দ্বিতীয় জন ভেরোনিকা। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ে। বাড়ি ছিল রয়েড স্ট্রিট অঞ্চলে। প্রচণ্ড হুল্লোড়বাজ, প্রাণোচ্ছল আর হাসিখুশি সবসময়। দুর্দান্ত পসার ছিল। পরবর্তীতে নিজেরই সম্প্রদায়ের একটি ছেলেকে বিয়ে করে পাকাপাকিভাবে পাড়ি জমায় অস্ট্রেলিয়ায়। ফলে খবর পাওয়া বা যোগাযোগের সুযোগ হয়নি স্বাভাবিকভাবেই।
শুভ্রার মতোই করুণ পরিণতি হয়েছিল লিলিদিরও। বেশি বয়সে অল্প বয়সি হ্যান্ডসাম এবং প্রতারক এক প্রেমিকের পাল্লায় পড়ে সর্বস্ব খুইয়ে রাস্তায় নামেন। পরবর্তীতে অনেকদিন দেখেছি নোংরা, ছেঁড়া আলুথালু পোশাকে, উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে। শীর্ণকায় চেহারা। কোটরে বসে যাওয়া সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ দুটো চোখ। ফাঁকা বোধশূন্য দৃষ্টি। মুখে সস্তা চোলাই মদের গন্ধ। চিনতে পারছেন না কাউকে। এরকম চলেছিল বছর খানেক। অতঃপর এক শীতের ভোরে রাস্তা ঝাঁট দিতে আসা ঝাড়ুদাররা ক্যামাক স্ট্রিটের ফুটপাতে লিলিদির মৃতদেহটা দেখতে পায়। থিয়েটার রোডের মোড়ে রেখা বারের (এখন নেই) স্টুয়ার্ট কৃষ্ণান ভাই দিন তিনেক বাদে আমায় খবরটা দেন।
অনেকদিন আগের ঘটনা। তবু এই তিনজনের কথা আমি ভুলিনি আরও একটা কারণে। নব্বই দশকের শেষের দিকে দিল্লির একটি নামী সোশ্যাল রিসার্চ সংস্থার থেকে কলগার্লদের ওপর কাজ করার কনসাইনমেন্ট পাই। একাজে লিলিদি, শুভ্রা আর ভেরোনিকা যেভাবে আমাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছিল সেটা কখনওই ভোলার নয়। ওদের অকুণ্ঠ সহযোগিতা না পেলে কাজটা আদৌ করা সম্ভব হত না আমার পক্ষে। ওদের রেফারেন্সেই পৌঁছে যেতে পেরেছিলাম আরও একজনের কাছে যে এই পেশায় তুলনামূলকভাবে নবাগতা। বালিগঞ্জ এলাকায় একটা ফ্ল্যাটে মা’র সঙ্গে থাকত। নাম ঠিকানা কখনওই উল্লেখ করা যাবে না— এই শর্তে রাজি হয়েছিল কথা বলতে। আগে একটা নামজাদা বহুজাতিক কোম্পানিতে রিসেপশনিস্টের চাকরি করত। ছেড়েছুড়ে এই পেশায়। “কেন?” প্রশ্ন করায় “কারণ এটাও আর দশটা কাজের মতো আরেকটা কাজ অ্যান্ড এন্ড অফ দ্য ডে ইট মিনস্ মোর মানি”—
উত্তর দিয়েছিল নির্লিপ্ত মুখে। আদ্যোপান্ত পেশাদার। লিলিদিদের মতো প্রেমে পড়ে কেরিয়ার খারাপ করার কোনও বাসনাই নেই। নেই ফালতু আড্ডা বা বেকার হইহুল্লোড়ে সময় নষ্ট করার বাতিক। ভয়ংকর রকম ফিগার কনশাস। নিয়মিত একটি পাঁচতারা হোটেলের জিমে ওয়ার্কআউট করত। চর্বি বা তেল মশলাদার জাতীয় খাবার। নৈব নৈব চ। মদ্যপানে তেমন একটা আসক্তি নেই। ক্লায়েন্ট ভিজিটের সময় মেরেকেটে বড়জোর দু-এক গ্লাস দামি ওয়াইন। তিন-চারজন অত্যন্ত দক্ষ, শিক্ষিত এবং পেশাদার এজেন্ট রয়েছে। পুরো কারবারটাই চলে ইন্টারনেটে, আজকালকার ভাষায় ‘অনলাইনে’। পেশার প্রয়োজনে মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু যেতে হয় হরবখত। এ ছাড়াও মাসে একবার দুবাই যাওয়া বাঁধা। দু-তিন দিনের ট্রিপ। পার্মানেন্ট ক্লায়েন্ট। মাসিক লাখ দেড়েকের প্যাকেজ (প্রিয় পাঠক সাতানব্বই-আটানব্বই সালে টাকার অঙ্কটা চিন্তা করুন একবার)। উত্তরদাত্রীর কাছেই শুনেছিলাম এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মহিলাদের ‘কলগার্ল’ নামে আর ডাকা হয় না এখন। লিলিদি, শুভ্রা, ভেরোনিকাদের মতো পুরনো, আমুদে, হুল্লোড়বাজ, সুখ-দুঃখ মেশানো কলগার্লরা চলে গেছে বেবাক বাতিলের খাতায়। তার বদলে শহরের উঁচুতলা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসকর্ট সার্ভিস। ‘এন্ড অফ দ্য ডে ইট মিনস্ মোর মানি’টাই একমাত্র বেদবাক্য যেখানে।
* প্রতিবেদনটিতে সব চরিত্রের নামই পরিবর্তিত।
