এই সমাজসংস্কারকদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য ছিলেন সোনগড়ের প্রাক্তন ছাত্র অমর সিং গমিৎ (১৮৭৩-১৯৪১)। ১৯০৫ সালে ফতেহ্খান পাঠানের সঙ্গে তিনি ভিয়ারা তালুকে তাঁর নিজস্ব গ্রামে একটি আদিবাসী সম্মিলনের আয়োজন করেন। এখানে আদিবাসীদের মদ্যপান ও কুসংস্কারভিত্তিক আচারপালন ছেড়ে দিতে, লেখাপড়া শিখতে, এবং মহাজনদের ঋণের কবল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে উৎসাহিত করে কয়েকটি প্রস্তাবও পাশ করা হয়।২৮ এর পরের কয়েকবছর অমর সিং গমিৎ গ্রামে গ্রামে ঘুরে আদিবাসীদের জীবনাচরণের বিধিগুলি পালটাতে উৎসাহিত করেন। তাদের মধ্যে রোজ স্নান করা, ঘরদোর পরিষ্কার রাখা এবং অসুস্থতার সময় ওঝা-ঝাড়ফুঁকের পরিবর্তে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সাহায্য নেওয়ার প্রথা তিনি প্রচলন করতে চেয়েছিলেন।২৯ একইসঙ্গে তিনি প্রচার অভিযান চালান রতনজী দাবু নামে এক বড় পারসি জমিদারের বিরুদ্ধেও, যে খোলাখুলিভাবেই আদিবাসীদের শোষণ করে যাচ্ছিল। অমর সিং-এর এই অভিযান অবশ্য নিষ্কন্টক হয়নি, এবং এর সাফল্যও ছিল সীমিত।
ব্রিটিশ-অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে, বিশেষত মাণ্ডবী তালুকে, গড়সাম্বা বোর্ডিং হাউসে শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণবয়স্ক চোধ্রীরা ‘ভজনমণ্ডলী’ নাম দিয়ে ছোট ছোট গানের দল গড়তে শুরু করে। এগুলির উদ্দেশ্য ছিল সমাজসংস্কার সংক্রান্ত ধ্যানধারণার প্রসার। এর একজন চাঁই ছিলেন মারবাড়ী মাস্টার নামে এক চোধ্রী যিনি ১৯০৯ সালে গড়সাম্বা থেকে গুজরাটির ফাইন্যাল পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন মাণ্ডবী তালুকের এক গ্রামের কৃষক, প্রায় চল্লিশ একর জমির মালিক। অর্থাৎ বলা যেতে পারে যে মারবাড়ী ছিলেন মোটামুটি সম্পন্ন এক চোধ্রী পরিবারের প্রতিনিধি। পরে স্কুলশিক্ষক হয়ে তিনি মাণ্ডবী তালুকের বিভিন্ন গ্রামে পড়িয়েছিলেন। তিনি এবং গড়সাম্বার আরও কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র মিলে একটি গানের দল গড়ে তোলেন। ছুটির দিনে গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে এরা ঘুরে বেড়াত। এইসব গানে সাধারণত মিতাচার ও আত্মনির্ভরতার গুণকীর্তন করা হত, আর বলা হত বিদেশী মহাজন আর পারসিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা। এমন একটি গান ছিল:
ও ভাইসকল! দারু বা তাড়ি খেওনা হে।
ও ভাইসকল! মদ খেলে যে লুটে নেবে পারসি তোমার জমিজিরেত।
তার কাছে যাও যদি তবে বিষয়-আশয় বেহাত হবে হে।
ও ভাইসকল! দারুর নেশা ছেড়ে দাও।
দারুর পিছে ছোটো যদি বানিয়া আর ঘাঁচী [তেলি] মিলে
তাবৎ বিষয় আশয় তোমার লুটে নেবে হে।৩০
গান শোনার জন্য লোকজন জমায়েত হলেই সংস্কারকরা এইসব বিষয়ের উপর চোধ্রী উপভাষায় বক্তৃতা দিতে শুরু করত।
এইভাবে বিশ শতকের প্রথম দুই দশকে আদিবাসী তরুণরা তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে সমাজসংস্কারকের ভূমিকা গ্রহণ করতে শুরু করে। বহুক্ষেত্রেই এরা আসত অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী আদিবাসী পরিবারগুলি থেকে, যাদের সঙ্গতি ছিল দু-একটি ছেলেকে চাষবাসের কাজ থেকে রেহাই দিয়ে স্কুলে পাঠানোর। বাইরের শোষণকারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে এমন এক ধরনের নেতৃত্ব এই পরিবারগুলি থেকেই উঠে এসেছিল। শিক্ষিত হওয়ার ফলে এইসব সমাজসংস্কারকেরা তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে যথেষ্ট সম্মান ভোগ করত, এবং তাদের কয়েকজনের উদ্যোগপ্রসূত কয়েকটি আন্দোলন দেবী আন্দোলনের পথ প্রস্তুত করেছিল। যেমন ১৯০৫ সালে সুরাট জেলার সহকারী কালেক্টর লেখেন:
এই বছরের গত দুমাস ধরে কালিপরজদের মধ্যে এক চমকপ্রদ ও ব্যাপক সুরাবর্জন আন্দোলন লক্ষ করা গেছে। এর সূত্রপাত হয় যখন বরোদার এক স্কুলমাস্টার বলে যে এক দেবতার কাছ থেকে সে উত্তেজক সুরা পানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পেয়েছে। এ-খবর প্রথম পৌঁছয় বালসারে (Bulsar) এবং সেখানে প্রচুর সংখ্যক নিষেধাজ্ঞাপক ইস্তাহার বিলি করা হয়। কোনও কোনও অনাভিল (Anavil) প্যাটেলও সোৎসাহে এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। শোনা যায় অনেক গ্রামে ‘দেবতার’ রহস্যময় চিঠিপত্রও পাওয়া গেছে। বিরাট বিরাট জমায়েতে সম্মিলিত হয়ে কালিপরজরা সিদ্ধান্ত নেয় যে শেষবারের মতো এক বড়মাপের আমোদপ্রমোদের পর তারা মদ্যপান পুরোপুরি ছেড়ে দেবে। এখন পর্যন্ত তাদের এই শপথ তারা কঠোরভাবে পালন করে এসেছে। আবগারি রাজস্বহানির আশঙ্কায় ত্রস্ত সরকার প্রতিবেশী দেশীয় রাজ্যে এই মিতাচারীদের কড়া ধরনের হুমকি দিয়েছে। কিন্তু লোকজন জবাব দিয়েছে যে সরকারি আদেশের চেয়ে দেবতার আদেশ বড়, এবং মিতাচার তারা ছেড়ে দেয়নি। আমার মনে হয় এই আন্দোলন কোনওমতেই মদের চড়া দামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, এবং এর ভেতর রয়েছে এক নৈতিক ও ধর্মীয় চরিত্র।৩১
এর পরের বছর আন্দোলন ঝিমিয়ে আসার খবর আসে। অবশ্য এই সময় দেখা দেয় একই ধরনের আরও বেশ কয়েকটি আন্দোলন, যার দরুন ১৯২২ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে আন্দোলনের এক ঐতিহ্য।
৩
এইভাবে প্রস্তুত হয়েছিল দেবীর আগমনের পথ। অবশ্য এই আন্দোলন দক্ষিণ গুজরাটের রানিমহলে শুরু হয়নি, হয়েছিল বোম্বাই শহরের ঠিক উত্তরদিকে, বেসিনের উপকূলবর্তী গ্রামগুলিতে। এই আন্দোলনের উৎপত্তি অনথিবদ্ধ এবং ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। আমার সমস্ত তথ্যই তাই সংগ্রহ করতে হয়েছে এই অঞ্চলের বৃদ্ধ জেলেদের সাক্ষাৎকার থেকে।৩২ মনে হয় ১৯২২-এর গোড়ার দিকে ‘মাঙ্গেলা কোলি’ জেলেদের মধ্যে এক গুটিবসন্তের মড়ক দেখা দেয়। এরা বিশ্বাস করেছিল যে এই মড়কের জন্য দায়ী এক দেবী, অতএব তাঁকে সন্তুষ্ট করা দরকার। এই সময়কার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাঙ্গেলা কোলি মেয়েদের উপর এই দেবীর ভর হয়। ভরগ্রস্তাদের মাধ্যমে দেবী মাঙ্গেলা কোলিদের জানান যে তিনি খুশি হবেন একমাত্র তখনই, যদি তারা কিছুদিনের জন্য মাছমাংস এবং মদ বা তাড়ি খাওয়া ছেড়ে দেয়। মাঙ্গেলা কোলিরা এই আদেশ মেনে চলে। যেসব মেয়েদের উপর এই দেবীর ভর হয়েছিল তাদের নাম দেওয়া হয় ‘সলাহ বাই’, অর্থাৎ এমন মেয়ে (বাই) যারা পরামর্শ (সলা) দেয়। দেবীর সন্তোষবিধানের এই আন্দোলন উপকূলরেখা ধরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে উত্তরদিকে, থানা, দমন এবং সুরাট জেলার অন্যান্য ধীবর-অধ্যুষিত গ্রামে। দমন, পার্দি এবং ভালসাদ তালুকের উপকূলবর্তী গ্রামগুলি থেকে আবার তা ছড়িয়ে যায় ধোড়িয়া আদিবাসী-অধ্যুষিত অন্তবর্তী গ্রামগুলিতে। ইত্যবসরে দেবী নিজেই ‘সলাহ বাই’ নামে পরিচিতি পান, এবং নারী-পুরুষ উভয়েই ভরগ্রস্ত হতে শুরু করে। অবশ্য এই পর্যায়ে এই মাহাত্ম্যের প্রচারের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর হয়ে আসে, কারণ ভর হওয়ার অনুষ্ঠানগুলি তখন হত লোকজনের বাড়িতে, স্বল্প উপস্থিতির ভিতর। তখনও এর উপর সরকারি কর্তৃপক্ষের নজর পড়েনি। ভালসাদ এবং পার্দি থেকে এই আন্দোলন পূর্বে ধরমপুর রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে, এবং কোঙ্কনী উপজাতির মধ্যে স্থিতি লাভ করে। তারপর তা ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমঘাটের গা বেয়ে সুরগনা রাজ্য এবং নাসিক জেলায় এবং একই সময়ে উত্তর-পূর্ব দাং-এ। শেষোক্ত জায়গায় এই আন্দোলন পোঁছয় ১৯২২ সালের অগস্ট মাস নাগাদ।৩৩
