রাষ্ট্রের জুলুম—এই গুজবগুলির একটি অন্যতম বিষয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অধার্মিক ইংরেজের অনাচারের কথা। রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে কীভাবে মানুষ বুঝতেন আধি-ব্যাধির অভিজ্ঞতাকে? ঔপনিবেশিক ও আধুনিক রাষ্ট্র সংক্রামক-ব্যাধির যে মানে করতেন, তার বাইরে নিম্নবর্গের জীবনে কী ‘মানে’ হত দুর্দৈবের?
দুর্দৈব ও সমাজ
শীতলাপুজোর ব্যাখ্যায় একটি অনুধাবন-যোগ্য কথা বলেছেন নিকোলাস—‘ক্যালামিটি’ থেকে ‘কমিউনিটি’। কমিউনিটি’র বাংলা যদি ‘গোষ্ঠী’ বা ‘সমাজ’ করি (অর্থাৎ ‘সমাজ’ কথাটির যে-অর্থে আমরা বাংলায় ‘সমাজচ্যুত’ কথাটা ব্যবহার করি), তাহলে বলা যায় শীতলাপুজোয়, ওলাবিবির বা ওলাইচণ্ডীর উপাখ্যানে বা দক্ষিণাংশে মারিআম্মার কাহিনীতে এমন একটি মানসিকতার সাক্ষাৎ পাচ্ছি, যা কোনও দুর্দৈবকে সমস্ত সমাজের সমস্যা বলে গণ্য করে। ফলে এইসব দেবীদের পুজো-আর্চায় এমন সব পদ্ধতি ও আচার অন্তর্ভুক্ত হত যা সামাজিক বন্ধনেরই পরিচয় দেয়, ও যা পালন করতে গিয়ে একটি গোষ্ঠী তার অন্তির্নিহিত যূথবদ্ধ চরিত্রই আবার নতুন করে অনুভব করত, একেই নিকোলাস বলেছেন ‘দুর্দৈবকে সমাজে পরিণত করা’। অসুখ কারুর একার নয়, কারণ ব্যক্তির তার শরীরের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানাস্বত্ব নেই, আমার শরীরের বসন্তগুটিকায় লেখা আছে আমার সমাজ বা গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ, সেই অর্থে ব্যক্তির শরীরও সামাজিক বা গোষ্ঠীগত—এই রকম একটা মনোভাব।
উদাহরণ অজস্র। বোম্বাই-এর প্লেগের সময় আবির্ভাব হয়েছিল এক প্লেগমাতার। তার নাম ছিল ‘বোম্বাই কি মায়ান’ ও তাঁর পুজো হত শীতলা মন্দিরে।২৬ পঞ্জাবের গ্রামে প্লেগের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে একটি সরকারি রিপোর্ট উদ্ধৃত করেছেন ক্যাটান্যাক, তার অংশবিশেষ তুলে দিচ্ছি:
যখনই প্লেগের আশংকা করা হয়, তখনই ধার্মিক অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু হয়। একজন গ্রন্থীকে নিয়োজিত করা হয়…গ্রন্থ-পড়ার জন্য; ‘হওয়ন’-এর ব্যবস্থা করা হয় উন্মুক্তভাবে। গ্রামের মসজিদে সাধারণভাবে প্রার্থনা করা হয়; কঠোর পরিশ্রমে খোঁড়া হয় পুষ্করিণী; দরিদ্র-ভভাজনের আয়োজন করা হয়; নিম্নস্তরের দেবতা-দানোরাও বাদ যান না; ফকিরদের ডেকে ভূরি-ভোজন করানো হয় তাদের কেরামতির আশায়; আর গোটা গ্রামের চারপাশে বেড়া পড়ে, তার ওপরে খোদাই করা থাকে দানোদের মুণ্ডু, গ্রামের অতিপ্রাকৃত পাহারাদার হিসেবে।২৭
