বরোদা রাজ্যের জাতীয়তাবাদীরা এসব ব্যাপার-স্যাপার শান্তভাবে সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন না। বিগত তিন বছর ধরেই নৌসারি শহরে গান্ধীবাদী আন্দোলন বেশ জোরদার সমর্থন পেয়ে আসছিল।৫৮ ১৯২৩ সালের গোড়ার দিকে এই শহরের মুখ্য জাতীয়তাবাদীরা ‘কালিপরজ সংকট নিবারণমণ্ডল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। বরোদা শহরের নেতা সুমন্ত মেহতা এর সভাপতি হতে রাজি হন। সমিতির সদস্যরা কর্তৃপক্ষের হাতে হয়রানি থেকে আদিবাসীদের রক্ষা করার জন্য গ্রামে যেতে শুরু করেন। আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সরকারি অত্যাচার সম্পর্কে স্বয়ং তদন্ত করার উদ্দেশ্যে সুমন্ত মেহতা ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে নৌসারিতে যান। বরোদায় ফেরার পর তিনি দেখা করেন দেওয়ানের সঙ্গে, যিনি আবার তাঁর এক আত্মীয়। এঁর কাছে তিনি দাবি করেন যে নৌসারি জেলায় মদ্যপান ও সুরাব্যবসা নিষিদ্ধ করা হোক। সুরার উপর নিষেধাজ্ঞা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যর্থ হয়েছে, এই যুক্তিতে মনুভাই মেহতা এই অনুরোধ খারিজ করে দেন, কিন্তু যে অঞ্চলে আন্দোলন ছিল সবচেয়ে বেশি জোরদার সেখানে কয়েকটি মদের দোকান বন্ধ করে দেবার আদেশ দিতে তিনি রাজি হন।৫৯
রানিমহলে সমাবেশ করার অভিযোগে বরোদা সরকার ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে কালিপজ সংকট নিবারণমণ্ডলের পাঁচজন প্রধান সদস্যের বিরুদ্ধে নালিশ আনে। এই মোকদ্দমার শুনানি হয় আগস্ট মাসের গোড়ায়, এবং গোপানজী দেশাই নামে ভিয়ারার এক প্রসিদ্ধ আইনজ্ঞ অভিযুক্ত নেতাদের পক্ষে সওয়াল করেন। তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে নৌসারির নেতাদের সঙ্গে আদিবাসীদের কথাবার্তা ছিল একান্তই অনিয়মিত, এবং দু পক্ষের মধ্যে সে অর্থে কোনও সমাবেশ হয়নি। ফলত এই নেতাদের উপর থেকে অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়।৬০ শহরের নেতাদের নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়ে নৌসারির সুবা অতঃপর কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আদিবাসীর বিরুদ্ধে এক মামলা শুরু করেন। পারসি এবং অন্যান্য মালিকদের খামারে কাজ করা থেকে স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকেদের বলপূর্বক নিবৃত্ত করার দায়ে এদের অভিযুক্ত করা হয়। তাদের জন্য বিভিন্ন সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বলা হয় যে ওই সময়ের মধ্যে তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখতে হবে, এবং তা করতে ব্যর্থ হলে আবার আদালতে হাজির হতে হবে।৬১ এই দমননীতি সত্ত্বেও সুরাবর্জন ও পারসি-বয়কট আন্দোলন বরোদার রানিমহলে, বিশেষত মাহুভা তালুকে, বেশ ভালভাবেই চলতে থাকে।৬২ এতেই বোঝা যায় যে বাইরের জাতীয়তাবাদী নেতাদের প্রচেষ্টা আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। হতাশ হয়ে মনুভাই মেহতা ১৯২৩ সালের ১ নভেম্বর এক আদেশ জারি করে রানিমহলে সভাসমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও ছমাস বাড়িয়ে দেন, এবং দেবীমাহাত্ম সংক্রান্ত যাবতীয় সমাবেশও নিষিদ্ধ করে দেন।৬৩ এইভাবে অবশেষে বরোদা সরকার দেবীকে নিষিদ্ধ করেন। মেহতার বিজ্ঞপ্তিতে (যা জারি করা হয়েছিল নৌসারির সুবার নামে) প্রকাশিত কিছু কিছু ধারণা আন্দোলন সম্পর্কে বরোদা সরকারের মনোভাব সম্বন্ধে চিত্তাকর্ষক আলোকপাত করে। এতে এরকম ইঙ্গিত ছিল যে শহরের গোলযোগকারীরাই দেবীকে সৃষ্টি করেছে:
কোনও কোনও যড়যন্ত্রকারী লোক শাসক এবং শাসিতের কিসে মঙ্গল হবে তা না জেনেই কালিপরজদের কাছে ব্যাপারটা ভুলভাবে সাজিয়েছে, তাদের ভয় দেখিয়েছে, এবং তাদের বড় বড় জমায়েত ডাকতে প্ররোচিত করেছে…এইসব লোকেরা রাজকর্মচারীদের বিরুদ্ধে কালিপরজদের ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করে, এবং ফলত সরকারের প্রতিষ্ঠিত কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করে। এছাড়াও তারা সরকারি বিচারব্যবস্থার উপর কালিপরজদের আস্থা ভাঙতে চায়, এবং তাদের বোঝাতে চেষ্টা করে যে সরকার তাদের সম্প্রদায়ের প্রকৃত মঙ্গল সম্পর্কে উদাসীন।৬৪
এই আদেশ কিছুটা অসংলগ্নভাবেই দেখানোর চেষ্টা করেছিল যে দেবী জনগণের ভ্ৰান্তদিশারী এক অশুভ শক্তিমান এবং এই দেবীর ‘দুষ্ট ক্রিয়াকলাপ’ সহ্য করা যায় না। এই বক্তব্যগুলি যে শুধু পরস্পরবিরোধী তাই নয়, পরিষ্কার বোঝা যায় যে এই তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ দেশীয় রাজ্যগুলি আদিবাসীদের আত্মঘোষনাকে মেনে নিতে পারছিল না। উনিশ শতকের শেষভাগে যে রাজ্য আদিবাসী-প্রশিক্ষণের পথিকৃৎ হিসাবে কাজ করেছিল, এক প্রজন্মের ব্যবধানে সেই রাজ্যই আর ওই নীতির পরিণাম গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না।
গাইকোয়াড় স্বয়ং তাঁর দেওয়ানের চেয়ে বেশি বদান্য বলে প্রমাণিত হয়েছিলেন। ইউরোপের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর জায়গায় দীর্ঘ প্রবাসের পর ১৯২৩ সালের ২৩ নভেম্বর তিনি ভারতে ফিরে আসেন। ডিসেম্বর মাসে মাহুভা, ভিয়ারা এবং সানগড় তালুক থেকে দুশোরও বেশি আদিবাসীর এক প্রতিনিধিবর্গ মহারাজকে তাদের বিক্ষোভ সম্পর্কে জানাতে বরোদায় এসে উপস্থিত হয়।৬৫ এর কিছুদিন পরেই নৌসারির সুবাকে তার চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং এক আদেশ জারি করে রানিমহলে মিতাচার এবং মদ্যপান নিবারণ সংক্রান্ত কাজকর্মের উদ্দেশ্যে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। স্থানীয় কর্মচারীদের এইসব কাজকর্মে সহযোগিতা করতে আদেশ দেওয়া হয়।৬৬ এই নতুন আবহাওয়ার প্রতি সাড়া দিয়ে সুমন্ত মেহতা ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে একটি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে রানিমহল সফর করেন, যে সফরে তিনি আদিবাসীদের কয়েকটি বৃহৎ গোষ্ঠীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। সাম্প্রতিক আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই জমায়েতগুলি কেবলমাত্র মিতাচারের প্রতিই মনোযোগী ছিল। কিন্তু এর বিশেষ কোনও তাৎপর্যই ছিল না। আদিবাসীদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল এই যে, ভূস্বামী ও সুরাব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের ঐক্যকে জোরদার করার উদ্দেশ্যে তাদের আবার জমায়েত হবার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সুমন্ত মেহতা দেখেছিলেন যে বিগত বছরের দমননীতি আন্দোলনকে ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। আদিবাসীরা তাঁর কাছে আত্মোন্নতি ও সমাজসংস্কারের এক তীব্র বাসনা প্রকাশ করেছিল। এই সফরের সময়ই সুমন্ত মেহ্তা প্রথম ‘কালিপরজ’ শব্দটির ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। ব্রিটেনে লোকেরা যখন তাঁকে ‘নিগার’ বা ‘ব্ল্যাকি’ বলে ডাকতে তখন যে তিক্ত যন্ত্রণা তিনি ভোগ করেছিলেন, তা তাঁর মনে ছিল। রানিমহলের আদিবাসীদের উল্লেখ করার জন্য এরপর থেকে তিনি ‘রানিপরজ’ (জঙ্গলের মানুষ) শব্দটি ব্যবহার করা স্থির করেছিলেন।৬৭ আত্মঘোষণার মাধ্যমে আদিবাসীরা দক্ষিণ গুজরাটের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অপেক্ষাকৃত প্রগতিশীল সদস্যদের কাছ থেকে যে বাড়তি শ্রদ্ধা আদায় করে নিতে পেরেছিল, এই শব্দটি ছিল তারই একটি তাৎপর্যপূর্ণসূচক।
