সুস্পষ্ট। পাঠক বা পণ্ডিতরা যে জনপ্রিয় কথকদের সবসময় খুব পাত্তা দিতেন, তা নয়। প্রচলিত লোক কাহিনী অনুসারে রামধনের জীবনে এই রকম অভিজ্ঞতা বার বার হয়েছে। ঊনিশ শতকের ধনিয়াখালি ছিল পাঠক ও কথকদের বড় আড্ডা। এক সভায় এক দিন রামধন বেদিতে বসে ভাগবত ব্যাখ্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ‘পাঠক মহাশয় প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিলেন যে কথকতা করাই কথকের কর্তব্য; কথক কর্তৃক ভাগবত ব্যাখ্যা করিবার প্রয়োজন নাই।’ সে দিনের শাস্ত্র আলোচনায় পরাস্ত রামধন কাশীতে বেদ ও বেদান্ত অধ্যয়ন করে তাঁর জ্ঞানের খামতি পূর্ণ করেন। আবার আর একবার রামধনের কথকতা শুনে ভট্টপল্লীবাসী পণ্ডিতগণ ‘রামধন লেখাপড়ায় জল দিয়াছেন বলিয়া ব্যঙ্গ করেন।’ প্রত্যুত্তরে রামধন সংস্কৃতে আলোচনা শুরু করেন। পুরুষরা তুষ্ট হলেও মেয়েরা এক বর্ণ কিছু বুঝল না। ‘তখন রামধন পুনরায় সাধুভাষায় কথা কহিয়া ভট্টপল্লীবাসিনী বামাগণকে পরিতৃপ্ত করিয়া স্বকীয় বাসভবনে প্রত্যাগত হইলেন।’২৮
কথকতা আখ্যানমূলক। কথাকাহিনী ও সঙ্গীতে বিধৃত পাঠে এই সব থাকতে পারে কিন্তু তা বিধিমার্গে আবদ্ধ, তত্ত্ব আলোচনা ও সমস্যা নিরসন পাঠকের উদ্দেশ্য। পাঠ একটি ওজনে বাঁধা, সেখানে হালকা হবার জো নেই। কথকতা এবং পাঠে নিজস্ব বিন্যাস বিংশ শতকে সবাই করেন কিন্তু স্বর ও কাঠামোতে থেকে যায় বেশ কিছু ফারাক। প্রকরণ বিচারের সময় এই শাস্ত্রে আবার ফিরে আসব।
২ কথকতার পেশা: পোষ্টা ও প্রণামী
কীর্তন বা রামায়ণী গানের দল থাকে, কথক বা পাঠক একই অনুষ্ঠান জমান। কিন্তু দুটোই পেশা, দুটোর জন্য প্রতিযোগিতা আছে, দুটোর পোষ্টা দরকার। সমাজের অবয়বে রদবদলের সঙ্গে সঙ্গে পোষ্টাও বদলে যায়। জমিদার পরিবাররা কথকদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিল। কিছু কিছু জমিদারিরবাড়ির বাঁধা কথক ও পাঠক থাকত। বিক্রমপুরের তেলিরবাগের ভূঁইঞারা যখন বসতি স্থাপন করেছিলেন তখন ‘বৃত্তি’ বা চাকরান জমি দিয়ে গ্রামে লোক বসিয়েছিলেন—যেমন, নাপিত, ধোপা, ভূঁইমালি ইত্যাদি। এদের সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছিল সংস্কৃতজ্ঞ গোলকচন্দ্র চক্রবর্তীকে। বাবুদের বাড়িতে কথকতা ও পাঠ করা তাঁর কাজ। গ্রামে তাঁর ভিটাকে সবাই পাঠবাড়ি বলত। রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে বরানগর থেকে আসতেন যুবক নারায়ণদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, কথকতা ছিল তাঁর পেশা। সেই সূত্রে বেলঘরিয়ার জয়নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে দেবোত্তর জমি দেন এবং বরানগরের কুঠিঘাটে তাঁর বসতবাটি সেই ভূখণ্ডের উপরে আজও আছে।