হেনরি হোয়াইটহেড-রচিত দক্ষিণ ভারতের গ্রামীণ দেবদেবী বিষয়ক যে বইটি আছে, তাতেও মড়ক-মহামারির মোকাবিলায় এই গ্রামীণ সমাজ বা গোষ্ঠী-ভাবনার প্রকাশ খুবই চোখে পড়ে। তামিল দেশের বসন্ত রোগের দেবী মারিআম্মার (বা দক্ষিণ আরকটের ক্ষেত্রে কান্নিআম্মার) পুজোয় এর প্রমাণ আছে। ত্রিচির কলেরা-দেবীর পূজায় গ্রামের সমস্ত পরিবার অংশগ্রহণ করেন ও পূজার পর পূজার উপকরণাদি একটি ঘটে ভরে গ্রামের সীমান্তে রেখে দিয়ে মনে করা হয় রোগ এখন গ্রামের বাইরে চালা হল।২৮ এইভাবে নানাগ্রামে ঘুরতে ঘুরতে দেবীর প্রকোপ দুরে সরে যায়। তেলেগুদেশে মাসুলিপটমের নিকটবর্তী গুটিভড়া গ্রামেও হোয়াইটহেড সাহেব অনুরূপ গ্রামীণ আচারের বর্ণনা দিয়েছেন। কর্ণাটকের বেল্লারি পরগনায় কলেরা প্রাদুর্ভাবে যে পূজা ও অন্যান্য আচারের বর্ণনা পাই, তাতেও গ্রামীণ সমাজের ‘গোষ্ঠী’গত মনোভাব ও গ্রামভেদের ছবিই পাওয়া যায়।২৯ সম্প্রতি ডেভিড হার্ডিম্যানের গ্রন্থে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে কোঙ্কনস্থ অঞ্চলে ১৯২০-২১ সালে বসন্ত রোগের আবির্ভাব ও সেই প্রসঙ্গে বসন্তদেবী ‘বায়া’ মাতা-পুজার বর্ণনা আছে। তাতেও রোগ চালাবার কথা পাই গ্রামের সীমান্ত ধরে ধরে।৩০
বলাবাহুল্য, এই যে ‘গোষ্ঠী বা ‘সমাজ’ যার পুনর্জন্ম হয় দুর্দৈবের মুখোমুখি, তার ভৌগোলিক প্রসার অনেক সময়ই খুব বিস্তৃত নয়। প্রায়শঃই দেখা যাচ্ছে একটি গ্রামের সীমা দ্বারাই এই ‘সামাজিকতা’ সীমিত। অতি সাম্প্রতিককালে এর সাক্ষ্য পাই নিকোলাসের গবেষণায়। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন:
সমুদ্র-উপকূলবর্তী দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গে আজ শীতলাই সর্বাধিক প্রচলিত গ্রামদেবতা। প্রায়শই মনসার পাশে তাঁকে পাওয়া যায়, কিন্তু যেখানে দুজনকেই একসাথে পেয়েছি, সেখানে আমার অভিজ্ঞতায়—শীতলারই প্রাধান্য।…শীতলা পূজার বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই ধারণাটি পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত হয় যে কোনও একটি বিশেষ গ্রামই তাঁর পূজার ফলাফলের অধিকারী। এটা কখনও দেখানো হয় পূজারীদের একটি মিছিল নিয়ে সারা গ্রামটিকে প্রদক্ষিণ করে, বা গ্রামের সীমান্তপথ ধরে নিয়ে নিশানা পুঁতে পুঁতে, অথবা পুজোর শুরুতেই অন্যে কোনও পদ্ধতি দ্বারা গ্রামটিকে [প্রতীকীভাবে] ঘিরে ফেলে।…পূর্ব মেদিনীপুরে কোনও বিশেষ গ্রামের শীতলাকে সাধারণত ‘অমুক গ্রামের মা’ বলেই অভিহিত করা হয়। ‘শীতলা’ নামটি চালু হয় পুজোর সময়টুকুতেই।৩১
এই গোষ্ঠীগত মনোভাবের কথা বলা মানে এই নয় যে গ্রামের দলাদলি ও অন্যান্য কলহ-দ্বন্দ্বের কথা ভুলে যাওয়া। বসন্ত-মহামারি বা শীতলাপূজা উপলক্ষে কীভাবে ‘সমাজ’ তার সামাজিকতা পুনরানুভব করে তারও সুন্দর বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করছেন। নিকোলস। শীতলাপূজায় শীতলার পালা অভিনয় হয়, তার খরচা দেন গ্রামের সমস্ত পরিবার। অন্তত গ্রামের মানুষদের ধারণা এই চাঁদা দেবার সদিচ্ছা বা অনিচ্ছার সঙ্গে গ্রামের জাগতিক ও নৈতিক সুখস্বাচ্ছন্দ্যের একটি নিগূঢ় সম্পর্ক আছে। দলাদলি ও নানা দৈনন্দিন কোন্দলবিধ্বস্ত এই গ্রামীণ সমাজে নৈতিক সমৃদ্ধির অর্থ দলাদলিমুক্ত মনোভাব, যা প্রাত্যহিকে অবশ্যই অনুপস্থিত। নিকোলাস লিখেছেন:
