(খ) সুরা বা তাড়ির দোকানে কাজ কোরো না।
(গ) তাড়ি গাছ থেকে তাড়ি নিষ্কাশন কোরো না।
২. মাংস(ক) মাংস বা মাছ খেয়ো না।
(খ) (খাওয়া বা বলির জন্য রেখে দেওয়া) সমস্ত জ্যান্ত মুরগি, ছাগল ও ভেড়া বিক্রি করে দাও।
(গ) মাংস রান্নার সমস্ত পাত্রগুলি নষ্ট করে ফেল।
(ঘ) বাড়ির চালগুলি (আদিবাসী গ্রামে সাধারণত খড়ে-ছাওয়া) সরিয়ে ফেল এবং পুড়িয়ে দাও, কারণ মাংস রান্নার জন্য ব্যবহৃত আগুনের ধোঁয়া এই চালগুলির মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
৩. পরিচ্ছন্নতা(ক) প্রত্যেকদিন স্নান করো (কোনও কোনও ক্ষেত্রে দিনে দুবার বা তিনবার)।
(খ) মলত্যাগের পর শৌচকর্মের জন্য জল ব্যবহার করো।
(গ) বাডি ও উঠোনগুলি ঠিকঠাক পরিষ্কার রাখে।
৪. প্রতিপত্তিশালী শ্রেণী(ক) পারসিদের বয়কট করে।
(খ) মুসলমানদের বয়কট করো।
(গ) সুব্যবসার সঙ্গে জড়িত, এমন কারও জন্য কাজ কোরো না।
(ঘ) বেতনবৃদ্ধি দাবি করো।
(ঙ) কোনও পারসির ছায়া মাড়ালে স্নান করো।
এই আদেশগুলি আদিবাসীদের জীবনচর্চায় এক সার্বিক পরিবর্তন দাবি করেছিল। দারু ও তাড়ি খাওয়া ছিল এদের সংস্কতিরই এক সম্যক অঙ্গ। এই পানীয়গুলি মূল্যবান খাদ্যবস্তু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ তো ছিলই—বিশেষত গ্রীষ্মকালে, যখন খাদ্যের ভাণ্ডারে টান পড়ত। উপরন্তু বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানেও এগুলি ব্যবহৃত হত এবং অনেক ধর্মীয় উৎসবে তথা বিবাহে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও অবাধে পান করা হত।৩৯ একই ভাবে আদিবাসী ক্রিয়াবিধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বলি। বলির মাংস পরে খাওয়া হত। প্রাত্যহিক স্নানের প্রথা সেই সময়ে সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল না, কেননা আদিবাসী গ্রামগুলিতে জল সরবরাহের ব্যবস্থা প্রায়শই শুধুমাত্র জলপানের উদ্দেশ্যেও যথেষ্ট ছিল না। অতএব, অনুগামীদের জীবনযাত্রাকে সহজতর করে তোলাই দেবীর যাবতীয় আদেশের উদ্দেশ্য ছিল না। এগুলির অন্তর্নিহিত যুক্তিগুলিকে আমাদের আরও ভাল করে পরীক্ষা করা দরকার।
সেই সময় বেশ কিছু পর্যবেক্ষক একে দেখেছিলেন আদিবাসীদের ‘বিশুদ্ধীকরণ’ আন্দোলন হিসেবে। যেমন, গান্ধীবাদী নেতা সুমন্ত মেহতা একে আদিবাসীদের ‘আত্মশুদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।৪০ দেখা যাচ্ছে যে এই উপলব্ধিকে অবলম্বন করেই গড়ে উঠেছে ‘সংস্কৃতায়ন’ প্রক্রিয়াটি, যাকে এম. এন. শ্রীনিবাস বর্ণনা করেছেন এইভাবে:
সংস্কৃতায়ন হল সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি ‘নিচু’ হিন্দু জাতি বা উপজাতি বা অন্য কোনও গোষ্ঠী তার লোকাচার, ক্রিয়াবিধি, মতাদর্শ ও জীবনচর্যাকে একটি উঁচু, এবং প্রায়শই ‘দ্বিজ’ জাতির আদলে পরিবর্তিত করে। বর্ণভিত্তিক স্তরকাঠামোয় ওই জাতির যে স্থান স্থানীয় সমাজের দ্বারা সনাতনভাবে স্বীকৃত। তার থেকে উচ্চতর স্থানের দাবি সাধারণত এই ধরনের পরিবর্তনের পরেই আসে। এই দাবির স্বীকৃতি পেতে লেগে যায় বেশ কিছু সময়, বলতে কি, দু-এক পুরুষও।৪১
এই প্রত্যয়টির নিরিখে ভারতীয় সমাজের গতিসূত্রগুলিকে সাপলুডো খেলার মতোই মন্থরতায় আক্রান্ত বলে দেখানো হয়েছে। এই খেলায় যোগদান করার সময় খেলুড়েরা থাকে অশুদ্ধ, এবং পুরুষানুক্রমে তারা ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ্য শুদ্ধতার পথে এগিয়ে যায়। এই অগ্রগতির পথে থাকে নানা খানাখন্দ, এবং বেশিরভাগ সম্প্রদায়ের পক্ষেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভবই হয় না। এই অভীষ্ট লক্ষ্য অবশ্য অবিসংবাদিত: ‘সংস্কৃতায়নের ব্রাহ্মণ্য, এবং মোটের উপর শুদ্ধাচারনিষ্ঠ পথটিই এযাবৎ সার্বিক প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এমনকি মাংসাশী এবং মদ্যপায়ী ক্ষত্রিয় তথা অন্যান্য গোষ্ঠীগুলিও অন্যান্য পথের তুলনায় এই পথটির শ্রেষ্ঠত্বকেই পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে।’৪২
