অতএব ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পর্কই আমাদের আলোচ্য বিষয়। বিভিন্ন মূল্যমান-ব্যবস্থা নয়। এই মোদ্দা কথাটি বুঝতে পারলেই নানা ক্ষেত্রে আদিবাসীদের গৃহীত বিভিন্ন কার্যসূচির কেন্দ্রীয় যুক্তিটিকে বোঝা সহজতর হয়ে ওঠে। দেশীয় জনসাধারণের মধ্যে স্থানীয় প্রতিপত্তিশালী শ্রেণীগুলির মূল্যবোধ অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীরা গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতে আদিবাসীরা ব্যাপকভাবে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছে, কারণ তারা খ্রিস্টীয় মিশনারিদের মূল্যবোধকে ব্রিটিশদের ক্ষমতার সঙ্গে একাত্ম করে দেখেছিল। দক্ষিণ গুজরাটে তারা তাদের প্রত্যক্ষ শোষক পারসিদের মূল্যবোধগুলিকে বর্জন করেছিল কিন্তু ব্রাহ্মণ্য ও বানিয়াদের প্রতিপত্তিশালী আঞ্চলিক সংস্কৃতির অনুমোদন করে। যে মূল্যবোধগুলিকে আত্মসাৎ করা হত সেগুলি হয় ছিল ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণীর মূল্যবোধ, নতুবা কোনও আঞ্চলিক প্রতিপত্তিশালী দেশীয় শ্রেণীর, নয়তো আদিবাসীদের স্থানীয় শোষকদের। অনুমোদিত মূল্যবোধগুলির মধ্যে পার্থক্য ছিল বিস্তর, কিন্তু ক্ষমতাচর্চার অনুষঙ্গ ছিল তাদের সাধারণ ধর্ম।
আধিপত্যশালী মূল্যবোধ আত্তীকরণের এই কার্যসূচিগুলির একটি প্রধান শক্তি ছিল এই যে এগুলি আদিবাসী সম্প্রদায় এবং প্রতিপত্তিশালী শ্রেণীগুলির কিছু কিছু প্রগতিশীল সদস্যের মধ্যে এক ধরনের সংযোজক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এখানেই ছিল এদের সঙ্গে উচ্চশ্রেণীর মূল্যবোধ সরাসরি বর্জন করার কার্যসূচিগুলির মূল তফাৎ। উচ্চশ্রেণীর প্রগতিশীলদের মধ্যে কেউ কেউ উন্নত ধরনের উদারপন্থী মতামত পোষণ করতেন, অর্থাৎ জাতীয় সংহতি এবং একটি গণতান্ত্রিক ভারতীয় জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলায় বিশ্বাস করতেন। এছাড়া ছিলেন সেইসব রাজনীতিকরা যাঁরা আদিবাসীদের দেখতেন ক্ষমতার একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে। উপজাতীয় জনসাধারণের দাবিদাওয়ার যৌক্তিকতা ও ন্যায্যতা সম্পর্কে ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী এবং তাঁদের স্বীয় শ্রেণীর অন্যান্য সদস্যের বিশ্বাস উৎপাদনের ব্যাপারে এই মানুষগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে পারতেন। সুতরাং এই ধরনের আদিবাসী আন্দোলনগুলি উচ্চবর্গের অন্তর্বিভেদের সুযোগ নিয়েছিল।