৩. কলকাতার হারিয়ে যাওয়া মেলা
আজ যাঁরা চল্লিশ এমনকী পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই তাঁরাও কল্পনাতেই আনতে পারবেন না দৃশ্যটা। ষাটের দশকের গোড়ার কথা। একটা অন্যরকম, রূপকথামার্কা কলকাতা। রাস্তায় বাঘ-ছাপ লাল রঙের দোতলা বাস। মোড়ের মাথায় ট্র্যাফিক সিগনালে হাফপ্যান্ট পরিহিত কনস্টেবল। ভোরবেলা করপোরেশনের রাস্তা ধোয়া গাড়ি। ময়দানে চুনি-পিকে-বলরাম-আমেদকে দেখার জন্য কাঠফাটা দুপুর আর কাদা মাখামাখি লম্বা লাইন। ঘরের সিলিঙে আড়াআড়ি টাঙানো এরিয়ালের নীচে টেবিলে সাজানো গাম্বাট সাইজের জি ই সি কিংবা মারফি রেডিয়ো, অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার, কমল ভটচায, পিয়ারসন সুরিটা…। মাংসের দোকানে টাঙানো লাল শালু— ‘খাসির মাংস— ৫ টাকা Kg’। ব্রয়লার চিকেন বাজারে খেলতে নামেনি তখনও। বেশিরভাগ গেরস্ত বাড়িতে মুরগি তখনও ‘রামপাখি’ এবং নিষিদ্ধ। হাতে গোনা কয়েকটা বাড়িতে কালেভদ্রে দেশি মুরগির মাংস তখনও বাঙালির ‘ডেলিকেসি’। লোয়ার সার্কুলার রোড তখনও ঠিকঠাক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড হয়ে ওঠেনি। আজও মনে আছে শ্রীমানি বাজারের উলটোদিকে রামমোহন লাইব্রেরির গা ঘেঁষে আমাদের বাড়ির সামনে ফুটপাতের ওপর দিয়ে একটা রেললাইন সোজা চলে গেছিল শেয়ালদার দিকে। রেলগাড়ি যেতে দেখিনি কোনওদিন তবে পাড়ার কাকা জ্যাঠাদের কাছে শুনেছিলাম মার্টিন বার্ন না করপোরেশন কার যেন একটা ময়লা ফেলার ওয়াগন গাড়ি নাকি হুইসল বাজাতে বাজাতে চলে যেত ধাপায়, ফি দুপুরবেলা। আমাদের পাড়ার সামনে লাইনটা পিচের ফুটপাতে বসে গেছিল প্রায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ার ফলেই হয়তো বা। তবে শেয়ালদার কাছে প্রাচী সিনেমার উলটোদিকে লাইনটা মাথা উঁচিয়ে ছিল তখনও অবধি। স্পষ্ট মনে আছে এন আর এস হাসপাতালের দুটো গেটের মাঝখানে আজ যেখানটায় ছাউনি দেয়া বাসস্টপ ঠিক সেখানে একটা জং ধরে যাওয়া ভাঙাচোরা ওয়াগন দাঁড় করানো ছিল দীর্ঘদিন। আর সেখানেই রেললাইন ঘেঁষে ফুটপাতের দু’ধার জুড়ে বসত অদ্যাবধি কলকাতার সবচেয়ে বড় মেলা। শেয়ালদার রথের মেলা। রথের দিন থেকে শুরু হয়ে চলত টানা এক মাস। জানি, এই অবধি পড়েই অনেকে হই হই করে উঠবেন— “সবচে বড় মেলা? গুল মারবার আর জায়গা পাননি মশাই? আমাদের বুক ফেয়ার, শিল্প মেলা… এগুলো সব কী তা হলে?” ধীরে বন্ধু ধীরে, আগে আমার কথাটা শেষ করতে দিন, তারপর না হয় মন খুলে গালাগাল করবেন। প্রথমে মেলার দৈর্ঘ্যের কথাটা বলি তা হলেই বোধ হয় আমার দাবির সত্যতা প্রমাণিত হবে। শেয়ালদা ফ্লাইওভার তখনও সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে। অতএব মনে মনে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করুন একবার। বেলেঘাটা রেলব্রিজের নীচ থেকে শুরু হয়ে বাঁক খেয়ে পুরো এন আর এস চত্বর, আর আহমেদ ডেন্টাল হসপিটাল হয়ে মৌলালী যুবকেন্দ্রের (তখনও হয়নি) গা ঘেঁষে লালমোহন ভট্টাচার্য রোডে ঢুকে যেত মেলাটা। শেষ হত সি আইটি রোডের মোড়ে ফিলিপস বাস স্টপেজের সামনে। কম সে কম কিলোমিটার দেড়েক তো হবেই। শুধু কি বিশালত্ব? বৈচিত্রের দিক থেকেও অনন্য ছিল এই মেলা। বেলেঘাটা রেলব্রিজ থেকে নেমে শেয়ালদামুখো যে রাস্তাটায় আজ ফুটপাতের দু’পাশে সারি সারি স্থায়ী গাছের স্টল, সেগুলো স্থায়ী ছিল না তখন। তার বদলে রথের একমাসই বসত, ওই একই জায়গায়। তখন ক্লাস ফোর। ওখান থেকেই কিনে এনেছিলাম নাইন-ও-ক্লকের চারা। ছোট্ট টব। এতটুকু লতানে গাছে ঠিক সকাল ন’টাতেই ফুল ফোটে— এই অপার বিস্ময়ের ঘোরটা কাটেনি আজও।
