ডোম, দোসাদ, ভাঙ্গি আর মাঙ্গরা ঋণদাতার ক্ষমতাকে যেমন স্বীকার করে নেয়, একই উপায়ে তারা ওই শক্তি থেকে মুক্তির পথ খোঁজে। কারণ তারা রাহুর সঙ্গে একাত্ম, তা সে সন্তানরূপেই হোক, পূজারীরূপেই হোক অথবা রাহুর থেকে উদ্ভূত বলেই হোক; ভাবজগতের ওই একই প্রক্রিয়ায় তারা নিজেদের দেয় উত্তমর্ণের চেহারা; বাস্তবে যার সীমা লঙ্ঘন করতে পারে না, নিজেদের সেই বন্দিদশাকে ভেঙে দেয় তারা তাদের কল্পনার আদর্শ জগতে। নিজেদের সমাজে তারা খাতক (খাদক)৭১ , অর্থাৎ ঋণের ভোগী, কিন্তু রাহুর সঙ্গে সঙ্গে তারা স্বর্গীয় অধমর্ণদের গ্রাস করবার অধিকার পেয়ে যায়। এতদিন যারা ছিল নিপীড়িত, তারা আজ নিজেদের অত্যাচারীর ভূমিকায় সাজাচ্ছে; সেখানে রয়েছে অর্থে প্রত্যর্থে এক বৈপরীত্যের ব্যঞ্জনা। বাস্তব জগৎকে উলটে দেওয়ার বহু প্রয়াসেই নেতিবাচক চৈতন্যের সেই ছাপ থেকে যায়। ধর্মের জগতেও প্রতিবিধান এমন বিপরীতের ব্যঞ্জনায় চিহ্নিত। চতুর্থ, পঞ্চম এবং ষষ্ঠ উপাখ্যানে তেমন ব্যঞ্জনারই দৃষ্টান্ত।
৮
এ কথা সন্দেহাতীত যে রাহুর স্বর্গ থেকে মর্ত্যে গমন অলীক এক মুক্তি ছাড়া কিছুই অর্জন করে না। তা সত্ত্বেও এমন সিদ্ধান্তে আসা ভুল হবে যে আমরা এখনও সেই আরম্ভেই দাঁড়িয়ে আছি। বরং এখন আমরা ধারাবাহিক এক ক্রমের শেষ প্রান্তে, প্রথম উপাখ্যান থেকে যার দূরত্ব অনেক। যেদিন অমৃতের ভাগ নিয়ে দেবতা আর দানব লড়াই করেছিল, সেই সমুদ্রমন্থন আজ থেকে কত যুগ আগে? অমৃতের ভোজসভায় সেই মুণ্ডচ্ছেদই বা কবেকার কথা? আজ আমরা দাঁড়িয়েছি আমাদের সময়ের সঙ্গে, আমাদের পদক্ষেপ হয়তো ততখানি নিশ্চিত নয়, যতখানি নিশ্চিতি আছে আমাদের আকাঙ্ক্ষায়, তবু সেই পদক্ষেপ আজ নিজেদের অভিজ্ঞতার ভূমিতে। অস্বীকার করব না যে গ্রহণের মতো প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা আজও খোঁজা হয় পুরাণে, বিজ্ঞানে নয়। কিন্তু আজকের পুরাণে মূল চরিত্র আর দেবতা দানব নয়, মুখ্য ভূমিকা আজ জনগণের। পৌরাণিক কাহিনীর কেন্দ্রে ছিল অমৃতের প্রতিযোগিতা; সে লড়াইয়ের চেহারা বদলে গেছে; আজকের প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনধারণের উপযোগী সব পার্থিব সম্পদের মালিকানা নিয়ে। ব্রাহ্মণ্যের আজব কল্পনায় যার উদ্ভব, দরিদ্র আর নিপীড়িতের সরল কল্পনা তাকে আমাদের কালের উপকথায় গ্রথিত করে। কাহিনীর যে পাঠ আমরা মৎস্যপুরাণে পাই, তাতে দেখি, রাহুর সঙ্গে চন্দ্র-সূর্যের শত্রুতা হয়েছিল এবং আজও গ্রহণের সময় রাহু দুজনের উপরেই প্রতিশোধ নেয়।৭২ এখনও সে তার আশানুরূপ পুরোপুরি প্রতিশোধ নিতে পারেনি, অবিরাম চলছে তার অন্বেষণ। সে যে নিজের শত্রুকে মর্ত্যেই খুঁজে পেয়েছে, এটা রাহুর পক্ষে অনুকূল পরিস্থিতি। উপরোক্ত কাহিনীসমূহের বিচারে এই সংগ্রাম এখনও ভাবজগতেই সীমিত; কিন্তু সেই সামাজিক সংগ্রামে পরিণতির সম্ভাবনা আজ অনেক বেশি; সেই সংগ্রামেরই রূপক শেষ তিনটি উপাখ্যান।