২৯ হুগলির রাধানগরের জমিদার তীর্থভ্রমণ প্রণেতা যদুনাথ সর্বাধিকারীর প্রত্যেকদিন সান্ধ্য আসরে নিয়মিত হাজিরা দিতেন গ্রামের পাঠক ও কথক গোপাল চূড়ামণি। প্রত্যেকদিন অনেক রাত্রি পর্যন্ত ভাগবতের পাঠ হত। কিন্তু কার্তিক মাসে বিশেষ উৎসব উপলক্ষে গোঁসাই মালপাড়া গ্রাম থেকে একজন গোস্বামী আসতেন। ঠাকুর দালানে সমস্ত কার্তিক মাস ধরে সকালে ভাগবত পাঠ ও ব্যাখ্যা এবং অপরাহ্নে কথকতা হত। জমিদার বাড়িতে এই সময় পাঠ করার জন্য তাঁর আসর বাঁধা থাকত।৩০ কথা ব্যবসায়ী হিসাবে ঢাকা জেলার সাভার নিবাসী ভারতচন্দ্র রায় ত্রিপুরার রাজসভায় নিয়োজিত ছিলেন। তার মাসিক বেতন ছিল ৬০্। তবে দীনেশচন্দ্র সেনের বর্ণনা থেকে মনে হয় যে ভারতচন্দ্র ঠিক কথক নয়, গল্প বলিয়ে ছিলেন।৩১ লক্ষ করার বিষয়, ছেলের গানের খ্যাতির খবর শোভাবাজারের রাজবাড়িতে অনুষ্ঠিত এক কথকতার আসরে নিধুবাবুর মা শুনেছিলেন।৩২ নানা উপলক্ষে এই রকম আসর বসত। শ্রাদ্ধ ইত্যাদি দশকর্মাদিও উপলক্ষ হতে পারত, তীর্থভ্রমণ সমাপ্তি শেষেও গিন্নিমা আসর বসাতে পারতেন। আবার ব্রত উদযাপন সংকল্পে ও পারিবারিক বিপর্যয়ে মনে শান্তি পাবার জন্য কথকদের ডাকা হত। কথকরা আসতেন। দোল, রাস ইত্যাদি বাৎসরিক উৎসবেও কথকদের ডাক পড়ত। তবে পুরাণ পাঠ ও কথকতার নাকি উৎকৃষ্ট সময় ছিল অন্তৰ্জলি যাত্রা। মৃত্যুর প্রাকমুহূর্তে শুকদেব পরীক্ষিৎকে ভাগবত পাঠ ও ব্যাখ্যা করে শুনিয়েছিলেন। তাই কৃষ্ণমোহন শিরোমণি বা কৃষ্ণহরি কথক গঙ্গাতটে ওইরকম কথকতার আসরে দানগ্রহণ পর্যন্ত করতেন না।৩৩
সময়মাফিক আসর নানা রকম হতে পারত: বৈঠকী আসর, একদিনের কথা বা মাসাধিক পাঠ। আয়োজন বা দক্ষিণাও সেই অনুযায়ী হত। কথকদের অবশ্য আসর পাবার জন্য চুক্তি করতে হত, চুক্তির খেলাপ হলে আসর হাত ছাড়া হবার সম্ভাবনা ছিল। তাই ‘দেহকৃৎ ঠাকুরকে’ (পিতাকে) বীরভূমের সেবক ঈশ্বরচন্দ্র দেবশর্মা লিখছেন—
সাঁখপুর হইতে মনুষ্য আসিতেছে ৪ রোজ জৈষ্ঠ না জয়া হইলে জবাব হইবে দ্বিতীয় কথক আসিবে অতএব ৩ রোজ জৈষ্ঠ সাঁখপুরে মোকাম জাইতে হইবেক জানিবেন…পুনুছ নিবেদন কুনুক মোতে ওজর না হয় তাহা করিবেন সে স্থানেতে দিন দুয় কথা কহিয়ে আসিবেন য়াধিক কি লিখিব।৩৪
