মোড় ঘুরেই এন আর এসের প্রথম গেটটার দু’ধারে পশুপাখির হাট। আজকে অবিশ্বাস্য মনে হবে (হয়তো বা গুলও), বড় বড় মোটা জালের খাঁচায় ভরে অবাধে বিক্রি হত ভালুকছানা, বাঁদর, চিতল হরিণের বাচ্চা, অধুনা বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির তালিকায় চলে যাওয়া ডাঙার তারা কচ্ছপ (স্টার টরটয়েজ), দেশি টিয়া, তোতা, ফুলটুসি, ডিউস বলের মতো বড় মাথা আর ইয়া লম্বা ল্যাজঝোলা পাঞ্জাবি চন্দনা, আসামি ময়না, কুচকুচে কালো গা, গালে গাঢ় কমলা রঙের গালপাট্টা, কথা নকল করার ওস্তাদ, বেনে বউ, শ্যামসুন্দর, লালমুনিয়া, চিনে বুলবুল, ধানচড়াই, চোখ বাঁধা ময়ূর (আজ বুঝতে পারি কেন প্রকৃতির এইসব না-মানুষি সন্তানরা এত দ্রুত পা বাড়িয়েছে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার রাস্তায়)… একচুলও বাড়িয়ে বলছি না। বিশ্বাস করুন। এর পাশাপাশি বিদেশি পাখিও বিক্রি হত প্রচুর পরিমাণে। নীল সবুজ সাদা রঙের বদ্রিকা, আকারে চড়াইয়ের চেয়েও ছোট টুকটুকে লাল ঠোঁট আর দুধসাদা রঙের ফিঞ্চ, সর্বদা জোড় বেঁধে থাকা লাভবার্ড, ক্যানারি— উজ্জ্বল হলুদ গায়ে কালো কালো ছিট ছিট, বড় লোহার দাঁড়ে বসে থাকা গম্ভীরমুখো কাকাতুয়া, চিনে মুরগি, রাজহাঁস… এককথায় পাখির স্বর্গোদ্যান! আর আসত কুকুর। মূলত টিবেটিয়ান লাসা অ্যাপসো সিডনি সিল্কির বাচ্চা। এক গা ভরতি সোনালি লোম। মিহি খেউ খেউ চিৎকার… অধুনা ভোডাফোনের পাগ আর ল্যাব্রাডরের ভিড়ে প্রায় হারিয়ে গেছে কলকাতার পোষ্য মানচিত্র থেকে। পশুপাখির স্টলের গায়েই বসত রঙিন মাছের বাজার। সারি সারি অ্যাকোয়ারিয়াম আর কাচের শিশিতে অ্যাঞ্জেল, সোর্ডটেইল, ব্ল্যাকমলি, ফাইটার, কিসিং গোরামি, টাইগার বার্ব… এ যেন সেই ‘লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে’ ফুটপাতের পাশে কাচাধারে। মুগ্ধচোখে দাঁড়িয়ে দেখত ক্লাস থ্রি ফোরের একটা বাচ্চা ছেলে, বাবার হাত ধরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেই যে পশুপাখি পোষার শখটা ঝিলিক মেরে উঠেছিল মাথার মধ্যে তার শুরুয়াতও কিন্তু হাতিবাগান হাট আর ওই শেয়ালদার রথের মেলায়। ষাট-ষাটটা বসন্ত পেরিয়ে এসেও আজও সেই শখটা মরে যায়নি ছেলেটার মনের মধ্যে।
পশুপাখির মেলার উলটোদিকেই টগর কুমারের ম্যাজিক শো। ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া, করাতে মানুষ কাটা আর পরমুহূর্তেই জুড়ে দেওয়া… শ কিসিমের ভানুমতীর খেল। ম্যাজিক স্টলের গায়েই লম্বাটে তাঁবু। তাঁবুর সামনেই বাইরে একটা মাচামতো। মাচার সামনে ক্লাউন সেজে নেচে কুঁদে ভিড় জমাত একটা লোক। হাতে একটা বাঁকাত্যাড়া চোঙা। ঘন ঘন অ্যানাউন্সমেন্ট— ‘আসুন, আসুন। এক্ষুনি শো চালু হয়ে যাবে… স্পাইডার গার্ল, ইলেকট্রিক গার্ল, দু’মাথাওয়ালা মেয়ে, জীবন্ত রাক্ষস মানুষ— জ্যান্ত হাঁসমুরগি ধরছে আর গপাগপ গিলছে… জলদি করুন! আর মাত্র কয়েকটা টিকিট পড়ে আছে। মূল্য মাত্র উনিশ পয়সা…।’ পিছনে টাঙানো লম্বা চওড়া একটা ক্যানভাস। অপটু হাত আর চড়া রঙে আঁকা উদ্ভিন্নযৌবনা স্বল্পবসনা বিদ্যুত্সুন্দরী, মাকড়সা কন্যাদের ছবি। দেহাতি মানুষজনের ভিড়। টিকিটের চাহিদাও মন্দ না। সেটা কতটা ক্লাউনের কথার জাগলারি আর কতটা পরদায় আঁকা ছবির আকর্ষণে সেটা বলা মুশকিল। তাঁবুটার গায়ে লেগে আরেকটা তাঁবু। আকারে একই রকম। ছোট চিড়িয়াখানা। আগের তাঁবুটার সঙ্গে তফাত একটাই। সামনে টাঙানো ক্যানভাসে মাকড়সা কন্যাদের বদলে পাহাড়, জঙ্গল, ঝরনা, নদী… চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর সব বন্যপ্রাণী। সোঁদরবনের বাঘ থেকে শুরু করে ঝকঝকে করাতের মতো দাঁত খিঁচিয়ে থাকা টিরেনসোরাস রেক্স— কে নেই সেই ছবির লিস্টে! পরদার দু’পাশে টাঙানো দুটো মাইক থেকে ক্রমাগত ভেসে আসছে হিংস্র বাঘের গর্জন— ‘উঁউম্ম্ম্ উঁউম্ম্ম্।’ টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলে দেখা যেত ওপর নীচ সার সার দশ-বারোটা ছোট ছোট খুপরি খাঁচা। ভাল করে উঠে দাঁড়ানোই অসম্ভব, চলাফেরা তো দুরস্থান। নোংরা, অস্বাস্থ্যকর, দুর্গন্ধময় খাঁচার খোপে একটা রুগ্ন লোমওঠা চিতাবাঘ। দাঁতভাঙা, পাঁজরের হাড় ঠেলে বেরোনো হায়না একটা। বিষণ্ণ চোখে গরাদের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকা বুড়ো বাঁদর, শুকিয়ে দড়ি পাকিয়ে যাওয়া অজগর, ঘুমন্ত এবং অভুক্ত বনবেড়াল… কেন জানি না ওই ছেলেবেলাতেই মনটা খুব ভারী হয়ে গেছিল দেখার পর। আর কোনওদিন ঢুকিনি ওই ‘মিনিয়েচার জু’-র তাঁবুটায়।
চিড়িয়াখানা-তাঁবুর পাশে অনেকটা উঁচু এবং গোলাকৃতি টিন ঘেরা জায়গা। টিনের গায়ে আঁটা সাইনবোর্ড— ‘মরণকূপের খেলা’। টিকিট কেটে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে হত ওপরে। একটা গোলাকার গভীর কুয়ো। একটা ফাইভ হানড্রেড সি সি ডাবল সিলিন্ডার রয়্যাল এনফিল্ড বুলেট মোটরবাইক নিয়ে মৃত্যুকূপের খেলা দেখাতেন চুঁচুড়ার তপনকুমার কুণ্ডু ওরফে তপনকুমার। একশো চল্লিশ-পঞ্চাশ স্পিডে কুয়োর দেয়ালে কাত হয়ে যাওয়া বাইকে চড়ে চক্রাকারে ওপর থেকে নীচ, নীচ থেকে ওপর প্রদক্ষিণ করতেন ভীমগতিতে, দেখতে দেখতে পেটের মধ্যে খামচে ধরত ভয়। কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখ। দম আটকে আসত আতঙ্কে। পরবর্তীতে সার্কাসে গ্লোব প্যাটার্নের খাঁচায় বহুবার দেখেছি খেলাটা। অনেকটা দূর থেকে। কিন্তু রথের মেলার সেই হাড় হিম করে দেয়া অনুভূতিটা অনুভব করিনি কখনও।
