এর ‘কারণ’ ছিল বিবিধ। একটি নিশ্চয়ই খরচা-সম্পর্কিত। ভারতীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপের ভয়ও ছিল। তা ছাড়া ছিল এই বদ্ধমূল বিশ্বাস যে, ব্রিটিশজীবন ভারতীয় সাধারণ মানুষের জীবনের চাইতে মূল্যবান। এই বিশ্বাস ব্রিটিশের ভারতে অনুসৃত ‘জনস্বাস্থ্য’ নীতিকে শহরমুখীও করে তোলে। এমনকী বিশ শতকেও গ্রামাঞ্চলে ম্যালেরিয়া-বিষয়ক যে অনীহা ছিল, তা সম্প্রতি গবেষণা করে দেখিয়েছেন তামিলনাড়ুর ঐতিহাসিক ডি. আর. মুরলীধরণ।১৩
মোট কথা, ঔপনিবেশিক সরকার আধুনিক রাষ্ট্রের একটি শর্তপালনে অক্ষম ছিল। সব শরীরই এক, সকলে ব্যক্তিগতভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’ ব্যবস্থা নিলে তবেই ‘জনস্বাস্থ্য’র বিকাশ হবে, সকল গৃহেরই পরিমার্জনা প্রয়োজন—ব্যক্তিগত শরীর-গৃহ-জনস্বাস্থ্য এই তিনের সমীকরণের যে-নীতির বিকাশ আমরা ইংল্যান্ডে দেখতে পাই, তা ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষে পুরোদস্তুর পালন করেনি। এককভাবে ভারতীয় শরীরগুলো দুর্বল হোক, অল্পায়ু হোক, তাতে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বা পুঁজির কিছু এসে যেত না তেমন। এমন কী শিল্পায়নও এমনও ধরনের হয়েছিল যে শ্রমিক-শরীরের ব্যক্তিগত পুষ্টির প্রতি নজর দেবার বিশেষ প্রয়োজন বোধ হত না। বাংলা পাটশিল্পের আলোচনায় আমি অন্যত্র দেখাবার প্রয়াস পেয়েছি যে ‘সংক্রামক ব্যাধি’ নিয়ন্ত্রণই ছিল চটকলগুলোর স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য।১৪ ভয়ের কারণ ছিল ভারতীয় শরীরের একত্রীকরণ। তার সংস্পর্শ বাঁচিয়ে চললেই ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় শরীর ‘নীরোগ’ থাকবে—এই নীতির ব্যতিক্রম কিন্তু সময় সময় বড় শহরগুলোতে করতেই হত। যদিচ শ্বেতাঙ্গপাড়া ও নেটিপাড়া আলাদা করা ছিল, সংক্রামক ব্যাধি এলে তা কেবল গরিব, শ্রমজীবী মানুষের বস্তিতেই আটকে থাকবে এমন তো কোনও কথা ছিল না। ১৮৯৮ সালে বোম্বাই নগরীতে সরকারের প্লেগ-দমননীতির বিরুদ্ধে যেসব দাঙ্গা হয়, তার ইতিহাসে কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের দোমনা ভাবটিই বেরিয়ে আসে। এক দিকে তখন শহরের শ্রমিক-অঞ্চলে রাষ্ট্রের জোরাল অনুপ্রবেশ ছাড়া উপায় নেই। ‘ভারতীয়’ শরীরকে চিকিৎসাধীন না করতে পারলে ‘ইউরোপীয়’ জীবনের আশঙ্কা বাড়বে। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক সরকারের ভয় ‘ধর্ম’ নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে যদি আবার ১৮৫৭ ফিরে আসে!
জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব সরকারি সমালোচনা করেছিলেন—সে প্রসঙ্গে আমরা পরে ফিরে আসব। কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার: ‘জনস্বাস্থ্য’ বা ‘পরিবেশ’-এর প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদীর রাষ্ট্রের নীতি ছিল ‘মিনিমালিস্ট’, রাষ্ট্রশক্তির নিজস্ব বাঁচার প্রয়োজনে ন্যূনতম যা করার ছিল তা-ই তাঁরা করতেন। ভারতের আধুনিক রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের এটাই ইতিহাস। এই ইতিহাসে ষদি স্বাস্থ্য ও শাসনের প্রশ্ন দুটিকে পরস্পর সম্পৃক্ত অবস্থায় দেখি, তাকে আকস্মিক বা সন্নিপাতিক বলে ধরে নেবার কোনও কারণ নেই। ইতিহাসের পাঠকমাত্রেই জানেন যে অনেক সম্পর্কই তার জন্মলগ্নের ইতিহাসে উলঙ্গভাবে ধরা পড়ে, কালক্রমে অভ্যাসের আস্তরণ পড়ে মূলসূত্রটিই অনেক সময় লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যায়। মিশেল ফুকোর কথাই ভাবুন। বর্তমান সমাজে ক্ষমতার বন্টন ও ব্যবহার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তাঁকে রচনা করতে হয় কয়েদখানা, পাগলাগারদ বা চিকিৎসাগারের ‘জন্ম’বৃত্তান্ত। সেই রকম ভারতের স্বাধীন রাষ্ট্র ও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অনেক ফারাক থাকলেও, আমাদের দেশে আধুনিক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ঔপনিবেশিক সময়ে, তাই বর্তমান শাসনব্যবস্থার অনেক অনুচ্চারিত সত্য তার জন্মের ইতিহাসে—অর্থাৎ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ইতিহাসে—অনেক নির্লজ্জভাবে প্রকাশিত।
রাষ্ট্র, সমাজ, মহামারি ও জনমানস
অসুস্থতা, ব্যাধি, সংক্রামকব্যাধি—এরা মনুষ্য-সভ্যতার চিরন্তন সঙ্গী। সব সমাজেই এরা আছে, সব সমাজকেই এদের নিয়ে ভাবতে হয়, কিন্তু সব সমাজে বা ইতিহাসে ভাবনার ‘ক্যাটিগরি’ এক নয়। আমাদের গত দুশো বছরের ইতিহাসে দেখছি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা যেভাবে ভেবেছেন, সাধারণ মানুষ সেভাবে সবসময় ভাবেননি। প্রাক-ব্রিটিশ যুগে হাকিম-বৈদ্যদের দর্শনও ছিল অন্যরকম। রাষ্ট্রের ভাবনা ও আমাদের সমাজের অন্তর্গত ভাবনায় বিরোধ ছিল, সে-বিরোধ স্থানে স্থানে খোলাখুলি সংঘর্ষের রূপ নিয়েছে। এর সবচেয়ে নাটকীয় নিদর্শন ১৮৯৭-৯৮-তে বোম্বাই শহরে সরকারি প্লেগ-নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ, যা নিয়ে ভাল গবেষণা করেছেন ডেভিড আর্নল্ড ও ইয়েন ক্যাটান্যাক।১৫
বোম্বাই নগরে প্লেগ-জনিত প্রথম মৃত্যুর খবর আসে ১৮৯৬ সালের আগস্ট মাসে। সে-বছর অক্টোবর মাস থেকে সরকার ব্যাপক ও জোরদার ব্যবস্থা নেন প্লেগ প্রতিরোধের জন্য। আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়— প্রয়োজন হলে জোর খাটিয়ে প্লেগ রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করার, মেলা তীর্থযাত্রা (বিশেষত হজ-যাত্রা) বন্ধ করার, রেলযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার, এমনকী প্লেগ-সন্দেহে মানুষকে আলাদা করে পরীক্ষা করার। সরকারি নীতির বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ জমতে থাকে ও প্রকাশ পায়। ১৮৯৬র ২০ অক্টোবর প্রায় এক হাজার মিলশ্রমিক আক্রমণ করেন বম্বের আর্থার রোড হাসপাতাল। গুজব রটেছিল যে, এক মহিলাকে জোর করে ওখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। ৯ মার্চ ১৮৯৮ একটি বারো বছরের বালিকাকে হাসপাতালে ভর্তি করার সরকারি চেষ্টাকে শহরের জোলা-সম্প্রদায়ভুক্ত তাঁতিরা একজোট হয়ে ব্যর্থ করে দেন। প্লেগ-কানুনবিরোধী আন্দোলন চলে উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে, কলকাতায়ও তার প্রভাব পড়ে। এই বিক্ষোভের কারণেই পুণার প্লেগ-কমিশনার ডব্লিউ. সি. র্যান্ড খুন হন ১৮৯৭ সালের জুন মাসে।১৬