শ্রীনিবাস আরও বলেন, ‘সংস্কৃতায়ন শুধুমাত্র হিন্দু বর্ণগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিম ভারতের ভিল, মধ্যভারতের গোন্দ এবং ওরাওঁ এবং হিমালয়ের পাহাড়িদের মতো উপজাতি এবং আধা-উপজাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যেও এই প্রক্রিয়াটি লক্ষ করা যায়। এর ফলে সাধারণত যে উপজাতি সংস্কৃতায়নের সাহায্য নিচ্ছে তারা নিজেদের হিন্দু বর্ণপ্রথার অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে।’৪৩ বলা যেতে পারে যে দেবী আন্দোলনের ক্ষেত্রে সুরাবর্জন, নিরামিষাহার এবং পরিচ্ছন্নতার মতো নব্য শুদ্ধাচারগুলি পালনের মাধ্যমে দক্ষিণ গুজরাটের আদিবাসীরা শুদ্ধ বর্ণ হিসেবে হিন্দু বর্ণভিত্তিক সমাজকাঠামোর ভিতর অন্তর্ভুক্তির দাবি জানাচ্ছিল। অতএব এই আন্দোলনকে আদিবাসী সমাজে সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়ার একটি নাটকীয় উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।
অবশ্য এই প্রত্যয়টির ব্যবহারে কিছু অসুবিধা রয়েছে। শ্রীনিবাসের উপরোক্ত উক্তিটি ওরাওঁদের সম্বন্ধে। ওরাওঁ সমাজে সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে এস. সি. রায়ের উৎকৃষ্ট গ্রন্থটি পড়লে বোঝা যায় যে রায় নিজে এই ধরনের ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেননি। তিনি লেখেন যে আর্য সমাজ প্রভৃতি হিন্দু সংস্কারক গোষ্ঠীগুলি ‘শুদ্ধি’ প্রভৃতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওরাওঁদের হিন্দু সমাজের আওতার মধ্যে নিয়ে আসতে চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। কারণ রায়ের মতে, ‘আলোকপ্রাপ্ত ওরাওঁ নেতারা স্বভাবতই এই ধরনের প্রচারকদের এড়িয়ে চলত। কারণ তাদের ভয় ছিল (এবং এই ভয় আদৌ অমূলক ছিল না) যে দ্বিজ বর্ণগুলির ধর্মীয়-সামাজিক বিশেষ মর্যাদা নিয়ে গড়ে-ওঠা শাস্ত্রানুগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক হিন্দুধর্ম বর্ণান্তরিত আদিবাসীদের স্থান দেবে হিন্দু বৰ্ণস্তর কাঠামোর একেবারে নীচে না হলেও বেশ নীচের দিকে।’৪৪ অন্যান্য তথ্যসূত্র থেকেও অনুমান করা যায় যে মোটের উপর আদিবাসীরা বর্ণস্তরকাঠামোয় কোনও স্থান দাবি করেনি। অবশ্য একথা সত্যি যে ক্ষেত্রবিশেষে তারা নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে দাবি করেছে।৪৫ এই ব্যাপারটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ক্ষত্রিয়রা মাংসাহার এবং সুরাপানের মতো ‘অপবিত্র’ ক্রিয়াকর্মের শরিক হয়েও উচ্চ সামাজিক মর্যাদা ভোগ করে থাকে। অন্যভাবে বলতে গেলে, ক্ষত্রিয়োচিত প্রতিষ্ঠার দাবিদার আদিবাসীরা চায় যে ‘অপবিত্র’ আচারবিধিতে অভ্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো হোক। কিন্তু সম্প্রতিকালে এই ধরনের উদাহরণগুলি ব্যতিক্রমী হয়ে দাঁড়িয়েছে।৪৬ দেবী আন্দোলনের মতো বিশুদ্ধিকরণ আন্দোলনগুলির কার্যপ্রণালীতে এসেছে পরিবর্তন। এই ধরনের আন্দোলনে আদিবাসীরা কিছু কিছু হিন্দু মূল্যবোধ গ্রহণ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বর্ণপ্রথায়। অন্তর্ভুক্তির দাবি থেকে বিরত থেকেছে। সুতরাং এই উদাহরণগুলি থেকে আদিবাসীরা যে বর্ণপ্রথাকে মেনে নিয়েছে, এমন মনে করে নেওয়াটা অযৌক্তিক হবে। বরং বলা যেতে পারে উচ্চবর্ণোচিত জীবনচর্যা গ্রহণের মাধ্যমে আদিবাসীরা উচ্চবর্ণের হিন্দুর সমমর্যাদার দাবিদার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