এইবার যদি আমরা দেবীর প্রত্যাদেশগুলির দিকে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব যে সেগুলি দুটি দিক থেকে আন্দোলনের শক্তিবৃদ্ধি করেছিল। একদিকে সেগুলি আঞ্চলিক প্রতিপত্তিশালী উচ্চবর্ণের হিন্দু মূল্যবোধগুলিকে আত্মসাৎ করতে চেয়েছিল। এই গণতন্ত্রীকরণ-প্রচেষ্টার মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। এই প্রসঙ্গে যে ব্যাপারটি তাৎপর্যপূর্ণ তা হল, যদিও বানিয়া ও ব্রাহ্মণ বণিক এবং কুসীদজীবীরা আদিবাসীদের শোষণ করত, তৎসত্ত্বেও দেবীর প্রত্যাদেশগুলিতে কখনওই তাদের বয়কট করার কথা বলা হয়নি। এই বয়কট আরোপ করা হয়েছিল শুধুমাত্র পারসি এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে মুসলমানদের উপর। এর যুক্তি ছিল এইরকম যে, যেখানে বানিয়া ও ব্রাহ্মণদের ‘পবিত্র’ জীবনাচরণ আদিবাসীদের মধ্যে আত্তীকরণের তাগিদ জাগিয়ে তুলেছিল, সেখানে পারসি এবং মুসলমানেরা ছিল ‘অপবিত্র’। অন্যদিকে স্থানীয় শোষণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে লোভী বলে পরিচিত পারসিদের বিরুদ্ধে দেবীর প্রত্যাদেশগুলি ছিল এক আত্মঘোষণা। সুরাপান থেকে বিরত হয়ে এবং সুরাব্যবসার সঙ্গে জড়িত যাবতীয় ব্যক্তির হয়ে কাজ করতে অস্বীকার করে আদিবাসীরা পারসিদের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক বন্ধনসূত্রগুলি ছিন্ন করেছিল। এদিক থেকে সুরাপান ছেড়ে দেওয়া ছিল বেআইনি মদ-চোলাই প্রভৃতি ছলনামূলক কার্যকলাপের থেকে অনেক বেশি কার্যকর আত্মঘোষণা, কারণ এই বর্জনের পিছনে কাজ করেছিল এক বিরাট নৈতিক শক্তি।
সুতরাং এই বিশেষ অঞ্চলটিতে দেবীর প্রত্যাদেশগুলিকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল আদিবাসী আত্মঘোষণার এক শক্তিশালী কার্যসূচি। রানিমহলে যারা স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চেয়েছিল তাদের সবাইকেই এই আন্দোলন বেশ ধাক্কা দেয়। বিশেষত পারসি সুরাব্যবসায়ী তথা ভূস্বামীদের প্রতি এটি ছুঁড়ে দেয় এক চ্যালেঞ্জ। আন্দোলন সম্পর্কে আদিবাসী সমাজ-বহির্ভূত অংশের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারটি এবার খতিয়ে দেখা যাক।
৫
ভূতাবেশ-সংক্রান্ত ধর্মীয় আচারবিধি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে কোনও বড় ধরনের আঘাতকে সূচিত করে না। আই. এম. লিউইস দেখিয়েছেন যে প্রতিপত্তিশালী শ্ৰেণীরা প্রায়শই এগুলিকে, অস্বস্তির সঙ্গে হলেও, মেনে নেয়। ভুতাবেশকে মনে করা হয় এমন এক চাপ-নিষ্কাশক যন্ত্র যা ন্যূনতম সামাজিক সম্ভোগের বিনিময়ে নিম্নবর্গের প্রচ্ছন্ন নাশকতামূলক অনুভূতিগুলিকে প্রশমিত করতে পারে।৪৯ যাই হোক, প্রতিরোধের সম্পূর্ণ আচারভিত্তিক এবং অপেক্ষাকৃত স্পষ্টতর ধারাদুটির মধ্যে বিভাজক রেখাটি কিন্তু সহজেই অতিক্রম্য। এইজন্যই প্রতিপত্তিশালী শ্রেণীগুলি এ-ধরনের ধর্মাচরণবিধির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখে, যাতে কোনওরকম বাড়াবাড়ি ঘটলেই তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। দেবী আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রতিপত্তিশালী শ্রেণীগুলির টনক নড়েছিল তখনই যখন আদিবাসীরা দলে দলে জমায়েত হতে শুরু করে, কেননা এ ধরনের বিশাল জনসভার মধ্যেই নিহিত ছিল সক্রিয়তর প্রতিরোধ ও নাশকতামূলক কার্যকলাপের বীজ।