অনুবাদক: রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায়, রুশতী সেন
টীকা
১ D.D. Kosambi, An Introduction to the Study of Indian History, rev. 2nd ed. (Bombay, 1975), ch. 2: The Culture and Civilisation of Ancient India in Historical Outline (reprint, Delhi, 1972), ch. 1; এবং ঐ গ্রন্থের অন্যত্র।
২ Kosambi, Culture and Civilisation, p. 15.
৩ ঐ, পৃ. ১৬।
৪ প্রথম উপাখ্যানের পাঠ নেওয়া হল The Mahabharata: 1. The Book of the Beginning, tr. and ed. J.A.B. Van Buitenen (Chicago, 1973), p. 74-5। জর্জ দুমেজিল বলেন যে, এই আখ্যান বেদেও উপস্থিত, কিন্তু সেখানে দানবের নাম স্বরভানু। এই আখ্যানের সঙ্গে অমৃতের যোগাযোগ নেই। দুমেজিল-এর মতে, অমৃতের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে পরবর্তী কাহিনীটি হিন্দুদের উদ্ভাবন। G. Dumezil, Le Festin d’ Immortalite (Paris, 1924), p. 20.
৫ W.D.O’Flaherty, Hindu Myths (Harmondsworth. 1975), pp. 273-4-এ এই দ্বন্দ্বময়তার বিষয়ে সংবেদনশীল মন্তব্য আছে।
৬ C. Levi-Strauss, The Raw and the Cooked (London, 1970), p. 244.
৭ এই ধরনের বেনিয়মের বিবাহে অস্বাভাবিকতাগুলি হল, স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান, একে অপরের প্রতি বেমানান আচরণ, পোয়াতি মেয়ের বিবাহ, আর বিবাহ উৎসবের জন্য ভোজসভার আয়োজন না করা (ঐ, পৃ. ২৪৪)। Levi-Strauss, ঐ, Part 5 (১)-এ গ্রহণ এবং মশকরার কাঠামোগত সাদৃশ্যের আলোচনা করেছেন।
৮ H.A. Rose. A Glossary of the Tribes and Castes of the Punjab and North-West Frontier Province, vol. I (Lahore, 1919), pp. 127, 738.
৯ G.W. Briggs. The Dams and their Near Relations (Mysore, 1953). [এর পর Briggs,] p. 547.
১০ E. Thurston, Ethnographic Notes in Southern India (Madras, 1906), p. 289
১১ Briggs, p. 547.
১২ S. Stevenson, The Rites of the Twice-Born (London, 1920) pp. 351-2.
১৩ ঐ, পৃ. ৩৫২; Briggs, p. 547.
১৪ Rose, Glossary, p. 869.
১৫ The Laws of Manu, ed. G. Buhler, Sacred Books of the East Series, vol 25 (reprint, Delhi, ১৯৭৫) [এর পর থেকে Manu]: IV, 110. এই অনুচ্ছেদটির টীকায় বিউলার বলছেন, ‘অবশ্যই, সূর্যের গ্রহণও এতে অন্তর্ভুক্ত।’
